গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

আকাশের মতো হোক
বুচুউউউ, দরজা খুলে দেখতো কে এলো। কখন থেকে কলিংবেলটা বাজছে। দৌড়ে গিয়ে দরজাটা খুলবি, তা না। আমি না চেঁচালে কোনো কিছু তোর মাথাতেই ঢোকেনা। যা, তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খুলে দে। আমি এই দোতলার সিঁড়ি ভেঙে যতক্ষণে গিয়ে দরজা খুলব ততক্ষণে তো ফোঁটার লগ্ন পার হয়ে যাবে। আজ আবার বেলা একটার মধ্যেই দ্বিতীয়া ছেড়ে যাবে। একার হাতে ফোঁটার জোগার করা কি কম কথা! দূর্বা তোলা, কলাপাতায় নতুন কাজল পাড়া, নতুন জলপ্রদীপে জল ভরে তেল- পলতে দিয়ে রেডি করা যাতে সারাদিন ওই প্রদীপ জ্বলে, ভোরের আলো ফোটার আগেই
শিশিরের জল ধরেরেখে তাই দিয়ে চন্দন ঘসে বাটিতে রাখা, ফোঁটার দই, মুখে দেবার জল মিষ্টি প্লেটে আলাদা করে সাজিয়ে রাখা, যাতে সবকিছু হাতের কাছে থাকে সেই ব্যবস্থা করতেই তো দিন কাবার। তারওপর আবার এতগুলো মানুষের জন্য রান্নাবান্না – যাকগে সেকথা তোকে বলেই বা কিহবে?
যা দৌড়ে গিয়ে দরজা খোল।
বুচু দরজা খুলেই হৈ হৈ শুরু করে দিল- ও বড়মাসি দেখ, মামারা এসে গেছে। ছোটমাসিও এসেছে। ওওওমা, দেখ গো বড়মাসি আজ মামিমাও এসেছে।
ও ছোটমাসি, রাঙাদা, ছোড়দা, মিঠুদি, মেসো, ছোটকা – ওরা কখন আসবে? বড়মাসি বলছিল যে আজ তাড়াতাড়ি ফোঁটা দিতে হবে। নয়ত লগ্ন পার হয়ে যাবে। জানতো, আজ বড়মাসি ভোরবেলা উঠে আগেভাগেই ঠাকুরপূজো করে নিয়েছে। বলেকিনা, একলার হাতে এতকাজ সময়মতো সারতে না পারলে কখন ভাইদের ফোঁটা দেব আর কখন বাচ্চাদের খেতে দেব ? ও মামি, তুমি বরং ভাইকে স্নান করিয়ে সাজিয়ে দাও। আজ তো পিচ্চি ওকে ফোঁটা দেবে ! ওতো সকাল থেকে একটা করে নতুন জামা পড়ছে আর ছাড়ছে। কিছুতেই মনের মতো হচ্ছেনা ওর সাজ। আর খালি বুচুদি, বুচুদি করে আমাকে জ্বালাচ্ছে। এদিকে বড়মাসি একা একা রান্নাঘরে। অসুস্থ মানুষটার খুব কষ্ট হয় আমি জানি। কিন্তু আমি কাকে সামাল দেব বুঝতে পারিনা। যাও, তোমরা ওপরে যাও। আমি দরজা বন্ধ করে আসছি।
কথাশুনে কে বলবে যে বুচু এবাড়ির কাজের মেয়ে। ওর মায়ের হাঁপানি ছিল বলে ছোটবেলা থেকেই বুচু মায়ের সঙ্গে কাজে আসত এবাড়িতে। মায়ের সাথে হাতে হাতে কাজ করত। ওর বাবা ওদের ছেড়ে চলে গেছে আর আত্মীয়রাও কোনো সম্পর্ক রাখেনা। রাতবিরেতে মায়ের টান উঠলে ওই ছোট্ট মেয়ে একলা জেগে থাকে বিছানায়।
একদিন হাঁপানির টান এমন উঠল যে আর দম ছাড়তে পারলনা। চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে বেড়িয়ে গিয়ে দম আটকে শেষ হয়ে গেল। বুচু তখন বছর বারো’র হবে। তখন থেকেই আছে রুবির কাছে পিচ্চির পাশে। রুবিকে ভীষণ ভালোবাসে বুচু। এই সংসারের শক্ত খুঁটি এই মেয়ে। আজকের এই আয়োজনের অনেকটাই ও সামলে দিয়েছে। রুবির দুইভাই, ভাইয়ের বৌয়েরা, বড় ভাইয়ের ছেলে সৌম্য, বোন মিলি সবাই একসাথে আসাতে বাড়িতে বেশ উৎসবের মেজাজ ছড়িয়ে পড়েছে।
রুবি ততক্ষণে মাছেরমুড়ো দিয়ে মুগডাল রেঁধে গরমমশলা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। বেগুন ভাজতে ভাজতে সবার জন্য চা করে নিলো। বুচু গিজারটা অন করে দিতেই রুবি ভাই আর ভাইপোকে স্নান করে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে বলে নিজে দৌড় রান্নাঘরে গেল। প্রেসারকুকারে ছটা সিটি হয়ে গেল, পাঁঠারমাংসটা আবার বেশি নরম না হয়ে যায়! ভাতের হাঁড়ির উপুরতুলে ঝেড়ে রেখে নিজেও নতুন কাপড় পরে রেডি হয়ে গেল। বুচুকে বলে দিল খাবার টেবিল গুছিয়ে নিতে।
পিচ্চিইই, এই পিচ্চিইইই – তোর এখনও হয়নি? তবে আমরাই শুরু করে দিলাম। আমি আর মাসি আগে মামাদের ফোঁটা দিয়ে নিই তারপর তুই ভাইকে ফোঁটা দিবি।
রৈরৈ রবে ছুটতে ছুটতে পিচ্চি হাজির হল। না মা, আগে আমি ভাইকে ফোঁটা দেব। ও মামি, তাড়াতাড়ি ভাইকে নিয়ে এসো। মা’দের ফোঁটা শুরু হলে অনেকক্ষণ লাগবে। আজকে আমি আগে ভাইকে ফোঁটা দেব।
পিচ্চি এবছর প্রথম ভাইফোঁটা দেবে। মামাদের ফোঁটা নেয়া দেখে ওর খুব ইচ্ছে ভাইফোঁটা দেবে। কিন্তু সৌম্যর পাঁচ বছর না হলে তো ভাইফোঁটা হবেনা। তাই এই ক’বছর ও শুধু অপেক্ষা করেছে।
পিচ্চি চেঁচিয়ে উঠল — ওমাআআ, বল, কি করবো। আর ছড়াটা তুমি বলে দাও।
আচ্ছা, ভালো করে শোন। নিজের বাঁ’ হাতের কড়ে আঙুল দিয়ে ভাইয়ের কপালে চন্দনটা পড়িয়ে দে – বলে রুবি।
ওরে বাবা, বাঁহাতের কড়ে আঙুল দিয়ে কি করে ফোঁটা দেব, বেঁকে যাবেতো – বলে পিচ্চি কাচুমাচু মুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। রুবি বলে –
সে ব্যাঁকাত্যাড়া যাইহোক, কড়ে আঙুল দিয়েই ভাইফোঁটা দিতে হয়। অন্য কোনো আঙুল দিয়ে ভাইফোঁটা হয় না।
কেন? এ আবার কি নিয়ম? ব্যাজার মুখে প্রশ্ন করে পিচ্চি।
রুবি মুক্তঝরা গলায় বলে- এটা একটা খুব সুন্দর নিয়ম। আমাদের এই হাতেই রয়েছে পৃথিবীর মূলশক্তি মানে পঞ্চতত্ত্ব। হাতের পাঁচটা আঙুল হল বৃদ্ধা, তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা আর কনিষ্ঠা। এরা পৃথিবীর প্রধান পাঁচটি প্রধানতত্ত্ব অর্থাৎ পঞ্চভূতের প্রতীক। এরা হল যথাক্রমে ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম মানে মাটি, জল, বায়ু, অগ্নি ও আকাশ। এই প্রধান পাঁচটা জিনিস দিয়েই আমাদের এই শরীরটা তৈরি।
কড়ে আঙুল হল ব্যোম অর্থাৎ আকাশের প্রতীক। কড়ে আঙুল অসীম আকাশের নির্দেশক বলে ওই আঙুল দিয়ে ভাইকে ফোঁটা দিলে ভাইয়ের অসীম আয়ু যেমন কামনা করা হয় তেমনি ভাইবোনের ভালবাসা যেন এই বিশাল আকাশের মত অসীম অন্তত হয় এই কামনাও করা হয়। আর ভাইবোনের মন যেন এই অনন্ত আকাশের মতো উদার উন্মুক্ত থাকে এই শুভ কামনাও জড়িয়ে থাকে ওই কড়ে আঙুলের ফোঁটাতে।
নে – এবার বল, ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যম দুয়ারে পড়ল কাঁটা…..