গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী (পর্ব – ৩)

নীল সবুজের লুকোচুরি
-সাবজেক্টও একই ছিল বলে পড়াশোনার কারণে একে অপরের কাছে যখন তখন হাজির হওয়াটা ছিল খুবই স্বাভাবিক।…..
সুমিতার মাঝে মাঝে সাবজেক্ট কনসেপ্টকে ইজি টু স্টাডিজের জন্য আয়ানকেই খুব দরকার হত। কিন্তু ডিপার্টমেন্টে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন সুমি সোজা গিয়ে হাজির হত সিনিয়র্স কোয়ার্টারে। ওখানে আয়ানের রুমে যেতে ওর কোন বাধা ছিল না। কলকল ছলছল করতে করতে স্বরচিত ডায়লগে বকবকম পায়রার মত ‘সুমি’ র আবির্ভাব ঘটত প্রায় প্রতিদিনই।
‘আই’ মনে মনে অপেক্ষা করে থাকত এরকম মুহূর্তগুলোর জন্য।
যদিও মুখে বলত, “আমি তো যেতাম একটু পরেই। তুই শুধু শুধু এতটা কষ্ট করতে গেলি কেন!”
আয়ানকে বাড়িতে সবাই ‘আই’ বলেই ডাকে। সুমিতাও ওই নামেই ডাকত। আর সুমিতাকে সবাই ‘সুমি’ বলেই ডাকে, বাড়িতেও আর এখানেও।
সুমি সবার সাথে মিষ্টি হেসে কথা বলে। সবার সাথে মিলেমিশে হৈ হৈ করতে পারে আবার সুবিধা অসুবিধা, দুঃখ সুখে সবার সাথে আছে। তাই হসপিটালে সবাই ওকে খুব ভালবাসে।
‘আই’ আর সুমি’ ক্লোজফ্রেন্ড এটা তো সবাই জানে। ওরা একসাথে ছুটিতে বাড়িতে যায় আবার একসাথে ফিরে আসে। দেশের বাড়ির সূত্রধরে একটা সম্পর্ক আছে বলে ওদের মেলামেশায় কারো বাড়তি কৌতুহল নেই। তাছাড়া ব্যাচমেটরাতো সকলেই ওদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড জানে। এটাও জানে যে ওরা ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছে। তাই কেউ কখনও ওদের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে কোনো উৎসাহ প্রকাশ করে না।
আয়ানের আপাত শান্ত গভীর দুটো চোখ শুধু সুমিকেই খুঁজত সেই কিশোর বয়স থেকেই। যখন ওর দাদার সাথে ওদের বাড়ি যেত তখন সুযোগ পেলেই সুমির সাথে গল্প করত। অবশ্য সুমিও যে ওর সাথে কথা বলতে ভালবাসে সেটা খুব বুঝতে পারত আই’। তবুও কখনো এমন কিছু করেনি যাতে নিজের অথবা সুমির সম্মানে আঘাত লাগে। সংযত কিন্তু গভীর ভালোবাসা দিয়ে আই’ তার সুমি’কে আগলে রাখত। ছোটবেলা থেকেই সুমি’র এই একা একা কথা বলা আই’র ভালোই লাগত। সুমির এটা ছিল আই’র কাছে আসার একটা সহজ উপায়। তাই হাসি মুখে চুপচাপ দেখত আর শুনত ওর সব কথা। তখন থেকেই সুমি’র এই সোচ্চার কর্তৃত্বকে মেনে নিয়েছিল ভালোবেসে ।
সুমিতার সুবিধা অসুবিধা, হাসি কান্না, অদ্ভুত অদ্ভুত আব্দারগুলো রক্ষা করাটা ছিল যেন আয়ানের কর্তব্য। আর আয়ানের দরকারী জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখা, ভালো লাগা-মন্দ লাগার খেয়াল রাখা, ছোটখাটো ফাইফরমাশ রাখা যেন সুমিতার দায়িত্ব। এইভাবেই ওদের দিন কেটে যাচ্ছিল। সদ্য যৌবনের দখিন হাওয়া পালে লেগে কখন যে একে অপরের খুব কাছে চলে এসেছে নিজেরাও জানেনা।
সুমি’র শাসন আর আই’ এর ঠোঁটের কোণে আলগা হাসির প্রশ্রয়ে দুজনার মনের কথা হয়তো চোখের তারায় ফুটে উঠেছিল কিন্তু মুখ ফুটে বলা হয়ে ওঠে নি।
এভাবেই আয়ানের ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শুরু হল।সুমি’র ব্যস্ততা সীমাহীন। আই’এর যেন কোথাও কোনও অসুবিধা না হয় গার্জেনের মতো সেদিকে নজর রেখেছিল। পরীক্ষা শেষে বিদেশ যেতে হবে উচ্চশিক্ষার জন্য। ওর বাবার একান্ত ইচ্ছে ছেলে বিলেতফেরৎ ডাক্তার হবে। সেই ইচ্ছের মর্যাদা দিতে এবার এখান থেকে চলে যেতে হবে।
যাবার কয়েকদিন আগে থেকেই সুমিতা আয়ানের রুমে গিয়ে একটু একটু করে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। সুমিতা যখন এইসব কাজ গুলো করত আই’ রোজই একভাবে তাকিয়ে দেখে যেত সুমি’কে। কত যত্ন করে প্রতিটা জিনিস গুছিয়ে দিচ্ছে যাতে আয়ানের খুঁজে পেতে অসুবিধা নাহয়। আয়ানের মনে কিন্তু বিদেশে পড়তে যাবার জন্য কোন আনন্দ নেই। বরং একটা অদ্ভুত ধরনের কষ্ট হচ্ছে সুমিতার কাছ থেকে দুরে চলে যেতে হবে বলে। ……