কর্ণফুলির গল্প বলায় রবীন জাকারিয়া

লোকসান

(রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত গল্প)

মফিজের বাড়িত আইজক্যা মানুসে ঠাসা। খুলিটাত কলাগাচ দিয়া একখান গেট করছে। চাইরো পাশে গুড্ডির কাগজগুল্যা দিয়া সেকল বানেয়া ঘিড়া দিছে। পোয়ালের পুজের মাথাত থাকি গুয়া গাছ, ফির আতা গাচ থাকি মেন্দি গাচের মাথাত অসি টাঙ্গােইছে। অসিগুল্যার সাথে তিনকোনা করি অঙ্গিন কাগজগুল্যা কাটি কাটি আটা দিয়া লাগাইতোছে ছাওয়াগুল্যা। কী যে ভাল লাগতোছে! বাড়ির ভেতর থাকি গীতের আওয়াজ আসতোছে। সবায়গুলা স্যাটে যাইতোছে। বেটি ছাওয়াগুলা সগায় মিলি নাচতোছে। কায়ো কায়ো গান গাওছে। সারা গ্রাম ভাঙ্গি আসছে আজক্যা।

মফিজের বেটি জোসনার বিয়্যা। গাবরু পক্ষ ম্যালা বড়লোক। জামাইয়ের বাড়ি ঢাকা। ওমার অনেক ট্যাকা-পয়সা। নিজের বাড়িতো আছেই গাড়িও বলে আছে। জামাই ম্যালা পাশ দিছে। শিক্ষিত মানুষ। মফিজ এ্যালাও বিশ্বাস করব্যার পারতোছেনা গাবরুপক্ষ ক্যানে হামার মাইয়াক পচন্দ করিল।

মফিজের দুই বউ। ছাওয়া-পোওয়া মোট বারোজন। বড় বউয়ের সাতজন ছাওয়া। ৭টাই বেটি। শালার এমন আটকুড়া বউ যে খালি বেটিই পয়দা করে। ব্যাটার কোন হদিস নাই। মনে হয় এই মেশিন একটা জিনিসই বানবার পারে। দুশ শালা মনে হয় ন্যাদাই দিয়া বের করি দ্যাঁও। কিন্ত মাইয়্যাগুল্যার কতা চিন্তা করি ওই কাজ করোঁ নাই। পরে আর এটা নিকা করনু। যাতে মুইও একনা শান্তিত থাকোঁ, ওমরাও দুই বইন মিলি মিশি থাকে। কিন্ত ওমা! এই দুই বেটি ছাওয়া মিলিতো বাড়িখান দোজখ বানে ফ্যালাইছে। বিয়ান ব্যালা থাকি আইত পর্যন্ত কাজিয়া লাগি থাকে।

ছোট বউয়ের ঘরোত ৫জন ছাওয়া। পর পর খালি বেটিই হয় আর বেটিই হয়। মফিজতো ভাবি পায়না। ঘটনাটা কী! এটাওতো একই কোম্পানির মেশিন। যে মশল্লা দ্যাওনা ক্যান জিনিসতো একই বানাইতোছে। গ্রামোত মুখ দ্যাখা মুশকিল হয়্যা গেইছে। সবায়গুল্যা এ্যালা আটকুড়া কয়্যা ডাকে। কলি কাল আসি গেইছে। কেয়ামতের আলামত এ্যাগল্যা। ধর্ম কইছে না যে, কেয়ামতের আগোত ব্যাটা ছাওয়ার চ্যায়া বেটি ছাওয়া বেশি হইবে। এত বেশি হইবে যে, একটা ব্যাটা ছাওয়াক পাবার জন্যে অনেক বেটি ছাওয়া উয়্যাক ধইরবার জন্যে পিট্টাইবে। ব্যাটা ছাওয়া ওমার হাত থাকি বাঁইচকার জন্যে উঁচা গাছোত চরি থাকপে। তাতেও কাজ হবান্নায়। বেটি ছাওয়াগুল্যা কোটা দিয়া গুতি গুতি গাছোত থাকি নামাইবে।
এইগল্যা কেয়ামতের আলামত। মফিজের বড় গৃহস্থ। কত জমি জায়গা, কিশ্বান, কামলা তার। অথচ তার সংসারের হাল ধইরবার একটা পোলা এ্যালাও নাই। সব বেটির বিয়া হয়্যা যাবার পর বাড়িটা মফিজের খালি খালি মনে হয়। তখন বাড়িতে থাকা চোট্ট জোসনাই মফিজের খ্যালার সাথি আর বড্ড আপন হয়্যা যায়। বাপ-বেটি বাড়িত থাকলে ওমার আর কারো দরকার পরেনা। জোসনা মফিজের অতি আদরের ছাওয়া। ছোট বেলা থাকি জোসনা বাপের কাছ থাকি বেশি আদর পায়্যা লাভের চ্যায়া ক্ষতিই হইছে বেশি। মফিজের অন্য বেটিগুল্যা নেকাপড়া কইরবার না পারলেও। জোসনাক পাঠশালাত পড়াইছে। অয দেকতেও সুন্দর। গ্রামের মানুসজন উয়্যার সাথে একনা বেশি খাতির নাগায়। এটা মফিজ বুঝপার পায়। কিন্ত কিছু কয়না দুইটা কারনে। একটা হইল গ্রামের মানুষ আশকারা পাইবে। যদিও মফিজের ওপর কথা কওয়ার সাহস কম মানুসেরই আছে। অন্যটা হইল জোসনাটা মনোত কষ্ট পাইবে। ভাববে বাপে বুঝি সন্দেহ করে। সেইটা মফিজ কইরবার চায়না। আর এই সুযোগটা জোসনা কামোত লাগায়।

নেকাপড়াত খুব বেশি ভালো না হইলেও কোনোরকমভাবে মেট্টিক পাশ করি জোসনা কলেজোত ভর্তি হইল। মফিজ বেজায় খুশি। তার বেটি কলেজে পড়ে। এই জন্য গ্রামে তার বাহাদুরি আরো বাড়ি গেলো।
কথায় আছে না আল্লাহ্ যখন দ্যায় তখন ছপ্পর মারি দ্যায়। মফিজেরও সেটা হইল। একসাথে ওয় দুইটা ভালো খবর পাইল। একটা হইল উয়্যার ছোট বউয়ের ৪ নম্বর বেটি আসমার ব্যাটা হইছে। আর অন্যটা হইল ছোট বউ ৫ম ছাওয়া দিছে। আর সেটাও ব্যাটা। মফিজ খুশিতে দরগাহ্ শরীফে গ্রামের সবার জন্য খাবারের মজলিশ দেইল। ২টা গরু। ৮টা ছাগল। গ্রামবাসি হাতের কবজি ঢুকিয়া খাইল।

এ্যাগলা চিন্তা করতে করতে হঠাৎ গাড়িয়ালের ডাকে মফিজ যেনো আকাশ থাকি মাটিত নামি আসিল। ভাবব্যার লাগিল বেটির বিয়ার সময মনে হয় সব বাপই এমন চলি যাওয়া দিনগুল্যার কথা মনে করে! নাকী? আল্লাহ্ জানে!
– গাবরুপক্ষতো আইতের এর গাড়িত আইসপে।
– সেইটা আগেই কইছে ওমরা।
– তাইলে ইস্টিশন থাকি ওমাক আইনবার জন্যে হামরা কয়খান গরুর গাড়ি নিয়া যামো।
– ৬ খান। আর সাথে চিচড়া, মুড়ি, গুড় নিয়া যাইমেন। আস্তাত ভোক নাগলে খাইমেন। আর ওমরা যাই কউক। আগ দ্যাখাবাননান।
– আইতের বেল্যা যদি কোনো বিপদ হয়?
– চিন্তা নাই কালু লাঠিয়াল উয়্যার দলবল দিয়া তোমার সাথোত থাকপে। সাথে তিনটা হ্যাচাক আর তিনটা হ্যারিকেন নিমেন।

গ্রামের মানুসের হেলেপ, বউ-বেটি-জামাইদের দেকাশুনা করা আর পাইস্যা-পাতি খরচ করি কোনরকম আপদ-বিপদ ছাড়াই পরের দিন জোসনার বিয়া হয়্যা গেলো।

হামার গ্রামের নিয়ম বাপু বিয়ার দিন জামাই বউ নিয়া বাড়ি যাবার পাইরবার নায়। বিয়ার দিনতো গাবুরপক্ষ সবায় মিলি বউয়ের বাড়িত থাকা নাগে। বাসর আইতের পরের দিন গাবরু বউ নিয়া চলি যায়।
আইজক্যা জোসনার বাসর আইত। সবায় মিলি ওমাক দোজনকাকে ঘরের ভেতর ঢুকি দিয়া চলি গেইছে। জোসনার একন্যা শরম নাকতোছে। চেনা নাই, জানা নাই এমন একটা পরপুরুষের সাথোত একটা ঘরোত একসাথে থাকতে একন্যা ভয় ভয়ও নাকতোছে।
আইত মেলা হইছে। সবায় বোধায় নিন পাড়তোছে। কারো কোনো সাড়া-শব্দ নাই।

মানুষটা গাও ঘেষি বসিল।
– জোসনার সারা গতর কাঁপি উঠিল। শরম ফ্যালে কিছু কবার পাইতোছেনা। ঝিত হয়্যা থাকিল। মানুসটা হাত দুইখান দিয়া ঘোমটাখান সারে ফেলিল। কইল “তুমি ভীষণ সুন্দরী। আমি এতদিন এমনই পরীর মতো কাউকে একজন খঁজছিলাম। তাই তোমাকে পেয়েছি।”
– জোসনা হঠাৎ কয়্যা ওঠে, “ তোমরা একনা বিছনা থাকি নামিয়া দাঁড়ানতো! কিংকর্ব্যবিমূঢ় জামাই বিশ্বয় নিয়ে আদেশ পালন করলো। জোসনা চকি থাকি নামি গাবরুর পা ছুঁয়া সালাম করি ফির চকিত আসি বসি পড়িল।
– তুমিতো দারুন ধার্মিক!
– আরে নোয়ায়। আইজক্যা কী কী করব্যার নাগবে নানী শিখি দিছে।
– হা হা হা! তুমি শুধু ধার্মিকই নও। নম্র এবং শালিন।
– আচ্ছা একটা কথা কইবেন। তোমরা এতো বড়লোক, ম্যালা পাশ দিছেন। মোক ক্যান বিয়্যা করনেন?
– শহরের মেয়েদের আমার পছন্দ নয়।
– ক্যান শহরোত কি সুন্দরী মাইয়া নাই?
– আছে তবে বিশ্বস্থ নয়।
– মানে কী!
– বাদ দাও!
– নাহ্। আরে কন না ক্যান?
– আসলে সত্যটা যদি বলি। তুমি আসলে কীভাবে নিবে!
– অসুবিধা নাই তোমরা কন।
– শহরের মেয়েরা আসলে তোমার মতো এতো ধার্মিক, ভদ্র ও নম্র নয়। ওরা টাকাকে প্রাধাণ্য দেয়। টাকার জন্য ওরা সবকিছু করতে পারে।
– সবকিছু মানে কী কননা!
– সবকিছু মানে দেহ বেচে দিতে পারে।
– হায় আল্লাহ্ কী কন। কেমন দাম নেয়?
– আরে বাদ দাওতো!! ওসব নিয়ে আমাদের না ভাবলেও চলবে।
– তাও কননা কত নেয়?
– এটা একেকজনের উপর একেক ধরণের দাম নির্ধারন করে। কেউ ৫০০০ টাকা নেয় আবার কে্উ ৫০০০০ টাকা নেয়।
– বলেন কি? এতো টাকা? তাইলেতো মুই সেলিম ভাইয়ের কাছোত ম্যালা টাকা পাইম।
– তুমি কি কিছু বললে?
– নাহ্! আইসেন শুতি পড়ি। কিন্ত জোসনার আজ কোনভাবেই ঘুম ধরবে না। কেননা সারাজীবনে তার কী বিশাল লোকসান হয়ে গেছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।