T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় রীতা চক্রবর্তী

নয়ন মেলে দেখে আলো

‘কিরে রাণু, দুদিন যে কাজে এলিনা বড়, কি হয়েছিল তোর? পূজোর আর কটা দিন বাকি আছে বলতো? এখনো ঘরদোর ঝাড়া শেষ হলনা। কবে জামাকাপড় রোদে দিবি? কবে বিছানাপত্র কাচাকাচি করবি বলতো? বলা নেই ওয়া নেই দুম করে ডুব মারলি, কি পেয়েছিস বলতো? এই বাড়িতে তোকে কেউ কিছু বলেনা তাইনা? দিন দিন তোর সীমা ছাড়া রং ঢং দেখে গা’ জ্বলে যাচ্ছে আমার। লোকের বাড়িতে বাসনমাজার কাজ করতে কেউ যে এমন চোখে কাজল দিয়ে আসে এটা বাপু জন্মেও দেখিনি আর কাউকে বললেও বিশ্বাস করবেনা। অথচ তোর সাজগোজ দেখে মনে হয় যেন কোন অফিসার এলি একেবারে। যত্তসব বিরক্তিকর
কাজকর্ম তোর। যা গিয়ে দেখ রান্নাঘরে। মাছ মাংস কি আছে দেখে মশলাটা রেডি করে রাখ। আমি পূজোটা সেরে এসে রান্না চাপাবো। আবার চলে যাসনা যেন। দুপুরের খাবারটা নিয়ে যাবি’…বলতে বলতে মুখার্জি গিন্নি কলঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
রাণু এবাড়ির কাজের মেয়ে। বলতে গেলে লোকাল গার্ডিয়ান, এই দুই বয়স্ক মানুষের ভরসা। তবে গত দুদিন সর্দিজ্বরের জন্য গা’ ম্যাজম্যাজে ছিল বলে কাজে আসতে পারেনি।
আজ এসেই আদা তেজপাতা দিয়ে চা করে প্রথমে মুখার্জিবাবুর টেবিলে চা দিয়ে এসেছে। মুখার্জিবাবু আর্মচেয়ারে বসে সকালের খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন যদিও কান ছিল গিন্নির কথাতেই। রাণুকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন – ‘কি হয়েছিল তোর?’ একটু জ্বর ছিল গো মেসো, তাই আসিনি। আমি তো জ্বরজ্বালা সয়ে নেব।
আমার ছোঁয়াচ লেগে যদি তোমাদের দুজনের কারোর কিছু হয় তবে কি এইবয়সে সইতে পারবে তোমরা? মাসি তো কোনো কথা শুনতেই চায় না। যতক্ষণ আমাকে দাঁতের তলায় না পিসবে ততক্ষণ পর্যন্ত তো শান্তি পাবেনা। সে আমি এখন ভালোই বুঝে গেছি। তাইতো এসেই তোমাকে আগে চা দিয়ে গেলাম। এবার যাই – রান্নাঘর গুছিয়ে কাপড়গুলো ধুয়ে ফেলি।
রাণু আসার পর একদিকে যেমন ঘরকন্নার কাজকর্ম নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পেরেছেন অন্য দিকে সেই মেয়েকে নিয়েই মুখার্জিগিন্নির দারুণ দুশ্চিন্তা।
মেয়েটা খুব ভালো। এমনভাবে সংসারের খুঁটিনাটি সামলে রাখে যেন এটা ওরই বাড়ি। এরকম কাজের মেয়ে পাওয়া খুব ভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু প্রতিবেশীদের তো কোনও ভরসা নেই! কে যে কখন ওর কান ভাঙিয়ে নিয়ে যাবে সেই ভয়েই সবসময়ই রাণুর সাথে খিচখিচ করতে থাকে।
রাণুর সংসারে মাত্র চারজন লোক। রাণুর বরের দোকান আছে বড়বাজারে। বাপ ছেলেতে সেই দোকান সামলায়। কিন্তু মোটরবাইক এক্সিডেন্ট করে বর প্রায় পঙ্গু হয়ে ঘরে পরেছিল বছর খানেক। তখনই পাশের বাড়ির কাজের মাসি মালাদি’কে ধরে এই বাড়ির কাজটা পেয়েছে। মাসে আটহাজার টাকা মাইনে আর একবেলার খাওয়া। যদিও মুখার্জিগিন্নি চারজনের খাবার দিতে পারবেনা আগেই বলে দিয়েছিল। কিন্তু বাড়িতে রান্না না করলে মেয়েটা খাবে কি – তাই রাণু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসত। তখন মুখার্জিবাবু গিন্নিকে বুঝিয়ে রাণুর বাড়ির সবার জন্য খাবার দিতে রাজি করিয়েছেন। মেয়ে কলেজে চলে গেলে তবে রাণু কাজে আসে আর একবার চলে এলে সব কাজ গুছিয়ে এমনকি বিকেলের আটা মেখে ফ্রিজে রেখে তবে যায়। মুখার্জিবাবু বছর ছয়েক আগে একটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ম্যানেজারপদ থেকে অবসর নিয়েছেন।
একমাত্র সন্তান ডাঃ দীপাঞ্জন মুখার্জি চেন্নাইয়ের এক বেসরকারি হাসপাতালের হার্ট স্পেশালিস্ট। ছেলের বৌও একই হাসপাতালের গাইনোকোলজিস্ট। তাদের কাছে টাকার অভাব নেই কিন্তু বাবা মায়ের জন্য একটুও সময় নেই।
এরকম একটা পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে রাণুর মত একজন দায়িত্বশীল মানুষকে কাছে পেয়ে মুখার্জিগিন্নি যেন হাতে চাঁদ পেয়ে যান। কিন্তু একসপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার রাণু কাজ কামাই করলে আতঙ্কে মুখার্জিগিন্নি একা একাই চিৎকার করতে থাকেন। প্রতিবেশীদের শুনিয়ে শুনিয়ে বলে চলেছেন – ‘যত্তসব ভাতারখাগির দল সারাক্ষণ আমার বাড়ির কাজের লোকের দিকে চোখ দিয়ে বসে আছে। কি করে মেয়েটাকে ভাঙিয়ে নেবে তারই ফন্দি এঁটে চলেছে সারাদিন। আমরা তো কারো পাকাধানে মই দিতে যাইনা। তবুও কেন যে এদের এতো গায়ে ফোস্কা পরে কে জানে?’ যত বেলা বাড়ছে তত তার রাগের মাত্রাও বাড়ছে। শেষমেশ মুখার্জিবাবু যখন বলেন, ‘তোমার ঠাকুরপূজো শেষ হলে চলো দুজনে মিলে গিয়ে দেখে আসি রাণুকে। তাতে ওর বাড়িটাও দেখে আসা হবে আর ও সত্যিকথা বলছে কিনা সেটাও বুঝতে পারব। যদি দরকার হয় দুজনে নাহয় আজ বাইরে খেয়ে নেব’…তখন মুখার্জিগিন্নি একটু শান্ত হন।
কিন্তু মুখার্জিবাবু এইমুহুর্তে অত্যন্ত সন্দিহান হয়ে মনে মনে ভাবছেন – রাণু যে বাড়ির ঠিকানা দিয়েছে সেটা কি ওদেরই বাড়ি?
কারণ ঠিকানা অনুযায়ী যে বাড়ির সামনে মুখার্জিদম্পতি এখন দাঁড়িয়ে আছেন সেটা একটা একতলা ছিমছাম বাড়ি। সামনে বেশ সুন্দর করে সাজানো ফুলের বাগান রয়েছে। কয়েকটা বাচ্চামেয়ে উঠোনে দাগ কেটে কিতকিত খেলছে। ঢুকবে কি ঢুকবেনা ইতস্ততঃ করছেন দুজনেই। এর মধ্যেই একটি মেয়ে কাছে এসে জিজ্ঞেসা করে – তোমরা কি কাউকে খুঁজছো? দিদি তো কলেজে গেছে। বাড়িতে শুধু মা আছে , ডাকবো? ‘হ্যাঁ – ডাকতো তোমার মাকে? জিজ্ঞেস করে নিই রাণু এখানে থাকে কিনা?’ ততক্ষণে মুখার্জিগিন্নি একা একা বিড়বিড় করে বলে চলেছেন – কত বড় জোচ্চোর মেয়ে, নিজের বাড়ির ঠিকানাটা পর্যন্ত ভুলভাল দিয়ে রেখেছে, কতবড় চিটিংবাজ মেয়েছেলে, ভাবা যায়?’ এর মধ্যেই রাণু ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে মুখার্জিবাবুকে দেখতে পেয়ে বলে ওঠে,’ আরে মেসো, তুমি এসেছো? তা বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এসো। ওরে বাবা, মাসিও এসেছ যে সাথে। আজ আমার কি সৌভাগ্য তোমাদের পায়ের ধুলো পড়ল আমার বাড়িতে।’
মুখার্জিগিন্নি আর চুপ করে থাকতে না পেরে বলে ওঠেন, ‘আজও কাজে গেলিনা দেখে ভাবলাম তুই হয়তো আবার অসুস্থ হয়ে পেরেছিস, তাই দেখতে চলে এলাম। তা হ্যাঁরে, এটা কি তোদের নিজেদের বাড়ি? কথাটা শুনে রাণু হেসে উত্তর দেয় – হ্যাঁ গো মাসি, এটা আমাদের নিজেদের বাড়ি। তারপর হাত ধরে মুখার্জিগিন্নিকে ঘরের ভেতরে নিয়ে যায়।
খাটের ওপর বসতে দিয়ে বলে – মাসি তুমি বসো। আমি তোমাদের জন্য একটু চা করে আনি। মুখার্জিবাবু ততক্ষণ সারা বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখছেন। একটা ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে গিন্নিকে ইশারায় ডেকে দেখালেন-রাণুর সমাবর্তণের ছবি। মানে রাণু একজন মাস্টার্স ডিগ্রিধারী মহিলা। দুজনেই যেন কথা হারিয়ে ফেলেছেন। কেবল অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এরমধ্যেই রাণু চা নিয়ে হাজির। ওদের দুজনকে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যাপারটা বুঝে যায়। অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বলে, আসলে মাসি, আমি লেখাপড়া জানি – এটা যদি তোমরা আগেই জানতে তবে কি আমায় কাজে রাখতে বলো? তোমাদের তো বলেছি কর্তার দোকান আছে, বাপবেটাতে দোকান করে। কিন্তু এক্সিডেন্টের পর এত ধারদেনা হয়ে গেল যে বাড়িতে পাওনাদারের উৎপাত শুরু হল। সংসারের হাল ফেরাতে আমাকে কিছু করতেই হতো। কিন্তু কে আমাকে কাজ দেবে? কি কাজ করলে ঘর সামলে দুটো টাকা আয় করতে পারবো? তখন আমি মালাদি’কে বলেছিলাম রান্নার কাজের খোঁজ নিতে। তখন ওই সার্টিফিকেটই ছিল আমার শত্রু। এত লেখাপড়া জানা মেয়ে কি কারোর বাড়িতে গিয়ে রান্নার কাজ করতে পারে? আমি হলেও সেটাই ভাবতাম। কিন্তু তোমরা আমাকে বাঁচিয়েছ। দরকারের সময় একটা কাজ দিয়েছ। তোমরা আমার ভগবান গো। শুনে মুখার্জিগিন্নির দুচোখ জলে ভরে যায়। কান্না ভেজা গলায় বলেন – না জেনে তোকে কত কি অকথাকুকথা বলেছি। আমায় ক্ষমা করে দিস মা। তখন রাণু বলে – আজ খুব ভালো দিনে তোমরা এসেছ। এই যে সামনে দেখছ “ভোরের ফুল” লেখা বাড়িটা ওটা এই মেয়েগুলোর অনাথ আশ্রম। পথে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েদের এখানে থাকা – খাওয়া – লেখাপড়া- হাতের কাজ শেখানো হয়।
কাল তো মহালয়া তাই আমি প্রতিবছর আজকের দিনে ওদের জন্মদিনের আয়োজন করি। ওরা আজ দুপুরে এখানেই খাবে। তোমাদের যদি অসুবিধা না হয় তাহলে এখানেই খেয়ে যাবে।
মুখার্জিগিন্নি যেন এতক্ষণে একটা জায়গা পেলেন কথা বলার। বললেন, অসুবিধা কিসের রে! তুই যদি এত অসুবিধার মধ্যেও ওদের জন্য এতটা করতে পারিস তবে আমি তোর মাসি হয়ে তোর সাথে এটুকু করতে পারবোনা? আজ আমি রান্না করব। তুই শুধু গুছিয়ে দে। মুখার্জিবাবুকে বলেন, কিই গো একটু বাজার যাবেনা? ওদের সবার জন্য একটু মাংস আর মিষ্টি নিয়ে এসো। আজ ভোরের ফুলেরা আমাদের চেতনায় সুরভি ছড়িয়ে দিয়েছে। রাণু স্বয়ং গিরিজা নন্দিনী উমা হয়ে ধরা দিয়েছে আমাদের কাছে। আজ বড় শুভ দিন। এসো সবাই মিলে আজ একসাথে একটু আনন্দ করে কাটাই।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।