গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

দীপান্বিতায় বাজি পোড়ানো
দীপাবলি এলেই মনের মধ্যে আলোর ঝর্ণা ঝিরিঝির তিরতির করে বয়ে চলে। ছোটবেলা থেকেই দেখছি দেওয়ালিতে সারা বাড়ি প্রদীপ দিয়ে সাজানো হয়। দূর থেকে সব বাড়িঘরগুলো অমাবস্যার ঘনঘোর অন্ধকারের মধ্যেও আলোয় ঝলমল করে। কতরকম বাজি পোড়ানো হয়। তারমধ্যে শব্দবাজির একটা আলাদা সম্মান আছে। ছোটদের জন্য তারাবাজি, চরকী,
বল্টুক্যাপ, বন্দুকক্যাপ, কালিপটকা, ধানীপটকা, রংমশাল আর বডদের জন্য তুরড়ী, চকলেটবোম, দোদোমা, হাউই, ছুঁচোবাজি।
ছোটবেলায় বাজি পোড়ানোতে খুব আনন্দ হতো। কোনোদিন মনে প্রশ্ন জাগেনি যে এই বাজি কেন পোড়ানো হয়? আসলে সারাবছরে ওই একটাই তো দিন ছিল বড়দের সাথে দলবেঁধে সময় কাটানোর। আর অন্য সময় বড়দের কোনো আলোচনায় ছোটদের জায়গা ছিলনা। আশেপাশে দেখলেও বড়দের দলের টপিক বদলে যেত। আর সেটা ওদের হাবভাব কথাবার্তায় বেশ বোঝা যেত। তাই খুব ভালোবেসে যখন বাজি পোড়ানোর দলে আমাদের রাখত তখন আমরা নিজেদের ভাগেরটা আগে থেকে আলাদা করে নিতাম। কারণ আমরা সবাই জানতাম যে ওরা আমাদের বাজিগুলো নিয়ে নেবে। আর দলে থাকার শর্ত ছিল চরকী, কালিপটকা আমাদের থেকে নিলে
তুরড়ী, চকলেটবোম আমাদের ফাটাতে দিতে হবে।
ওরা কিন্তু আমাদের সব কথাতেই হ্যাঁ করত। তারপর নিজেদের সব বাজি পোড়ানো শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের বলত, তোরা শুধু ক্যাপ ফাটাবি। কালিপটকার লাছিটা লম্বা করে জুড়ে দেব। দেখবি কেমন পটাপট ফাটবে। বারে বারে ধরাতেও হবেনা। ব্যস, ওই একটা কথাতেই একশো গোল খাইয়ে দিল। এবার সন্ধ্যা হতেই মহা উৎসাহে নিজের নিজের ঠোঙা হাতে বাইরে যাও আর তারপর ঘাম ঝরিয়ে ক্যাপ ফাটাও। কারণ পটকার লাছি কিভাবে জুড়বে, কোথায় ফাটাবে সেটাইতো জানা হয়নি। অতএব অপেক্ষা করতেই হবে। বছরের পর বছর এইভাবে অপেক্ষা করতে গিয়ে মনে প্রশ্ন এল, তাহলে আর বাজি পুড়িয়ে কি লাভ? নিজের হাতে পটকা, ছুঁচো, চরকী, চকলেট, দোদোমাতে ফাটাতে পারছিনা। উপরন্তু চরকী, পটকা, রংমশালও দাদাদিদি মামাকাকাদের দখলে চলে যাচ্ছে। তাহলে আমাদের জন্য যে সব বাজি কেনা হয় সেটা আর কিনতে হবে না বরং ওই টাকা দিয়ে আমরা সিনেমা দেখব। সেখানেও ছোটদের কপালে ঠনঠন। কালীপূজোর রাতে নাকি সিনেমাহলে মানুষের মতো দেখতে ভূত থাকে। তাই ওটা বাদে অন্য কিছু ভাবো। কি আর ভাববো? ঠাকুর দেখতে হলে ওদের সাথে, বাজি ফাটাতে হলে ওদের সাথে, তাই কম্প্রোমাইজ তো করতেই হবে। আর এইভাবেই কখন যেন আমরাও বড়র দলে হয়ে গেলাম আর একইভাবে ছোটদের মশাল, পটকা, বাজি নিজেরাই পোড়াতে লাগলাম। সাধে কি আর এস্ ওয়াজেদ আলি সাহেব বলেছেন,”সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে!”
যাকগে, যেকথা বলব বলে এতক্ষণ ধরে এতকথা বললাম সেটা হল কার্তিকমাসের অমাবস্যায় বাজি পোড়ানো হয় কেন? যতটা পড়াশোনা করেছি তাতে কোথাও এর কোনো কারণ দেখতে পাইনি। শুধু দেওয়ালীতে বাজি ফাটানোর কথাই পেয়েছি। আর দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজো বা অলক্ষ্মী পূজোর কথাও জেনেছি।
এই ব্যাপারে একটা রঙ্গব্যাঙ্গ শুনেছি যে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজোতে কাঁসরঘন্টা বাজেনা বলে লক্ষ্মী ঘুমিয়ে পড়েন। তাই দীপান্বিতায় শব্দবাজি পুড়িয়ে লক্ষ্মীর ঘুম ভাঙানো হয়।
আসলে আমার যেটা মনে হয় সেটা হল,
অক্টোবর – নভেম্বরের আবহাওয়াতে নানারকম ছোটছোট পোকামাকড় দেখা যায়। আলো দেখলেই এই পোকা ছুটে আসে। জানলা বন্ধ থাকলে দেখা যায় জানলার কাঁচের ওপর খুবই ছোট প্রজাপতির মত পোকা লেপ্টে থাকে। সন্ধ্যাবেলায় বাড়িতে লাইট জ্বালিয়ে জানলা খোলা রাখলে বিভিন্ন ধরনের পোকা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। ঘর অন্ধকার করে রাখলে আসেনা। কার্তিকমাসে শ্যামাপোকাতে(green leaf hopper) পাকা ধানের ক্ষতি করে। প্রচুর
বাজি পোড়ানো হলে হঠাৎ করেই বাতাসে বারুদের ধোঁয়া এবং গন্ধ মিশেযায় বলে বিভিন্নধরনের পোকামাকড় মরে যায়। ফলে পাকাধানে পোকা লাগার ভয় থাকেনা। এটা একেবারেই আমার নিজস্ব মতামত।
শব্দবাজির আওয়াজে হয়তো এইসব পোকামাকড় দূর করার কোনো কৌশল থাকতে পারে। যদিও বর্তমানে শব্দবাজি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ হার্টের রুগিদের জন্য যথেষ্ট ভয়ংকর এই বাজি। ছুঁচোবাজি কখন কোনদিকে ছুটে যাবে, কার শাড়িতে, কার লুঙ্গিতে ঢুকে পড়বে কেউ জানেনা। বাজির পলতেতে আগুন ধরিয়ে ঠিক সময়ে ছাড়তে না পারলে পটকা, চকলেটবোমেও দুর্ঘটনা ঘটে। দোদোমার আওয়াজ কানের পর্দা ফাটিয়ে দিতে পারে।
তবুও শত শত বছর ধরে চলে আসছে এই বাজি উৎসব। সামগ্রিকভাবে দেওয়ালীতে প্রদীপ ধরানো, লক্ষ্মীগনেশের পূজো, দীপান্বিতা লক্ষ্মী পূজোর যে রীতি রয়েছে তাতে ব্যবসা বানিজ্যে
নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হয়। সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে অর্থ আয়ের পথ সুগম হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য দীপাবলি অত্যন্ত শুভ।