“অগ্নি সাক্ষী” ধারাবাহিক বড়ো গল্পে রত্না চক্রবর্তী (পর্ব – ১)

এবারও আনুপিসি ভীষণ রেগে গেছে।কিন্তু মিতু কি করবে মিতুর মাথার ঠিক ছিল না।অমিতকাকুর ভাগ্নি আর নিজেকে ও এক ভাবতে শুরু করেছিল।বিশ্বনাথমেসো জানে মিতু এই রকম পরিস্থিতিগুলোতে কেমন যেন পাল্টে যায়।এটা ওর প্রতিশোধ স্পৃহা নয়।এটা ওর একটা রোগ।ও নিজেকে সেই মেয়েটি ভাবতে শুরু করে।তার মত আচার আচরণ করতে থাকে।
অমিতকাকু মানে অমিতাভ আনুপিসির ছোটবেলার বন্ধু।অমিতাভের মা বাপ মরা ভাগ্নি সাথী মামার কাছেই মানুষ। অগাধ সম্পত্তি সাথীর। মা বাবা দুজনের আদর দিয়ে অমিতাভ ওকে মানুষ করেছে। এই কারণে নিজে বিয়ে পর্যন্ত করেনি।তাই সাথী যখন এসে বলেছিল সে রূপেশকে বিয়ে করতে চায় অমিতাভ না করতে পারেনি।আনু অবশ্য একটু খুঁতখুঁত করেছিল। ওর জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আজও ওকে পিছু করে বেরায়। সেও তো গৌতমকে ভালোবেসে ছিল। বিশ্বাস করেছিল। আনুর সরল বাবাও রাজী ছিলেন গৌতমের মত সুন্দর মিষ্টি ব্যবহারের ছেলেকে নিজের একমাত্র জামাই করতে। বিশ্বাস কিভাবে অর্জন করতে হয় গৌতম জানত।জোর করে ব্যবসার দশ বিশ হাজার টাকা গচ্ছিত রাখত আনুর কাছে। সাজানো দাদা বৌদি সোনার চেন দিয়ে আশীর্বাদ করে গিয়েছিল আনু মানে অনিন্দিতাকে। তারপর বিয়ের দুদিন আগে সেই বিপর্যয়ের রাত।উদভ্রান্তের মত এসেছিল গৌতম। একটা পাঁচলাখ টাকার পেমেন্ট আটকে গেছে ওর। ওই টাকার ভরসায় ও একটা বড় অর্ডার নিয়ে বসে আছে। পরশু ডেলিভারী দিতে হবে। কোনমতে দুলাখ যোগাড় করেছে। আরো তিনলাখ চাই। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। অথচ সেই সপ্তাহের শেষেই পুরো পাঁচ লাখটাকার পেমেন্টটাই ও পেয়ে যাবে। কিন্তু ততক্ষনে এই ডেলিভারি না দিতে পারলে বাজারে যা বদনাম হবে নতুন অর্ডার আর আসবে না। আনুর বাবা বিয়ের জন্য গড়ানো সব গয়না তুলে দিতে চাইলেন। গৌতম কিছুতেই নিল না। বলল অর্ডার চলে গেলে যাক সে এসব নিতে পারবে না। তাছাড়া এতে বড়জোর একলাখ হবে। আরো দুলাখ চাই। আনুর বাবার বন্ধু অনাদি ঘোষ বন্ধকী কারবার করতেন। গৌতমকে ছেলের চেয়ে বেশী বিশ্বাস করেছিলেন আনুর বাবা। গৌতমের কোন ওজর আপত্তি না শুনে বাড়ি বন্ধক দিয়ে তিনলাখ টাকা দিলেন তিনি। অনাদি ঘোষ মৃদু আপত্তি করেছিলেন। এতটা বিশ্বাস করা কি ঠিক হচ্ছে? আনুর বাবা বলেছিলেন এ সপ্তাহের শেষে টাকা পেয়েই গৌতম দলিল ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু টাকা নিয়ে গৌতমের সেই যাওয়াই শেষ যাওয়া ছিল। গৌতমের বাড়ি অফিস সব ছিল ছয়মাসের জন্য ভাড়ায় নেওয়া। দাদা বৌদির কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শোকটা সামলাতে পারেননি আনুর বাবা। অর্থ নয় প্রতারণাটা মেনে নিতে পারেননি। একরাতের স্ট্রোকে মা মরা আনুকে সারা পৃথিবীতে একা করে চলে গিয়েছিলেন তিনি। আনু পাথর হয়ে গিয়েছিল। অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন এই অমিতাভ, আনুর ছোটবেলার পুলিশ বান্ধবী গোপা আর গোপার স্বামী বিশ্বনাথের পরিচর্যায় আনু ধীরে ধীরে সুস্থ হয়। স্বাভাবিক জীবনে ফেরে। বাড়ি নিলাম করে অনাদিবাবু নিজের দেয় টাকাটুকু নিয়ে বাকী টাকা আনুকে যা দিয়েছিল তাই দিয়ে একটা এককামরার বাড়ি কিনে আনু নতুন করে জীবন শুরু করে। অমিতাভর আনুকুল্যে একটা বেসরকারি স্কুলে চাকরীও পায়। বাইরের ক্ষত শুকিয়ে গেলেও ভিতরের অবিশ্বাস বোধটা থেকেই যায়। সবের মধ্যেই একটা জটীলতার ইঙ্গিত পেত। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বেশ কিছু কেস সলভ করে ও। গোপাও অনেক কেসে এখন ওর সাহায্য নেয়। তবে আর্থাইটিসের জন্য ও বেশী ছোটাছুটি করতে পারে না। দৌড় ঝাঁপের কাজগুলো আনুর হয়ে করে মিতু। মিতুর এখনকার পোশাকী নাম মিত্রানী। কিন্তু এটা ওর আসল নাম নয়। মিতু মেদিনীপুরের মেয়ে। ওর নাম ছিল মাতঙ্গিনী। জন্মের পর বাবা মরে যায়।দুই বোনের পর এই মেয়ে আপদবালাইয়ের মতই বাড়তে থাকে। এত অযত্নেও অটুট স্বাস্থ্য মিতুর।খেলাধুলায় তুখোড়। পড়াশোনায় আহামরি না হলেও ফেল করে না। স্কুলের হয়ে প্রতিবার প্রাইজ নিয়ে আসে খেলায়। একটু যেন পুরুষালী হাবভাব। মাধ্যমিকের পর সম্বন্ধ আসে। যদিও দোজবর তবু বিধবা মা বিয়ের জন্য আর অপেক্ষা করে না। বিয়ের পর মিতু টের পায় বরের মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব। অকারণ মারধর। সঙ্গে শ্বাশুড়ী ননদের অকথ্য অত্যাচার। শেষে একদিন গরম চাটুতে মুখ চেপে ধরে মিতুর শ্বাশুড়ী। মুখের একদিক বিভৎস ভাবে পুড়ে যায়।মিতু সেই হ্যান্ডেলওয়ালা চাটু তুলে শ্বাশুড়ীর মাথায় মেরে পালায়। ছুট ছুট…. পালাতে হবে। মিতুকে দীঘার সমুদ্রের তীরে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়েছিল গোপা বিশ্বনাথ। তিনমাস সময় লেগেছিল ওকে সুস্থ করতে। মুখের পোড়া দাগ ছাড়া এখন মিতুর সব পুরানো চিহ্ন মুছে গেছে। গোপাই মিতুকে আনুর কাছে রেখেছিল। মিতু প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশান শেষ করেছে। রাইফেল শুটিং শিখেছে। ক্যারাটে শিখেছে। বিশ্বনাথ আংকেল কসমেটিক সার্জেনের সাথে কথা বলেছেন ওর মুখের বিভৎস দাগটা যাতে মুছে ফেলা যায়। কিন্তু ভিতরের দাগটা কোনদিনও মুছবে কি? আনুপিসি আর মিতু দুজনেই জীবনের দুই যন্ত্রণাকে বয়ে বেড়াচ্ছে। তাই ওরা কেমন যেন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। আনুর মনে সন্দেহ ছিল রূপেশকে নিয়ে। সাথীর অগাধ টাকার লোভে ছেলেটা বিয়ে করতে চাইছে না তো। অমিতাভও ভালো করে খোঁজ নিয়েছিল। তেমন সন্দেহজনক কিছু পায় নি। স্কুল কলেজ অফিস কোথাও কোন সন্দেহ জনক কিছু নেই। অমিতাভ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছিল। তারপর অমিতাভ অফিসের কাজে বেশ কিছুদিনের জন্য দিল্লী চলে যায়। সেখানেই একদিন খবর আসে গ্যাস লিক করে সাথী সাংঘাতিক ভাবে পুড়ে গেছে। প্লেনে তক্ষুনি ফিরে আসে। পাগলের মত কাঁদছিল রূপেশ। সাথী বাঁচেনি। ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল অমিতাভ। সব কাজ মেটার পর ছুটে গিয়েছিল আনুর কাছে সান্ত্বনার আশায়। আনু ও কাঁদছিল।দুহাতে মুখ ঢেকে বসেছিল অমিতাভ। কেউ কোন কথা বলতে পারেনি। ঘরে নেমে এসেছিল সন্ধ্যার অন্ধকার। একসময় ভেজা গলায় আনু বলে -“সাথীর টাকা পয়সা সব ব্যাঙ্কে আছে?” এই সময় এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে অবাক হয় অমিতাভ। কি ভাবছে আনু? সাথীর মৃত্যুকে খুন ভাবছে?রূপেশকে খুনি ভাবছে? রূপেশের কান্না তো আর ও দেখে নি।
সময় থেমে থাকে না। দিন সপ্তাহ মাস নিজের মত পেরিয়ে যায়। কয়েকমাস পর অমিতাভ কি একটা প্রয়োজনে পোষ্ট অফিস যায়। অমিতাভের এক বন্ধু অলোক এজেন্সি করে পোস্টঅফিসে ।সে অমিতাভকে ধরে পড়ল একটা কিষাণ বিকাশ পত্র করার জন্য।অমিতাভ বলল-“না বাবা, তোদের এই ছোট পোষ্টঅফিসে অনেক ঝামেলা।আমার ব্যাঙ্কই ভালো। এ তো ইচ্ছেমত ভাঙাতে পারব না।” অলোক বলল-“কে বলল ভাঙাতে পারবি না?এই তো তোর ভাগ্নির অত্তগুলো টাকা ভাঙিয়ে দিলাম না? প্রায় আটলাখের উপর টাকা।” অমিতাভ অবাক হয়। সাথী টাকা ভাঙিয়েছিল? কিন্তু কেন? অলোককে জিজ্ঞেস করতে ও বলল সাথী নাকি বলেছিল কি শেয়ারে ইনভেস্ট করবে। অমিতাভর সাথে ব্যাঙ্ক ম্যনেজারের ভালো সম্পর্ক। এবার ব্যাঙ্কে খোঁজ নিতে অমিতাভ জানলো সাথীর সেভিংস আকাউন্টে হাজার দশেক টাকা থাকলেও ফিক্সড একটাও নেই। সেদিন সন্ধ্যায় অমিতাভ আনুর বাড়ি গেল। অমিতাভের অস্থিরতা আনুর নজর এড়ালো না।কফিতে চুমুক দিতে দিতে আনু প্রশ্ন করল-“ব্যাঙ্কে টাকা নেই বুঝি?” অমিতাভ ইতস্ততভাবে বলল-“না মানে ওরা শেয়ার কিনেছিল।” আনু আস্তে আস্তে বলল-“ওরা না রূপেশ?”
কাঁটা একটা বিঁধেই রইল।দুমাস পর হঠাৎ একদিন উত্তেজিত ভাবে অমিতাভের ফোন এল আনুর কাছে। রূপেশ ফোন করেছিল। সাথীর বাড়িটায় সর্বত্র সাথীর স্মৃতি। রূপেশ সহ্য করতে পারে না।তাই ওই বাড়ি সে বিক্রি করে দিতে চায়।বাড়ির দলিল অমিতাভের কাছে। তাই অমিতাভের সঙ্গে দেখা করতে চায়। আনু বলল -“ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে। ” আনু গোপাকে ফোন করল। আনফিসিয়ালি ছেলেটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে। দুদিন পর আনুর বাড়িতে আনু অমিতাভ গোপা আর মিতু বসল আলোচনায়।
গোপা খোঁজ নিয়ে জেনেছে রূপেশ আজকাল বেশ রাজসিক ভাবে জীবন কাটাচ্ছে। প্রচুর ড্রিঙ্ক করে। একটি মেয়ের সাথে ঘনিষ্ট ভাবে মেলামেশা করতেও দেখা গেছে। এক প্রমোটার বন্ধুর সাথে প্রায়ই মিটিং হচ্ছে। আনু গম্ভীর ভাবে বলে-“বৌ এর শোকে কান্নাকাটি সবটাই তবে নাটক। টাকা আগেই নিজের নামে করেছে। বাড়ির দলিল নিজের কাছে থাকলে বিক্রির ব্যবস্থা নিজেই করত। জানত না যে সাথী মামার জিম্মায় রেখে গেছে দলিল।” মিতু সবটা জানত না। সবটা শুনে ওর আপাত সুস্থ জীবনে প্রতিক্রিয়া দেখা দিল।চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। মুখে একটাই কথা-“লোকটাকে মেরে ফেল। ও পুড়িয়েছে।আমায় জ্বালিয়েছে। ওকেও জ্বালিয়ে দাও।” আনু ওকে বোঝায়-“শান্ত হ মিতু,রূপেশ তোকে জ্বালায়নি। জ্বালিয়েছে সাথীকে। তাছাড়া সবটাই আমাদের অনুমান। এমনও তো হতে পারে দুর্ঘটনাটা ভুলতে মদ খায়। সত্যি হয়ত বাড়িটাতে সাথীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে বিক্রি করে চলে যেতে চায়। সাথী নেই বলে রূপেশ সারাজীবন একা কাটাবে এটা তো হয় না। আমরা প্রথম থেকে রূপেশ কে খুনি ধরে এগোব না। শুধু খোঁজ খবর নেব। ” অমিতাভের কাছে সাথীর বাড়ির ডুব্লিকেট চাবি আছে সেটা রূপেশ জানে না। এই সুযোগটাই নিল আনুরা। একদিন সন্ধ্যাবেলা আনু মিতু আর অমিতাভ গেল বাড়িটায়। বাড়িটায় এসে অমিতাভ খুব আপসেট হয়ে গেল। আনু আর মিতু ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখতে লাগল। মিতু যেন কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ল।দোতলার ঘরে টেবিলের উপর রাখা স্মিত হাস্যমুখী মেয়েটার ছবির দিকে মোমের আলোয় বহুক্ষণ চেয়ে রইল।পুড়ে মরে গেছে। নিজের অজান্তেই নিজের পোড়া গালে হাত বোলায় মিতু। আনুপিসি ওকে ডেকে নিয়ে যায়। আনুপিসি একটা ডাইরী পেল সাথীর আলমারি থেকে। সাথীর ডাইরী। সন্দেহজনক কিছুই নেই। রোজকার খুঁটিনাটি কথা। তবে বোঝা যায় রূপেশকে সাথী খুব ভালোবাসত। রূপেশ কি খেতে ভালোবাসে, রূপেশ কেমন করে তাকায়, কেমন করে হাসে, সাথীর কি মনে হয়, সাথী কি রান্না করবে, কি কি কিনল, মাসকাবারি হিসাব এইসব। সাথীর লেখা থেকে ওরা জানল শেয়ার রূপেশের নামেই কেনা হয়েছিল। সাথী লিখেছে রূপেশ আর সে কি আলাদা? রূপেশ দাঁড়াতে চাইছে,সাথীকে তো ওর পাশে থাকতেই হবে।আনুপিসি আগাগোড়া খুব মন দিয়ে ডাইরী পড়ল। আর মিতু মন থেকে অনুভব করছিল।আনুপিসি এবার পাড়ায় খোঁজখবর করতে চাইলেন। মিতু একটা নামী শ্যাম্পু কোম্পানীর সেলসগার্ল হয়ে বাড়ি বাড়ি ফ্রি স্যাম্পেল দেবার আছিলায় খোঁজ নিতে লাগল। কেউই রূপেশের বিপক্ষে কিছু বলল না। ওদের কখনো ঝগড়া হয়নি। সাথী আর রূপেশ সুখী দম্পতি ছিল। মিতু মুদির দোকানে জিনিস কেনার বাহানায় কথায় কথায় খোঁজ নিতে লাগল। মুদি লোকটি সরল।বলল-“কপাল দিদিমনি কপাল। মাত্র কয়েকদিন আগে সাথীদিদি মাসকাবারি মশলা কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন জামাইবাবু অল্প অল্প করে মশলা নিলেন। অল্প অল্প বলে মেপে ওজন করে দিতে সময় লেগে গেল। আর যদি একটু আগে জামাইবাবু বাড়ি যেতেন তবে দিদিটাকে বাঁচানো যেত।” এবার মিতু বাচ্চুদার পানবিড়ির দোকানে গেল খোঁজ নিতে। মিতু দুপুরদুপুর এসেছে। অন্য সময় দোকানে লোকের ভীড়। কথা বলা যায় না।এখানে কি কিনবে মিতু।ও একটা কোল্ডডিংঙ্ক নিল। মিতু এসব খায়না। ওর ঝাঁজ লাগে। আস্তে আস্তে খেতে লাগল। বাচ্চুদা সুপুরি কাটছে। মিতু জিজ্ঞেস করল-“আপনাদের পাড়ায় ওই দিকের বাড়িটায় একটা বৌ পুড়ে মরে গিয়েছিল না? আত্মহত্যা নাকি?” বাচ্চুদা হাতের সুপুরি কাটা থামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিতুর দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল-“কে বলল আত্মহত্যা? পুলিশ বলছে এক্সিডেন্ট।” মিতু বলল-“বাড়িতে কেউ ছিল না নাকি?” বাচ্চুদা বলল-“কেন যেখানে খবর পেয়েছেন সেখানে শোনেননি?” মিতুর অস্বস্তি লাগছে। সবাই কেমন ঠিকঠাক উত্তর দিল।মিতু বলল-“না মানে খবরেকাগজে পড়েছিলাম।ছোট্ট করে বেরিয়েছিল খবরটা।ডিটেলস লেখেনি।”বাচ্চুদা সুপুরি কাটতে কাটতে বলল-“কোন কাগজ?” মিতু ঢোঁক গিলে বলল-“আনন্দবাজার।” বাচ্চুদার ঠোঁটে বাঁকা হাসি দেখা গেল।বলল-“খবরটা বর্তমানে বেরিয়েছিল।” মিতু বিষম খেল। বাচ্চুদা বলল-“আহা আস্তে আস্তে।অভ্যেস নেই।” কোল্ডড্রিংকের বোতলের শেষে তখনও অনেকটা তরল রয়েছে। মিতু বোতল নামিয়ে দিল। বলল-“না আসলে বাড়িটা কিনব ভাবছি। তাই খোঁজখবর নিচ্ছিলাম আর কি।” বাচ্চুদার হাতে টাকা দিল মিতু। বাচ্চুদা টাকাটা হাতে নিয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন-“বাড়িটা তবে ওরা বেচেই দেবে। আমিও এটাই ভাবছিলাম।” মিতু বলল-“কেন দাদা একথা বলছেন?” বাচ্চুদাএকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-“সত্যি কিনবে বাড়িটা?” বাচ্চুদার চোখের দিকে তাকিয়ে নেতিবাচিক ঘাড় নাড়ল মিতু।বাচ্চুদা বলল-“কে পাঠিয়েছে তোমায়?অমিতবাবু? ওরাও কি তবে সন্দেহ করছে?” মিতু বলল-“কেউ পাঠায়নি। আমি নিজেই খোঁজ নিচ্ছি।” বাচ্চুদা বলল-“তুমি বাচ্চা মেয়ে পারবে?” মিতু দৃঢ় ভাবে ঘাড় নাড়ে বাচ্চুদা বলে -“সাথী দিদিভায়ের দাদু আমার বড় উপকার করেছিলেন। রকে বসতাম। মাথার উপর চাল ছিল না। উনি টাকা দিলেন। দোকান করলাম।কোনদিন সে টাকা ফেরত চান নি। আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসতাম। মেয়েটা বড় ভালো ছিল।শান্ত ভীতু ভদ্র। বিয়ের সময় জামাই দেখেই আমার পছন্দ হয়নি। মেয়ে দেখতে খুব সাধারণ।আর ছেলে অপূর্ব সুন্দর। কেমন মনে হয়েছিল পয়সার জন্য বিয়ে করছে। দুর্ঘটনার দিন সকালে জামাইবাবু আমার দোকানে এসেছিলেন।সিগারেট কিনতে। পয়সা দেবার সময় ওনার প্যান্টের পকেটে আমি সিগারেটের প্যাকেট দেখেছিলাম। পাড়ার গদাই ওদের বাড়ি কাগজ দেয়। সেদিন উনি বললেন গদাই কাগজ দেয়নি।আমি দোকানে আনন্দবাজার বর্তমান দুটো কাগজই রাখি। খদ্দের টানে। সেদিনও দুটো কাগজই রেখেছিলাম। ওরা আনন্দবাজার নেয়।কিন্তু জামাইবাবু বর্তমান টেনে নিলেন। অথচ সেদিন আনন্দবাজারের ফ্রন্টপেজে ভারত পাকিস্তানের বড় খবর ছিল। উনি বেশ কয়েকবার ঘড়ি দেখেছিলেন। পরে আমার কেমন মনে হয়েছিল উনি প্রমাণ রাখছিলেন। দুর্ঘটনার সময় বাড়ির বাইরে থাকার প্রমাণ। আমি বিকেলে গদাইকে বলেছিলাম আজ কাগজ দিতে গেলি না বলে সাথীদিদিভাইকে শেষ দেখাটা দেখতে পেলি না। গদাই বলেছিল ও কাগজ দিয়ে এসেছিল।দিদি রান্নাঘরে ছিল বলে জামাইবাবুই কাগজ নিয়েছিল।খুব বাজে ভাবে পুড়ে গিয়েছিল মেয়েটা।”
ওরা দুজনেই খানেকক্ষণ চুপ করে থাকে।মিতু রোদ চশমা খুলে চোখ মোছে। বাচ্চুদা দেখে স্কার্ফ জড়ানো রোদচশমা পরা মেয়েটির গালের একদিক পোড়া। আর সেখানে গড়িয়ে পড়ছে জলের ফোঁটা। বাচ্চুদা বলে-“দিদিভাই…”
মিতু বলে-“আচ্ছা চলি দাদা।
অনেক উপকার করলেন।আবার দরকার হলে আসব।”
বাচ্চুদা বলল-“নিশ্চয় আসবেন দিদি। যতটুকু সাধ্য করব।”
আনুপিসিকে সবটা বলে মিতু। আনুপিসির মুখ শুনতে শুনতে লাল হয়ে যায়। একটু চুপ করে থেকে আনুপিসি বলে-“কাল অমিতের সাথে সাথীর বাড়ি গিয়ে তুই দেখবি মশলার কৌটোগুলো। এমনও হতে পারে হয়ত কেউ এসেছিল। বেশী রান্না হয়েছিল। মশলা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কোন সন্দেহের অবকাশ রাখব না মনে।”
মিতু বলে-“কাল নয়, আজই যাব।” সেদিন একটু রাত করে ওরা গেল। মিতু দেখল পরীক্ষা করে।রান্নাঘরে কিছু কৌটো আগুনে পুড়ে গেছে। কিন্তু কিছু কৌটো এখনো অক্ষত আছে। তার ভিতরে মশলা রয়েছে পোকা লাগা। মোটামুটি যে কটা শিশি হাতে পেল সবগুলোই অর্ধেকের বেশী ভর্তি।সোফার নীচে প্লাস্টিকের ব্যাগে কিছু খুচরো মশলার প্যাকেট পেল মিতু। এটাই সম্ভবত রূপেশ নিয়ে ঢুকেছিল।
আনু অমিত গোপা বিশ্বনাথ মিতু সবাই বসেছিল।কেউ কোন কথা বলতে পারছিল না।অমিতই নীরবতা ভেঙে কান্না ভেজা গলায় বলল-“কোন সন্দেহ নেই তবে? এটা খুন?” আনু ঘাড় নাড়ল।কান্নায় ভেঙে পড়ল অমিতাভ। “আমি মেয়েটার কি সর্বনাশ করলাম। কেন বিয়ে দিলাম আমি মেয়েটার।”
আনু স্বান্তনা দেয়-“তুমি কি জানতে বল যে রূপেশ অমানুষ।”
বিশ্বনাথ বলে-“কিন্তু এতো মেনে নেওয়া যায় না।এর শাস্তি চাই।” গোপা বলে-“আইনের পথে কিছু করা যাবে না। কোন প্রমান নেই। একমাত্র পথ স্বীকারোক্তি। বে আইনী ভাবে তুলে এনে রাম ধোলাই দেব। সত্যিটা স্বীকার করলে তারপর আইনের পথে শাস্তি।” অমিতাভ বলে-“আমার ইচ্ছে করছে রূপেশ কে গুলি করে মারতে।” মিতু বলে-“না কাকু গুলি নয়।ওর উপযুক্ত শাস্তি ওর গায়ে কেরোসিন ঢেলে ওকে জ্বালিয়ে দেওয়া।তোমরা না পারলে আমায় বল। আমি ঠিক পারব।” ধমকে ওঠে আনু-“আ:,তোমরা কি খুনী?অমিত গোপা তোমরা না আইনের রক্ষক। কোন কাজ বে আইনী করব না। আচ্ছা বিশ্বনাথ দা কোন ভাবে ভয় দেখিয়ে বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে কি রূপেশের থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব?” বিশ্বনাথ একটু মাথা নীচু করে থাকে।তারপর বলে-“অসম্ভব নয়।তবে হবেই কিনা বলা যায় না। ফিফটি ফিফটি চান্স।” আনু বলে-“তবু সেই চান্সটা একবার নিয়ে দেখাই যায়। ওরা সোজা হয়ে পরস্পরের দিকে তাকায়।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।