সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রঞ্জন চক্রবর্তী (পর্ব – ৮)

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

আঞ্চলিক উপন্যাসে কোনও একটি বিশেষ অঞ্চলের ঐতিহ্য, সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কার ইত্যাদি বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। Thomas Hardy ও Arnold Bennet-এর উপন্যাসগুলিতে একটি বিশেষ অঞ্চলের ঐতিহ্য ও জনজীবনে ঐ অঞ্চলের প্রভাব খুব স্পষ্ট। Hardy-র রচনা পাঠ করলে Wessex-এর ছবি যেন চোখের সামনে ভাসে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’ সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাস। তাছাড়া সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’, অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘গড় শ্রীখণ্ড’ এই শ্রেণীর উপন্যাসের মধ্যে পড়ে।
গোয়েন্দা, অভিযান ও রহস্যকাহিনীমূলক উপন্যাস পাঠকমহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। রহস্য-রোমাঞ্চধর্মী উপন্যাসের প্রথম নিদর্শন মেলে দুটি রচনায় –Robert Louis Stevenson-এর ‘Treasure Island’ (১৮৩৩) এবং Wilkie Collins-এর ‘The Moonstone’ (১৮৬৬)। Sir Arthur Conan Doyle রচিত ‘A Study in Scarlet’ (১৮৮৭), ‘The Sign of Four’ (১৮৯০), ‘The Hound of Baskerville’ (১৯০২) এবং ‘The Valley of Fear’ (১৯১৫) জনপ্রিয়তার বিচারে অনেকটাই এগিয়ে এবং তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র Sherlock Holmes-এর জনপ্রিয়তা আজও অটুট। Dorothy L. Sayers সৃষ্ট গোয়েন্দা Lord Peter Wimsey-ওঅত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র। এছাড়া Agatha Christie দুটি অমর চরিত্রের স্রষ্টা – HerculePoirot ও Miss Marple। বাংলায় এই শ্রেণীর রচনার মধ্যে পাঁচকড়ি দে-র লেখা রহস্য-কাহিনী একসময় জনপ্রিয়তা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর রচনার সহিত্যমূল্য কতখানি সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় গোয়েন্দা কাহিনীকে যথার্থ সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্র সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী বাংলা সাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
উপন্যাস মূলগতভাবে বাস্তবনির্ভর, কারণ কোন লেখকের পক্ষেই সমকালীন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। লেখক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি দিয়ে বিচার করে মানুষের জীবনের নানারকম সমস্যাকে উপন্যাসে ভাষারূপ দেন। উপন্যাস ষেহেতু সমকালীন সমাজ ও মানুষের জীবনের কথা বলে সেহেতু লেখকের বাস্তবতার বোধ একটি নির্দিষ্ট কালসীমা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।সমকালকে উপেক্ষা করলে উপন্যাসে সার্থকতা আসেনা। যুগচেতনা ও যুগবৈশিষ্ট্য এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সমকালীন সমাজের আয়নায় যুগবৈশিষ্ট্য প্রতিবিম্বিত হয়। উপন্যাস সমাজবদ্ধ নরনারীর সুখ-দুঃখের অভিব্যক্তি, যে সমাজ ক্রমবিকাশের ধারা অনুসরণ করে এগিয়ে চলে।
উপন্যাস যুগসত্যকে প্রকাশ করে এবং যুগসত্য দেশ, কাল, সমাজ ও ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। উপন্যাসে কালের সত্য ও কালাতীত সত্য সমন্বিত রূপে প্রকাশ পেলেও তুলনায় কালের সত্য ব্যাপকতর। আসলে চিরকালীন সত্য এবং লেখকের সমকালের সত্য দুটিই একইরকম গুরুত্ব দাবী করে, যে কারণে সমকালের বর্ণনার মাধ্যমে মহান ঔপন্যাসিক চিরকালীন আবেদন সৃষ্টি করেন।যে উপন্যাস চিরকালীন রূপলাভের জন্য সমকালকে উপেক্ষা করে তা যেমন কখনই উপন্যাস হতে উঠতে পারে না, তেমনই সমকালকে ধরার জন্য যে উপন্যাস চিরকালীন সত্যকে এড়িয়ে চলে তা কখনও শিল্পরূপ লাভ করে না।উপন্যাসের সাথে সমাজের যোগ সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমের থেকে বেশী ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণ এই সাহিত্যরূপটি সমাজের মধ্যে অবস্থিত মানুষের কথাই বলে।কালের পরিবর্তনের সঙ্গে মানসিকতারও পরিবর্তন হয়, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠকরুচিও বদলায়। প্রতিটি যুগের সমাজেরই কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকে। তাই উপন্যাসের সঠিক মূল্যায়ন করতে হলে সমাজতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে সমকালীন যুগপরিবেশ উপলব্ধি করা প্রয়োজন। উপন্যাসের সত্যদর্শন বলতে যা বোঝায় তা হল প্রকৃতপক্ষে যুগপরিবেশের সঙ্গে একাত্মতাবোধ বা জীবনবোধ, যার উদ্ভব হয় ব্যক্তিমানুষ ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক থেকে। উপন্যাস রচনার সময় লেখকের মনে যুগচেতনা সতত ক্রিয়াশীল থাকে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।