সম্পাদিকা উবাচ

উনিশ শতকে বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের যাত্রা শুরু। তখন ঔপনিবেশিক শাসনের কাল এবং বাংলা উপন্যাস যাত্রায় ছিল ইউরোপীয় সাহিত্যের প্রভাব। মূলত সেই সময় সামাজিক নকশামূলক রচনা এবং ইতিহাসকেন্দ্রিক রোমান্সের ধারায় আধুনিক উপন্যাসের জন্ম দিচ্ছেন প্যারীচাঁদ মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কালীপ্রসন্ন সিংহ প্রমুখ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, প্রমুখ ঔপন্যাসিক তাদের অনুসন্ধানী দৃষ্টিক্ষেপণে নতুন আখ্যান নিয়ে আসেন বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে৷ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ প্রমুখ ঔপন্যাসিক তাদের অনুসন্ধানী দৃষ্টিক্ষেপণে নতুন আখ্যান নিয়ে আসেন বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে৷
ঠিক এর পরই সাহিত্যের অঙ্গনে তাঁর আবির্ভাব ৷ আজ তাঁর মৃত্য দিনে, তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে কিছু কথার অবতারণা করব৷ মহা্শ্বেতা দেবী, আমার অত্যন্ত প্রিয় সাহিত্যিক৷ বহুমাত্রিকতা ও দেশজ আখ্যানের অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন মহাশ্বেতা দেবী। তিনি ইতিহাস ও রাজনীতি থেকে যে উপন্যাস রচনারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপন্যাসে তুলে আনলেন উচ্চবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্তের মানুষের কথা, তাদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। শুরু করেন, সেখানে যেমন ঝাঁসির রানীর মতো চরিত্র রয়েছে তেমনি রয়েছে সার্কাসের শিল্পী ও নৃত্যশিল্পীদের আখ্যান। তার শুরুর দিকের উপন্যাস ঝাঁসির রানী (১৯৫৬), মধুরে মধুরে (১৯৫৮), প্রেমতারা (১৯৫৯), আঁধার মানিক (১৯৬৬), বায়স্কোপের বাক্স (১৯৬৪)সহ প্রভৃতিতে নানা শ্রেণির জীবনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। তবে তার সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক উপন্যাস হাজার চুরাশির মা (১৯৭৪), এই উপন্যাসকে তার সাহিত্যের বাঁক পরিবর্তনের সূচনা বলে মনে করা হয়। এটা তার দ্বিতীয় পর্যায়ের রচনাকাল। এ সময় তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো : হাজার চুরাশির মা (১৯৭৪), ঘরে ফেরা (১৯৭৯), তিতুমীর (১৯৮৪), স্বেচ্ছা সৈনিক (১৯৮৬), অক্লান্ত কৌরব (১৯৮২), বিবেক বিদায় পালা (১৯৮৩), বন্দোবস্তি (১৯৮৮), মার্ডারারে মা (১৯৯২) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।
এরপর তিনি ইতিহাস অনুসন্ধানে চলে গেলেন একেবারে প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে। ইতিহাস, রাজনীতি ও উপকথাকে কেন্দ্র করে যে উপন্যাস লেখা শুরু করেন, তা সভ্য সমাজের মানুষের বিচরণের বাইরের জগৎ। সত্তরের মাঝামাঝি সময়ে তার উপন্যাসকে নিয়ে গেলেন একেবারে অন্য আলোয়, যা তার উপন্যাস রচনার তৃতীয় পর্যায় হিসেবে ধরা যায়। সেই পথে গিয়ে মহাশ্বেতা দেবী একের পর এক উপন্যাস রচনা করে স্বতন্ত্রতা প্রকাশ করেন। তিনি উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ভৌগোলিক পরিবর্তনের সঙ্গে ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের পরিবর্তনের ধারায় সে দেশীয় আদিবাসী জীবনের পরিবর্তন বর্ণনা করেন। পাহাড়ি অরণ্য জীবনের সঙ্গে উপন্যাসে ফুটে উঠে পরিবেশের বিপন্নতার চিত্র, যা আজকের পৃথিবীকেও বিচলিত করে, সেই আখ্যান সাহিত্যে রূপ দিয়ে আদিবাসী জীবনে ঘটে যাওয়া উলগুলান (১৯০০), কোলহান (১৮৩৫) এবং হুল (১৮৫৫-৫৬) সম্পর্কে পাঠক মনে সাড়া জাগান মহাশ্বেতা দেবী। তার আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু (১৯৬৭), অরণ্যের অধিকার (১৯৭৫), চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তির (১৯৮০), সুরজ গাগরাই (১৯৮৩), স্বেচ্ছাসৈনিক (১৯৮৫), টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা (১৯৮৭), বন্দোবস্তী (১৯৮৯), ক্ষুধা (১৯৯২), কৈবর্ত খণ্ড (১৯৯৪) প্রভৃতি। এছাড়া অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের প্রেক্ষিতেই কিশোরদের জন্য বিরসা মুণ্ডা (১৯৮১) নামের একটি উপন্যাসও লিখেন। উল্লেখ্য, উপন্যাসগুলো রচনার ক্ষেত্রে রয়েছে বিষয়বস্তু এবং প্রকরণগত বিশিষ্টতা।
অরণ্যচারী জনগোষ্ঠীর মুখে মুখে ঘুরে ফেরা জীবন ও ঐতিহ্য থেকে সেই জাতিসত্তার যে ইতিহাস তিনি রচনা করেন, তা বঙ্কিমচন্দ্রের দেখানো পথে বা ভাবধারায়ও নয়, একেবারে তার নিজের মতো করে প্রকাশ। মহাশ্বেতা অন্ত্যজ আদিবাসীদের চোখ দিয়ে জীবনকে ব্যাখ্যা করেন। এসব উপন্যাসে প্রধান চরিত্রগুলো এসেছে আদিবাসী সমাজ থেকে। বিভূতিভূষণ যেমন তার ‘আরণ্যক’ উপন্যাসটিতে অরণ্যচারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা এনেছিলেন। যা ছিল একজন কলকাতার বাবুর চোখ থেকে দেখা। সেখানে মুগ্ধতা আর করুণার চোখে নির্মিত হয়েছিল প্রেক্ষাপট। কিন্তু মহাশ্বেতার অরণ্যের অধিকারের কথা সেই সমাজের জীবনাপোলব্ধি। তাদের বাঁচার অধিকার থেকে তুলে আনা প্রেক্ষাপট। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অরণ্যবহ্নি (১৯৬৬) ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের অমর নায়ক সিধু-কানুর কৌমচেতনা ও দেশচেতনায় উজ্জীবিত উপন্যাস। সত্যেন সেনের বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯) উপন্যাসটি পাল যুগে উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলের শূদ্রস্থানীয় কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে রচিত। অবহেলিত কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে মহাশ্বেতা দেবীও একটি উপন্যাস রচনা করেছেন, কৈবর্ত খণ্ড (১৯৯৪) নামে। সমরেশ বসু (১৯২৪-১৯৮৮) রচিত মহাকালের রথের ঘোড়া (১৯৭৭) যা আদিবাসী জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস। চল্লিশের দশকের কথকার সাবিত্রী রায় (১৯১৮-১৯৮৫) তার পাকা ধানের গান (১ম পর্ব ১৯৫৬, ২য় পর্ব ১৯৫৭ এবং ৩য় পর্ব ১৯৬৫ সালে) লিখেন। যেখানে তিনি হাজং অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের প্রেক্ষিত নিয়ে আসেন ।
মহাশ্বেতা দেবীর বিশিষ্টতা তিনি বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক আদিবাসী জীবনকেন্দ্রিক উপন্যাস রচনা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তার কাছে সাহিত্য শুধু বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ নয়, বরং সাহিত্যও শ্রমসাধ্য বিষয়। মহাশ্বেতার কলমের কালি বুলেটের মতো সমাজকে বিদ্ধ করে। ধীমান দাশগুপ্ত মহাশ্বেতার সাহিত্যকৃতির নান্দনিক তাত্পর্য ব্যাখ্যায় বলেন— মহাশ্বেতার সাহিত্যিক ক্ষেত্রটিকে, বলা যায়, মানিকের রিয়ালিজম, সতীনাথের ফর্ম্যালিজম এবং তারাশঙ্করের এক্সপ্রেশনিজমের এক একীভূত ক্ষেত্র। আমার বিচারে মানিক বা তারাশঙ্করের চেয়েও সতীনাথের সঙ্গে মহাশ্বেতার আত্মীয়তা যেন অধিক।… সতীনাথের মতোই মহাশ্বেতাও ‘শ্রেণিবিভক্ত বর্ণবিচ্ছুরিত যৌনতাশাসিত ধর্মসাপেক্ষ প্রাদেশিকতা-নির্ভর’ এক ভারতবর্ষের লেখক।
বাংলা সাহিত্যে মহাশ্বেতা দেবীকে নিছক সমাজতাত্ত্বিক নয় বরং সমাজ মনস্তাত্ত্বিক বলা যেতে পারে। এক স্বতন্ত্র ঘরানার লেখক তিনি। বলা যায় পোস্টমডার্নিজমের ক্ষেত্রে সাব-অলটার্ন আসার আগে থেকেই মহাশ্বেতা সাহিত্যে নিজের মতো করে সাব-অলটার্ন চর্চা করে গেছেন। অনেক বেশি শিকড়ে গিয়েই তিনি অরণ্যের অধিকার লিখেছেন, তা প্রমাণিত হয় যখন তিনি আদিবাসী মুণ্ডা সমাজের ঘরের লোক হয়ে ওঠেন। সেই আদিবাসী সমাজ তাকে ‘মারাং দাই’ বলে স্বীকার করে নেয়। মহাশ্বেতা দেবী কাজের প্রতি এতই সচেতন থেকেছেন যে তিনি আদিবাসী সংস্কৃতির ইতিহাসের মাধ্যমে তথা তাদের লোকগাথা, উপকথা, মিথকে কেন্দ্র করে যে জীবন ও সংগ্রামকে তুলে ধরে উপন্যাস লিখেছেন, তা মোটেও আরোপিত হয়ে ওঠে না বরং জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে যায়। এভাবে সত্তুরের দশকের পর তিনি পুরোপুরিভাবে সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে এসটাবলিশমেন্ট-বিরোধী হয়ে ওঠেন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।