গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী (পর্ব – ৩৯)

নীল সবুজের লুকোচুরি
অবশ্য আয়ান যেদিন বিদেশের পথে পারি দিয়েছিল সেদিন সুমিতা খুব কেঁদেছিল। তারপর থেকে একা একা রাতের পর রাত জেগে থাকত। আয়ানের ভালোবাসা গায়ে মেখে ছিল বলে নিজেকে নিজের হাতে জড়িয়ে রাখত। আয়ানের ছোঁয়া টুকু আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রাখার চেষ্টা করত। তখন ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে ওয়াশরুমে গিয়ে মাঝে মাঝেই এরকম করত। কলিগরা অনেকেই ওর এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিল। তবে সুমিতা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সারা দেহ মন জুড়ে আয়ানের উপস্থিতিটুকু বাঁচিয়ে রেখেছিল বছরের পর বছর ধরে।
————
সময়ের সাথে সাথে জীবনের মানে বদলে যায়। দীর্ঘদিন দুরে থাকতে থাকতে সম্পর্কের সুতোটাও কোথাও না কোথাও আলগা হয়েই যায়। প্রচলিত প্রবাদেই আছে,out of sight out of mind. আসলে সম্পর্কগুলো এরকমই হয়। চোখের আড়াল হলে ধীরে ধীরে মনেরো আড়ালে চলে যায়। আগেকার দিনে তাই পারিবারিক বাঁধন শক্ত রাখতেই ‘একান্নবর্তী পরিবার’ -প্রথার প্রচলন ছিল। এক একটা বাড়ি ছিল সম্পর্কের স্বয়ং সম্পূর্ন ভান্ডার। ঠাকুরদা’, ঠাকু’মা, জ্যাঠা, কাকা, মাসি, পিসি, মামা, মামি, দাদু-দিদা আর সবার সাথে জড়িয়ে থাকত মিষ্টি মধুর “তুতো” সম্পর্কগুলো। আর এত রকম সম্পর্কের দাদা-দিদি, ভাই বোনেরা নিজেরাই ছিল একে অপরের ভীষন আপনজন- কাছের মানুষ। কচিকাঁচারা অনেক সময়ে হয়তোবা কিছু ভুলচুক করে ফেলত। অনেক অশান্তিও হতো। তবে তাই নিয়ে বড়দের মধ্যে কখনো দূরত্ব তৈরি হয়নি। সংসারের একজোট হয়ে থাকতে তারা জানত আর তাদের ভালোবাসার বাঁধনও ছিল শক্ত। যতই অশান্তি হোকনা কেন পরিবার পরিজনেরা কেউ কাউকে ভুলে থাকতে পারতনা। যে কোন রকম পরিস্থিতিতে একে অপরের সাথে থাকত। দুঃখ সুখের সমান অংশীদার ছিল সকলে। মনের কথা বলার সুযোগ ছিল বলে মানসিক চাপ তৈরি হতনা। সংসারে শিশু থেকে বয়স্ক মানুষ সকলেই মনের কথা বলতে পারত। সেইজন্যই বোধহয় আগেকার দিনে “মানসিক অবসাদ” নামের কোনো অসুখের কথা কেউ কখনো শোনেনি। শারীরিক ও মানসিক ভাবে সুস্থ ছিল সবাই। অবশ্য মানুষের অবদমিত কামনা বাসনা কখন যে কিভাবে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে কেউ জানেনা। আর কখন কি ভাবে সেগুলো সামনে এসে হাজির হবে সেগুলোও আগে থেকে জানা যায় না।
আসছি পরের পর্বে