আন্তর্জাতিক || পাক্ষিক পত্রপুট || এ রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

শুধু ২১শে নয়
সালটা ১৯৫৭৷ স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়নি তখনো। সেই সময়ে ভারতবর্ষ থেকে সদ্য বিভক্ত হয়ে যাওয়া পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তান রূপে পরিচিত ছিল আজকের গৌরবময় বাংলাদেশ। পাকিস্তানের প্রধান তথা বৃহত্তর অংশের জনগোষ্ঠী মূলত উর্দু ভাষাভাষী হলেও পূর্ব পাকিস্তানের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এই অঞ্চলের মানুষদের ওপর জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চায়। মাতৃভাষার সাথে জড়িয়ে থাকে বহু প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আবেগ। কোন ভাষার বিস্তৃতির সাথে সেই ভাষাগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও আবেগেরও বিস্তৃতি ঘটে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই জোর করে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনে ফেটে পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত তরুণ ছাত্র ছাত্রীদের ওপর পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণে কয়েকটি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায়। এদের মধ্যে অন্যতম হলো রফিক, জব্বার, সালাম, শফিউল, বরকত সহ অনেকেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই মহান দিনটিকে স্মরণ করেই ২০১০ খ্রিস্টাব্দ থেকে জাতিসংঘ এই দিনে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকে মানুষ নিজের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছে। কখনো সে অঙ্গভঙ্গি করেছে, কখনো বা ছবি এঁকেছে, আবার কখনো মুখ থেকে নানান রকম আওয়াজ করেছে। যুগ যুগ ধরে মনের ভাব প্রকাশের জন্য মানুষের মুখনিঃসৃত এই বিভিন্ন ধরনের বিক্ষিপ্ত আওয়াজের সমষ্টিগত সংগঠিত পূর্ণাঙ্গ রূপ হল ভাষা।
বিশ্বজুড়ে নানা অঞ্চল ভেদে মানুষের ভাব প্রকাশের উদ্দেশ্যে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে শত সহস্ত্র ভাষা এবং সেই ভাষার অবলম্বনকারী নির্দিষ্ট ভাষাগোষ্ঠী। তেমনি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সন্তানেরা তাদের জন্মলগ্ন থেকে ঐতিহ্যগতভাবে যে নির্দিষ্ট ভাষাটির মাধ্যমে নিজেদের ভাব প্রকাশ করতে শেখে, সেটিই হল তাদের মাতৃভাষা। কোন গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির মাতৃভাষা তার কাছে শুধুমাত্রই একটি সামান্য ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়।