T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় রণিত ভৌমিক

 শ্রাবণের শেষে

“Beauty is truth, truth beauty,—that is all
Ye know on earth, and all ye need to know.”
– John Keats

খাবার টেবিলের অপর দিকের দেওয়ালে টাঙ্গানো পেইন্টিংয়ের নিচে জন কিটসের লেখা এই দুটো লাইন আমাকে এক ঘোরের মধ্যে নিয়ে চলে গেছিল। খাবার চামচটা মুখ অবধি না পৌঁছে, হাতের মধ্যেই থমকে গেছিল। সেই ঘোর অবশ্য কাটল মায়ের ডাকে,
– কীরে, ওইভাবে বসে আছিস কেন? ঘড়ির কাঁটা তো আর থেমে নেই।
হ্যাঁ! মা ঠিকই বলেছে। ঘড়ির কাঁটা কারোর জন্যই থেমে থাকে না। যতই বুকটা ফেটে যাক না কেন, আমাদের যে জীবনের নিয়ম অনুযায়ী চলতে হবে। অতএব দেরি না করে ঝটপট ব্রেকফাস্টটা সেরে রেডি হয়ে নিলাম।
বেরনোর আগে মা আবারও কথাটা বলল,
– বাবু, সিদ্ধান্তটা বদলানো যায় না? সব শেষ করার আগে তোরা আরেক বার ভেবে দেখিস।
– (আমি বললাম) হুম। চেষ্টা করব। তবে, কি বলত মা। জোর করে কাউকেই যে নিজের কাছে ধরে রাখা যায় না। আমার ইচ্ছা থাকলেও, তার যে আর নেই।
কথা শেষ করেই ঝড়ের গতিতে বেড়িয়ে গেলাম। আজ যে আমার আর রিয়ার দু-বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানার দিন। তাকে তাড়াতাড়ি ছুটি দিতে হবে যে!

——(১)——–
ভালোবাসা শব্দটা খুবই অদ্ভুত। কারোর জীবন গড়ে দেয়, তো কারোর জীবন আবার ধ্বংসও করে দেয়। পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হলেও, লেখালিখি আমার বরাবরের নেশা। লেখক হওয়ার জন্য যে লেখা শুরু করেছিলাম, তেমনটা নয়। কিন্তু সময়ের হাত ধরে কখন যে ভাগ্যের চাকাটা আমাকে লেখার জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলল, বুঝতে পারিনি। তবে, সাহিত্য জগতে পা দেওয়ার সাথে সাথেই যে সাফল্য এসেছে, এমনটা বললে ভুল হবে। পাঠক-পাঠিকাদের মনে স্থান করে নিতে আমার অনেকগুলো বছর লেগে গিয়েছিল। কিন্তু একবার তাঁদের মনে স্থান পাওয়ার পর, আমাকে আর পিছনের ফিরে তাকাতে হয়নি। ওইসময় চাকরি সামলে লেখার কাজ চালানো আমার কাছে বড়ই চ্যালেঞ্জিং ছিল। দু-দিক সামলে কোনও মতে জীবনটা এগিয়ে নিয়ে চলেছি, এমন সময় আমার জীবনে রিয়ার আবির্ভাব।
হ্যাঁ, রিয়া। ভালো নাম প্রত্যাশা। বর্তমান সময় দাঁড়িয়ে সে আমার স্ত্রী হলেও, সেই সময় ওঁর পরিচয় ছিল শুধুই প্রত্যাশা বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্রাবণ মাসের ওই দিনটা আমার আজও মনে আছে। রাতের দিকে আমি তখন ব্যস্ত লেখা নিয়ে, হঠাৎ ফেসবুকে একটা নোটিফিকেশন পেলাম। ওই প্রথম লেখা থামিয়ে গুরুত্ব দিলাম ফেসবুকের সেই নোটিফিকেশনকে। চমকে উঠলাম লেখাটা দেখে- ‘your friend request is accepted’…।
আমি অচেনা কোনও রমণীকে নিজে থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাবো, এটা আমার চরম শত্রুও বিশ্বাস করবে না। তাহলে ঘটনাটা ঘটল কীভাবে? যাজ্ঞে, ওই রহস্য সমাধান আজও আমি করতে পারিনি। তবে, পরদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফেসবুকে একটি বার চোখ রাখতেই এক অজানা ঢেউয়ে যেন ভেসে গেলাম। ফেসবুকের নিউজ ফিডে রিয়ার লেখা একটি কবিতা পড়ে আমি এতটাই মুগ্ধ হয়ে ছিলাম যে নিজের অজান্তেই তাঁর উদ্দেশ্যে একটি কমেন্ট লিখে ফেললাম। সেই কমেন্ট পড়ে রিয়াও রিপ্লাই করেছিল। পরদিন সকালে ওঁর রিপ্লাই দেখে মনের মধ্যে এক আলাদা অনুভূতি হয়েছিল আর তাই মনে সাহস রেখেই একটি ছোট্ট মেসেজে ওঁকে লিখে পাঠালাম।
– কবিতা আপনি ভালোই লেখেন। আপনার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা রইল।
সন্ধ্যাবেলায় রিয়ার উত্তর,
– ধন্যবাদ। অবশ্যই, আমারও আপনার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা রইল।
ব্যাস! ওই শুরু আমাদের কথোপকথন। আমি ফের লিখে পাঠালাম,
– আপনি কলকাতার কোথায় থাকেন?
– (বিস্তর ভাবে লিখে পাঠালো রিয়া) না, না। আমার জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা, পুরোটাই হাওড়ায়। বি গার্ডেনের কাছেই আমার বাড়ি। কখনও এসেছেন এদিকে?
– না, ওদিকে সেই অর্থে তেমন যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আমি ওদিকটা চিনি বলতে শুধুই দ্বিতীয় হুগলী সেতু দিয়ে কখনও যাওয়ার সময় চোখের সামনে যা দেখতে পাই, ওইটুকুই। বাই দা ওয়ে, আমার কথায় আপনি বিরক্ত হচ্ছেন না তো?
– এবাবাহ! না,না। বেশ ভালো লাগছে।
– না, মানে সেদিন আপনার লেখা কবিতাটা আমার ব্যক্তিগত ভাবে খুবই ভালো লেগেছিল। ভাবনাদের সঙ্গে লেখার একটা দারুন মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছেন। আমি কমেন্টও করেছিলাম দেখেছিলেন হয়ত।
– হ্যাঁ। আমি রিপ্লাইও করেছিলাম। আপনি তো একজন লেখক। আবার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারও বটে।
– হ্যাঁ। তবে, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারটা পেশাগত ভাবে ঠিক বললেও, লেখক শব্দটা আমি নিজের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে তেমন পছন্দ করি না। গল্প বলিয়ে বা স্টোরিটেলার বললে আমি বেশি খুশি হই। কারণ লেখক শব্দটার ভার অনেক।
– বুঝলাম। ভালো লাগল আপনার কথা শুনে। লেখালিখি জিনিসটা খুব ভালোবাসার আমার কাছেও।
আমাদের কথোপকথনগুলো ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে বাড়তে লাগল। লেখালিখি ও কাজের ফাঁকে রিয়াকে মেসেজ করার জন্য মনটা ছটফট করত। বুঝতে পারছিলাম, একা সঙ্গীহীন জীবনে হঠাৎ করে জোয়ার এসে আমায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।
——(২)——–
গাড়িটা রাস্তার অপর দিকে পার্ক করে, কোর্ট চত্বরে পা রাখলাম। আমার মতো বাঙালিরা সবসময় কোর্ট, পুলিশ স্টেশন এইসব জায়গা এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে আর তাই এমন জায়গায় পা দেওয়া মাত্র বুকটা কেমন যেন ভারি ভারি লাগছিল। যাইহোক, তখনও রিয়া এসে পৌঁছায়নি। উকিলের সঙ্গে কথা বলে কোর্ট চত্বরে একটি বিশাল বটবৃক্ষের তোলায় আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টি তখনও মেঘের গর্জনের আড়ালেই রয়েছে।
– কীরে, কৌশিক। তুই এখানে?
হঠাৎ করে একটা চেনা গলা আমার উদ্দেশ্যে ভেসে আসতেই চমকে উঠলাম। এদিক ওদিক চেয়ে দেখার আগেই একগাল হাসি মুখে নিয়ে দেবীপর্ণা আমার সামনে এসে দাঁড়াল। কলেজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে আবারও যে নিজের চোখের সামনে দেখতে পাব, কখনও ভাবিনি। রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বা বিয়ে হওয়ার আগে আমার জীবনে প্রেম বলতে এই দেবীপর্ণা, ভালো নাম দেবীপর্ণা সেনগুপ্ত। এখন অবশ্য ওঁর পদবিটা কি, সেটা জানি না। যাইহোক, প্রেমটা কলেজ ফার্স্ট ইয়ারে শুরু হলেও, ব্রেকাপটা কলেজ গণ্ডী পেরবার আগেই ঘটে গেছিল। আবার এতবছর পর দেখা।
আমাকে অবাক চোখে ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দেবীপর্ণা বলল,
– ওইভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমাকে চিনতে পারছিস না?
– না, মানে তুই এখানে? কতদিন পর তোর সঙ্গে দেখা।
– হ্যাঁ, রে। আসলে বাড়ির একটি সম্পত্তি সম্পর্কিত সমস্যার কারণে এসেছিলাম। তবে, ঠিকই বলেছিস। আমাদের সত্যি প্রায় ১০ বছর পর দেখা। ব্রেকাপের পর, তুই তো একেবারে কর্পূর মতো উবে গেলি। শুধু ফাইনাল ইয়ারে পরীক্ষার সময় তোকে দেখেছিলাম তারপর আবার আজ দেখা। যদিও বা সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে তোর ট্রেস পেয়েছি। কিন্তু ইচ্ছা করেই আর তোকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাইনি। এখন তো ইঞ্জিনিয়ারবাবু নামী লেখক।
– বাহ! এতদিন তার মানে আমাকে লুকিয়ে স্টক করতিস।
– হা-হা-হা! ভেরি ব্যাড জোক। এবার বল তুই এখানে কি করছিস? লেখকবাবু হঠাৎ কোর্টে?
এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে বৃষ্টি তখন সবে মাটি স্পর্শ করছে। সামনের চায়ের দোকানে আমি আর দেবীপর্ণা গিয়ে ঢুকলাম। গরম চায়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে বললাম,
– আজ আমার ডিভোর্সের ফাইনাল ডেট। আমি এসে পোঁছালেও, সে এখনও এসে পৌঁছায়নি। বরাবরের মতো আজও আমি দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষায়। শুধু তফাৎ – আগের অপেক্ষা গুলোয় মিশে থাকত ঘর বাঁধার স্বপ্ন, আর আজ ঘর ভাঙার যন্ত্রণা।
——(৩)——–
রিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা বকুলতলা মোড়ের নিকটবর্তী বাস স্ট্যান্ডে। হাওড়ার দক্ষিণ প্রান্তে এর আগে সেইভাবে কখনও যাওয়া হয়নি। ফলে, রাস্তায় গোটা দশেক পথযাত্রীকে জিজ্ঞেস করে তবেই পেরেছিলাম সঠিক স্থানে পৌঁছাতে। চেনা-পরিচিতদের হাতে ধরা পড়ার ভয়, আমরা বি গার্ডেন অর্থাৎ ওঁর বাড়ির কাছে দেখা না করে চলে গেছিলাম সামনের গঙ্গাঘাটে। বিকেলর আকাশে সূর্যের তখনও অস্ত্র যায়নি, কথায় কথায় এতদিন চেপে রাখা মনের কথাটা অবশেষে রিয়ার কাছে বলেই ফেললাম। তবে, একটু অন্য ভাবে।
– জানো তো রিয়া, অনেকদিন ধরে একটা লেখা মাঝ পথেই থমকে ছিল। আসলে প্রেমের গল্পে মনের অনুভূতিটাই আসল। অনুভূতিগুলো যখন কলমের কালিতে রূপ নেয়, তখনই প্রকৃত লেখাটা কাগজের সাদা পাতায় ফুঁটে ওটে।
– বুঝলাম। তা কি লিখলে এবার বলো?
– প্রেম হল শরতের মেঘের মত সাদা অনুভূতি। প্রেম হল সাদা কাশফুল, প্রেম হল সাদা শিউলি ফুলের মত সুন্দর। যখন দূর থেকে দেখি, ভীষণরকম আকর্ষণ অনুভব করি। আর এই দূর থেকে আকর্ষণ তৈরীটাই হল, প্রেম।
– আমি কিন্তু সত্যি তোমার লেখার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি, কৌশিক। তুমি মানুষটাও কি এমনই আবেগপ্রবণ নাকি এটা স্রেফ লেখার স্বার্থে, ওই চরিত্রগুলোর স্বার্থে?
রিয়ার কথাটা শোনার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। এতদিন ধরে মনের মধ্যে চেপে রাখা কথাগুলো যেন নিজের অজান্তেই তখন ডানা মেলে স্বাধীন আকাশে প্রকাশ হতে চাইছে। রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
– আমি প্রতিনিয়ত তুমি নামক নেশায় আটকে যাচ্ছি, রিয়া। জানি না এতে আমার কি দোষ? আমি নেশাতে পড়তে না চাইলেও, জোর করে নেশায় পড়ে যাচ্ছি। এটা যদি ক্ষতির কিছু হয়, তাহলে হোক ক্ষতি। কি এমন ক্ষতি হবে, তোমাকে দেখে কাছে পাওয়ার নেশা যদি চাপে?
ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা ওই হাঁসিটা আমাকে ওঁর মনের উত্তরটা পেতে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করায়নি। কারণ ওঁর ছোট্ট একটা জবাব,
– যদি আমার একটা উত্তরে তোমার থমকে থাকা লেখাটা আবারও শুরু হয়, তাহলে তাই হোক। একইসঙ্গে প্রাণ পাক তোমার কাল্পনিক আর এই বাস্তবের চরিত্ররা।
ওই শুরু আমাদের প্রেম, যা বিয়ে অবধি গড়াতে খুব বেশি সময় লাগল না। বছর দেড়েকের মধ্যেই বিয়ের বন্ধনে আমি আর রিয়া আবদ্ধ হলাম। প্রথম প্রথম সবটাই স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী কাটছিল। কিন্তু দাম্পত্য জীবন আর আগের জীবনের মধ্যে যে একটা পার্থক্য রয়েছে, সেটাই আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছি। কারণ যত দিন এগিয়েছে, ততই যেন আমাদের মধ্যে মতবিরোধগুলো আলোর মতো স্পষ্ট হয়েছে।
সুখ-দুঃখকে একসঙ্গে আলিঙ্গন করা। বৃষ্টির দিনে যদি ভেজা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়, তাহলে একে অপরের হাত ধরে হাঁটা। কখনো আবার প্রিয়জনকে ইচ্ছা করে রাগিয়ে দিয়ে, পরের মুহূর্তেই তাকে মানানো এবং তার মুখে সেই মিষ্টি হাসিটা দেখতে পাওয়া। আমাদের এইসব একে অপরকে করা প্রত্যেকটা প্রতিশ্রুতি যেন সেই সময় আমরা ক্রমশ ভুলতে শুরু করেছিলাম। আর তাই তো একটা ছোট্ট শব্দের অভাবে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে অনেকটা ফাটল ধরে গেছিল। হ্যাঁ, আমাদের দুজনের মধ্যে ওই ‘কম্প্রোমাইজ’ শব্দটির বড়ই অভাব ছিল বলে।
– কৌশিক, আজ তুমি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবে?
– হুম! চেষ্টা করব, তবে কথা দিতে পারছি না।
এই বলে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেছিলাম। তারপর রাতে যখন ফিরলাম, লক্ষ্য করলাম রিয়ার মুখটা বড্ড গম্ভীর। ওঁকে বলা আমার প্রত্যেকটা কথার শুধুমাত্র ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’ এর দ্বারাই জবাব মিলছিল। মুখ গুঁজে ফোন নিয়ে ওঁকে নাড়াঘাঁটা করতে দেখে বললাম,
– সারাদিন পর স্বামীটা ফিরল, এরপরও ফোন নিয়ে বসে থাকবে? স্বামীর প্রতি বুঝি দায়িত্ব বলতে শুধুই রান্না করে মুখের সামনে ধরা?
ব্যাস! কথাটা যেই না বলা। আগ্নেয়গিরি যেন জেগে উঠল। ফোনটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। সেইসঙ্গে ওঁর চিৎকার এবং এক একটা বাক্য যেন ঝরের গতিতে ছুটে এল আমার দিকে,
– তুমি কি ভেবেছে বলত? এতদিন ধরে সব চুপ করে সহ্য করে গেছি। আজও চুপ করেই ছিলাম। একটা মানুষ বিয়ের পর শুধুই কি চার-দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রয়ে যাবে? আমার কি অন্যকিছু ইচ্ছা করতে পারে না? আজ তারিখটা কি তোমার একবারও মনে আছে?
– মানে? আজ আবার কি দিন?
– তোমার যে মনে থাকবে, সেটা ভাবাটাই আমার ভুল হয়েছে। আজকের দিনে সেবার গঙ্গাঘাটে বসে যদি তোমার কথার জালে জড়িয়ে সম্পর্কে না জড়াতাম, তাহলে হয়ত আজ এই আক্ষেপটা আমাকে করতে হত না।
– আই এম সরি। আসলে কাজের চাপে…।
আমাকে কথাটা শেষ করতে দিল না রিয়া। সে নিজেই বলতে থাকল,
– ভোরবেলা ঘুম ভাঙতে না ভাঙতে, চোখে মুখে জল দিয়ে সোজা রান্নাঘর। সবজি বসিয়ে, আটা মাখা, চা বানানো, স্বামীকে ঘুম থেকে জাগানো। তারপর এদিকে টিফিন বক্স সাজানো, তো অন্যদিকে ব্রেকফাস্ট রেডি করে মুখের সামনে ধরা। শাশুড়ীর হাতে হাতে ওনার কাজ করে দেওয়া। সব সামলে যদি একটু ফোনটা হাতে নি, তখন এই রূপ টিপ্পনী শুনতে হবে? কেন, কৌশিক? কেন? এটাই কি বিবাহ বন্ধন? এটাই কি সংসার? কেন তোমার কাছে আমার জন্য একটুও সময় নেই?
– তোমার সব কথা মানছি, রিয়া। কিন্তু আমার দিকটাও তো দেখবে বলো। অফিসের কাজের প্রেসার, বাড়িতে এসেই কোনওরকমে নাকে মুখে খাবার গুঁজে লেখা নিয়ে বসে পড়ি। আমি তো নিজেকেই সময় দিয়ে উঠতে পারি না। তাও চেষ্টা করি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তোমার সঙ্গে একান্তে একটু সময় কাটাতে। কিন্তু তুমি নিজেকে ফোনের মধ্যে ডুবিয়ে রাখো।
– শোনো কৌশিক, একদম আমার দিকে আঙুল তুলবে না। তোমার যদি দুটো পেশাকে একসঙ্গে একই সময় চালাতে সমস্যা হয়, তাহলে বলব নয় লেখা ছাড়ো, নয়ত চাকরি।
ওঁর কথা শুনে আমি চুপ করে গেলাম। কিন্তু রিয়া থামল না। ও বলেই চলল,
– একটা সময় ছিল যখন আমি ভাবতাম তোমাকে ছাড়া বৃষ্টিতে ভেজা হবে না। তুমি না থাকলে পাশে বৃষ্টি পরশ বোলাবে না। তুমি না থাকলে বৃষ্টি ঝরবেই না। কিন্তু আজ এইসব আবেগের কোনও দাম নেই। কত বৃষ্টি, কত বৈশাখী ঝড় পার করে দিলাম তোমার অপেক্ষাতে। তুমি আসবে, ধরার সবুজ বুকে নগ্ন পায়ে তোমার হাত ধরে আবার বৃষ্টিতে ভেজা হবে। কিন্তু ওইসবের জন্য তোমার আর সময় কৈ! তোমাকে বিয়ে করাটাই হল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
ধৈর্য্য ধরে এতক্ষণ রিয়ার প্রতিটা অভিযোগ শুনছিলাম ঠিকই, কিন্তু ওই শেষের বাক্যটা শোনার পর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ওই প্রথম ওঁর গায়ে হাত তুললাম। চড়টা যে শুধুমাত্র ওঁর গালে লেগেছিল, তেমনটা ভাবলে ভুল হবে। ওই চড় আদতে আমাদের এতদিনের সম্পর্কের গায়ে লেগেছিল। তাই ওই একটা রাতের ঘটনা, আমাদের এতবছরের সম্পর্কটাকে আদালত অবধি টেনে আনতে দু-বারও ভাবেনি।
——(৪)——–
বৃষ্টিটা একটু ধরেছে দেখে আমি আর দেবীপর্ণা ওই চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে সামনের ওই বটগাছটার তোলায় গিয়ে বসলাম।
– হুম, সবটাই শুনলাম।
– তা কি বুঝলি?
– তোদের ভালোবাসাটা তোদের এই একে অপরের ইগোর কাছে প্রতিনিয়ত হারতে হারতে আজ এইখানে এসে ঠেকেছে। সত্যি, করে একটা কথা বলতে পারবি কৌশিক?
– কি কথা?
– আজ যদি রিয়া এসে তোকে বলে যে এই ডিভোর্স ওঁর দরকার নেই। আবার তোর সঙ্গে ও সংসার করতে চায়, তাহলে তুই কি করবি?
– (মুচকি হেঁসে বললাম) ও এই সমস্ত কথা বলবে? যদি সেটাই হত তাহলে আজকের দিনে আমাকে ওঁর অপেক্ষায় এই আদালত চত্বরে এসে বসে অপেক্ষা করতে হত না।
– উপফফ! আগে আমার কথার উত্তরটা দে। কি করবি যদি রিয়া এসে তোকে ডিভোর্সটা ক্যানসেল করতে বলে?
– কি আবার বলব! আমি তো প্রথমদিন থেকেই ডিভোর্সের ব্যাপারে রাজি ছিলাম না। আরে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া অশান্তি হবে না? মান-অভিমান সবকিছুই হয়। আমি মানছি ওইভাবে সেদিন ওঁর গায়ে আমার হাত তোলাটা উচিত হয়নি। তাই বলে সেই অপরাধের সাজা এতটা কঠিন হবে ? ডিভোর্সের জন্য কাউকে কিছু না জানিয়েই আবেদন করে ফেলল।
– কৌশিক, তুই রিয়াকে বড্ড ভালোবসিস। আর যখন তোর মন ডিভোর্সটা দিতে চাইছে না, তখন নিজের ইগোটাকে দূরে সরিয়ে রেখে একবার তো ওঁর সঙ্গে বসতে পারতিস। কে জানে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হয়েও যেত পারত।
– এই শোন, তোকে যে বললাম ডিভোর্সের জন্য কাউকে কিছু না জানিয়েই রিয়া আবেদন করেছিল, সেটা কি ভুলে গেলি? কি আশ্চর্য! একজন সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে আর তুই বলছিস তাকে অনুরোধ করে হাতে পায়ে ধরে নিজের কাছে বেঁধে রাখতে?
আমার কথাটা শেষ হতেই লক্ষ্য করলাম দেবীপর্ণা একগাল হাঁসি নিয়ে যেন আমাকে কিছু বলার জন্য অপেক্ষা করছে। ওঁকে বললাম,
– হাঁসি-হাঁসি মুখে কি বলার জন্য ছটফট করছিস, তাড়াতাড়ি বলে ফেল।
– হ্যাঁ! আমি এটাই দেখতে চাইছিলাম যে আদতে আমি যেটা ভাবছি, সেটাই সঠিক কিনা।
আমার মুখটা একটা বড় জিজ্ঞাসাচিহ্নের মতো হয়ে আছে দেখে দেবীপর্ণা ফের বলল,
– তুই লেখক হয়ে এতটা বোকা হবি, সত্যি ভাবিনি রে। আরে, তুই যেমন ডিভোর্সটা দিতে চাস না, তেমন রিয়াও হয়ত দিতে চায় না। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না যেহেতু রাগের বশে এই ডিভোর্সের সিদ্ধান্তটা ও আগে নিয়ে ফেলেছিল।
– কি ভুলভাল কথা বলছিস বলতো?
– যা বলছি, একদম ঠিক বলছি। কারণ তোদের ভালোবাসার চেয়ে তোদের ইগোগুলো এই সম্পর্কতে বড্ড মর্যাদা পেয়ে গেছে। তোরা কেউই চাস না ডিভোর্স হোক, আবার কেউই নিজের ইগোর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করতে নারাজ। এমনটা করলে কেমন করে সম্পর্কটা ঠিক হবে, কৌশিক?
– এতক্ষণ আমার কথা শুনে তোর এটা মনে হল?
– হ্যাঁ, যেটা তুই এতদিন ধরেও বুঝতে পারিস নি। ওরে, রিয়া তোকে আজও ভালোবাসে তাই আদালতে এখনও সে এসে পৌঁছায়নি। ডিভোর্সটায় যতটা সম্ভব ততটা দেরি করতে চাইছে ও। কারণ রিয়া চায় তুই ওঁকে নিজের মুখে এই ডিভোর্সটা ক্যানসেল করার কথা বলিস। ভেবে বলতো একদিনও কি ও আদালত বা উকিলের কাছে আগে এসেছে?
ভুরু দুটো যতটা উপরের দিকে তোলা সম্ভব ততটা তুলে একটু চিন্তা করে নিয়ে বললাম,
– না! প্রতিবার আমাকে অপেক্ষা করিয়েছে। এমনকি এই ফাইনাল ডেটটাও ওঁর জন্য পিছিয়ে ছিল। এটা তো ওঁর স্বভাব। বিয়ের আগেও দেখা করতে হলে আমিই ওঁর জন্য আগে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
আমাকে থামিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল দেবীপর্ণা এবং যাওয়ার আগে বলে গেল,
– কিন্তু বিয়ের ডেটটা কি পিছিয়ে ছিল? মনে হয় না। তাই শোন, কৌশিক। রিয়া তোকে আজও ভালোবাসে। শুধুমাত্র একটা দিনের ঘটনার কারণে সম্পর্কটা ইগোর জন্য ভেঙ্গে যেতে দিস না। কম্প্রোমাইজ মানে কিন্তু অন্যজনের কাছে হেরে যাওয়া নয়। বরং সম্পর্কটা টিকে গেলে, সারাজীবন জয়ের হাঁসিটা তোর মুখেই থাকবে। তাই পারলে নিজের ইগোটা ভুলে একবার ওঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে নে।
দেবীপর্ণা চলে গেল ঠিকই কিন্তু ওঁর বলা প্রত্যেকটা কথা যেন তখনও আমার চারিপাশে রয়ে গেছিল। কথাগুলো এমন ভাবে মনের মধ্যে গেঁথে গেছিল যে কোনও কিছু না ভেবে দীর্ঘ তিন মাসের এই টানাপড়েনর ইতি টানতে পকেট থেকে ফোনটা বের করে রিয়াকে কল করলাম। ফোনটা বেজে কেটে গেল। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা আমাকে যেন ওই মুহূর্তে জড়িয়ে ধরছিল। ভালোবাসার নবরূপ খোঁজার নেশায়। বৃষ্টির জলে তখন ধুয়ে যাচ্ছে আমার শরীরের সব ক্লান্তি। অনেকদিন পর আজ এইভাবে বৃষ্টিতে ভিজলাম। অনুভব করলাম আবারও প্রকৃতির এই মায়াখেলা।
মনে হচ্ছিল দেবীপর্ণা যেন আমার বন্ধ দুই চোখ আজ আরও একবার খুলে দিয়ে গেল। এমন এক বৃষ্টির প্রয়োজন হয়ত আমার অনেক কাল ধরে ছিল। কিছুক্ষণ বাদে একটা ঘিয়ে রঙের শাড়িতে ছাতা মাথায় রিয়াকে আদালত চত্বরে ঢুকতে দেখে তাড়াতাড়ি নিজেকে আড়াল করতে সেই বটগাছটার পিছনে আশ্রয় নিলাম। আর ওই মুহূর্তে মাথায় একটা আইডিয়া খেলে গেল। সামনে দৌড়ে বেরানো দুটো বাচ্চাকে খেলতে দেখে ইশারায় কাছে ডাকলাম। তারপর পকেট থেকে একটা আদ ভেজা কাগজ বের করে তাতে পেন ঘষে কয়েকটা লাইন লিখে ছেলে দুটোকে দিয়ে বললাম,
– সামনে দিয়ে যেই দিদিটা হেঁটে আসছে, ওনাকে এটা দিয়ে দিস।
কথাটা শেষ করে আমি রিয়ার চোখ এড়িয়ে গাড়ি নিয়ে ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম। আর অপেক্ষায় রইলাম রিয়ার উত্তরের। জানি না, ছেলেগুলো আদৌও ওঁর হাতে ঠিক মতো ওই কাগজটা তুলে দিতে পারবে কিনা। জানি না, লাইনগুলো পড়ার পর ওঁর উত্তর কি হবে। তবু, মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছিল। আজ আবারও রিয়ার জন্য লিখলাম। সেই লাইনগুলো-

দোষটা তোমার ছিল নাকি আমার, সত্যি জানি না।
তবে, এইটুকু জানি সম্পর্কটা তৈরি হয়েছিল দু’জনের প্রশ্রয়ে।
প্রতিশ্রুতিগুলো মিথ্যে ছিল না, কাটানো মুহূর্তরা মিথ্যে ছিল না।
তাই আবারও চাই বেঁচে উঠুক ভালোবাসা, এই শ্রাবণের শেষে।

সমাপ্তি

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।