মার্গে অনন্য সম্মান রীতা চক্রবর্তী (সেরার সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ১৩৪
বিষয় – একটি দুর্যোগের রাত

বুবি

চারদিকে এত ভাঙা গাছের ডালর মধ্যে দিয়ে সনাতন ভ্যান নিয়ে তাড়াতাড়ি হেলথ সেন্টারে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। দাইমা বুবিকে জড়িয়ে ধরে ভ্যানে বসে আছে। কালু, লতু, রসা, নিতু-আরো সবাই মিলে ভ্যানের আগে আগে চলছে চর্টলাইট হাতে নিয়ে। রাতের অন্ধকারে বৃষ্টি আর কনকনে হাওয়া কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। ইট বাঁধানো পথের ওপর গাছের গুঁড়ি, বাড়ির চালার টিন পরে আছে। সামনের সবাই রাস্তা পরিষ্কার করে চলেছে। যেখানে আটকাচ্ছে সেখানে সাত-আট জন মিলে ভ্যানটাকে কাঁধে তুলে পার করাচ্ছে। যদিও সরকারি দল রাস্তায় নেমেছে দুর্যোগের পর ক্ষয় ক্ষতি সামাল দিতে। কিন্তু আমাদের যে এক্ষুণি বুবিকে নিয়ে পৌঁছাতে হবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। সেই কখন থেকে অজ্ঞান হয়ে আছে মেয়েটা। কি যে হল কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। হয়ত মনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পরেছে তাই তলিয়ে গেছে, আর জাগছে না। আচ্ছা, বুবির যদি নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ে যায় তবে কি এই গ্রামের কথা ভুলে যাবে? ভুলে যাবে এতদিন এত মানুষের আদর যত্ন ভালোবাসার কথা? আর কি চিনতে পারবে না এই মানুষগুলোকে? এই বুড়িদাইমা যে ওকে সেবা শুশ্রূষা করে ভাল করে তুললো, এতদিন ধরে নিজের সন্তানের মতো আগলিয়ে রাখল – সব ভুলে যাবে? কি জানি? বুড়িদাইমাও কি এখন এইসবই ভাবছে? তাই জন্যই কি অমন শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে বুবিকে? সত্যি আজ বিকেল পর্যন্ত আমাদের গ্রামটা কত শান্তিতে ছিল। আর সন্ধ্যাবেলার একটা তুফানি ঝড়ের পর অবস্থাটা বদলে গেল। এখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন – বুবি কি আর কাউকে চিনবে না? যদিও মুখে কেউ কিছু বলছে না তবে চোখের তারায় লেখা রয়েছে ভীষণ উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা। আমাদের সবারই মন খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু এসব ভেবে আর কি হবে! আগে বুবিকে ডাক্তার দেখানো হোক, তারপর যা হয় হবে!
আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ চারদিক অন্ধকার করে ঝড় উঠল সাথে ভীষণ বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। ঝড়ের দাপটে বৃষ্টির জলও ধোয়ার মত উড়ে যাচ্ছে। প্রচন্ড জোরে জোরে বাজ পরছে সাথে বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি। দীর্ঘ দিনের অসহ্য গরমে মানুষ একেবারে আধমরা হয়েছিল।
বিকেলে আকাশের ঈশানকোণের মেঘ দেখেই ঠাকুরর্দা হেঁকে বলল,”আইজ কেও যেন বাহিরে না যায়। সব আপন আপন ঘরকে এককাট্টা থাইকবে।” এই ঝড়ের মধ্যেই বুবি ছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে খুব চিৎকার করছে। বলছে, “রাইক্কসী ফিন আসিচে। ইবার মোকে লিইঁ লে কেনে!”
বুবি আমাদের গ্রামের কুড়িয়ে পাওয়া বৌ।
আম্ফানের ঝড় থেমে যাবার পর আমাদের গাঁয়ের চিকড়ি নদীর ধারে বুবিকে পাওয়া যায়। একটা শাড়িপরা শরীর উপুর হয়ে পরে থাকতে দেখে গ্রামের মানুষ ভিড় করে এসেছিল। সবার সামনে বুড়িদাই গিয়ে শরীরটাতে হাত রাখে আর চিৎকার করে বলে, “মরে লাই গো, ইটি জীয়ন্ত আছে। ইয়াকে তুলি লাও হেঁ। ঘরকে লিয়ে চল। মন বুইলছে বাঁইচবেক মিয়াঁটো।” সেই থেকেই বুবি বুড়িদাইমা’র কাছে আছে। কোথায় বাড়ি, কি নাম – কিছুই মনে করতে পারেনা। কারো সাথে কথাও বলে না। তাই ওকে সবাই বুবি বলেই ডাকে। আজ এমন চিৎকার করতে দেখে আমরা সবাই অবাক হয়ে ঘরের বাইরে চলে এসেছি। বুবি কাঁদছে,” আমার মানিক ভাইসে গেল গো। রাইক্কসী লদীটো আমার কোল থিকা ছিনাই লিলেক, উয়াকে আইন্নে দাও। আমার মানিক, আমার রাজা। ঘরটো ভাইঙে যখন লদীতে পৈল্ল মা বেটাতে শুখা পাতার মতন ভাইসে গৈলোম আর আচানক ছিটকাই গেল বেটা আমার হাত হৈথে। রাইক্কসী আমার ছিলাটোকে ছিনাই লিলেক।” আমরা সবাই বুবির কান্না দেখে দিশেহারা হয়ে পরেছি। কিছুতেই বুবিকে শান্ত করা যাচ্ছেনা। বুড়িদাই ওকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রয়েছে। ধীরে ধীরে দাইমা’র কোলের মধ্যেই বুবি জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পরে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।