শীতের বিকেল। আমরা গোবিন্দ ডাক্তারের মাঠে দুপুরবেলা নুন দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি টক কুল সাবাড় করে ফুটবল পেটাচ্ছিলাম। বাপ্পা দা এসে খবর দিল সন্ধেবেলা ওদের নতুন ভাড়াটেদের ঘরে সবার নেমন্তন্ন। খেলা শেষে পুকুরে হাত-মুখ ধুয়ে দলবেঁধে চলে গেলাম ভাল-মন্দ খ্যাটনের আশায়।
লাইনের প্রথমে বুবাই। ঢোকার সময় ওই বাড়ির কাকিমা জিজ্ঞেস করল, “আজ টক কিছু খেয়েছ নাকি?”
বুবাই বলে উঠল “কুল খেয়েছি কাকিমা”।
— “তাহলে তো তুমি প্রসাদ পাবে না বাবা”।
এরপরে আর অমন নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারার মতো ভুল করার কোন প্রশ্নই নেই। কাকিমা জিজ্ঞেস করতেই নিঃশব্দে মাথা নেড়ে ভিতরে ঢুকে পড়লাম। আমার দেখাদেখি বাকিরা। বেচারা বুবাই ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে মনের দুঃখে বনে চলে গেল।
সেই সময়ে হিন্দি সিনেমায় সন্তোষী মায়ের ব্যাপক ডিমান্ড। ফলত বাংলার ঘরে ঘরে ছোঁয়াচে রোগের মতো চলছে ব্রত পালন। প্রায় শুক্রবার এখানে ওখানে সেবা করার সুযোগ। যাইহোক সেদিন খিচুড়ি, লাবড়া, মিষ্টি সাঁটিয়ে বেরোতেই পাড়ার মোড়ে বুবাই’এর সাথে দেখা। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা যোগাচ্ছে না আমাদের মুখে। নিজের পাপে ( পড়ুন ভুলে) সে নিজেও যারপরনাই অনুতপ্ত।
এমনই ছিল সেই দিনগুলো। রাস উৎসব বা জন্মাষ্টমীতে পেটচুক্তি খাওয়া। নতুন ছেলে মেয়ে হলে মহা সমারোহে কুলো পিটিয়ে হাতে ডালা ভর্তি খই-মুড়কি মায় খুচরো পয়সা নিয়ে ঘরে ফেরা। নিজের উপার্জিত পাঁচ বা দশ পয়সায় সাদা বিস্কুট কিংবা দাঁতের লড়াই কিনে খাবার আনন্দ। দু’দিন অন্তর সত্যনারায়ণ কিংবা শনি পুজোর সিন্নি, ফল-প্রসাদ। কাঁচা আটায় কাঁচা দুধ-গঙ্গাজলে মাখা অর্ধ তরলে দুচারকুচো নারকেল ও কিসমিস ভাসছে। আজ এই ভোরে চোখ মেলে প্যান-ফরটি খাওয়ার যুগে এসে মনে মনে ভাবতেও ভয় লাগে।
এই করোনা পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে আগামীতে প্রসাদ ব্যাপারটারই ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে হয়। সেই সাথে চরণামৃতকেও যেন মৃতপ্রায় শিল্প বোধ হয়। অথচ এতকাল পুরীর মহাপ্রসাদ থেকে তারকেশ্বরের নকুলদানা, ভোগের খিচুড়ি থেকে লুচি-পায়েস-মালপো, ঘটের ডাব থেকে বারোয়ারী দধিকর্মা, কত নাম না জানা কিন্তু হেব্বি জাগ্রত ঠাকুর-দেবতার বাতাসা, মিছরি, প্যাঁড়া, নাড়ু, তক্তি চুসে চেটে গিলে খেয়ে হজম করতে করতে হুস করে বড় হয়ে গেলাম। তবু একটা প্রশ্নের উত্তর আজও মিলল না, হাজার যত্নেও বাড়ির খিচুড়ির স্বাদ প্রসাদী ভোগের মতো মায়াবী হয় না কেন!