T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় রবীন বসু

নারায়ণগড়ের বুধিয়া
অবশেষে অনিকেতের চাকরিটা হল। অনেক ঘোরাঘুরি অপেক্ষা তাচ্ছিল্য আর পরামর্শের পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেল। তবে অফিসারদের খুশি করার মতো জলখাবার দিতে পারেনি বলে তার পোস্টিং হল প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ার এক গণ্ডগ্রাম নারায়ণগড় হাইস্কুলে, সহকারী ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে। যখন স্কুলে পড়ত হঠাৎ বাবা অফিস থেকে ফেরার পথে একটা কার অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। দিদি তখন কলেজে। অনেক হাঁটাহাঁটির পর বাবার অফিসে দিদির একটা চাকরি হয়। গ্রুপ সি পদে। এখন দিদির বয়স হচ্ছে, মা রোজ তাড়া দেয়, “অনি, একটা চাকরি জোগাড় কর, বাবা। মলি আর কতদিন এ সংসার টানবে। তুই চাকরি পেলেই ওর বিয়ে দেব।”
অনিও ভেবেছে দিদির একটা সংসার হোক। ওর ঘাড় থেকে এই দায়িত্বের জোয়ালটা নিজের কাঁধে নিক। তাই দূর হলেও অনির কাছে কোনও অপশন ছিল না। চাকরিটা তাকে নিতেই হল।
হাওড়া থেকে খুব সকালে ট্রেন ধরে জয়েন করতে এসেছে। গতকাল রাতে ফোনে হেড মাষ্টারমশাই বলেছিলেন, “নতুন জায়গা, চিনে আসতে অসুবিধা হবে। তই একজনকে স্টেশনে পাঠাব।”
কিন্তু রেললাইনে কুর্মি সম্প্রদায়ের অবরোধের
ফলে ট্রেন বিকেল চারটের জায়গায় সন্ধে সাতটায় ঢুকল। ছোট ফাঁকা স্টেশন নারায়ণ গড়। দু’ চারজন যারা নেমেছিল, অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। অনিকেত একা দাঁড়িয়ে। একটা মাত্র লালচে বাল্ব জ্বলছে বুকিং অফিসের সামনে। বাকি পুরো স্টেশন গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। ভৌতিক পরিবেশ। সারাদিনে আপ-ডাউন করে চার-পাঁচটা ট্রেন এখানে দাঁড়ায়। অনিকেত আঁতিপাঁতি খুঁজল, কাউকে দেখতে পেল না। তাহলে হেড মাষ্টারমশাই যে লোক পাঠাবে বলেছিলেন! হয়তো দেরি দেখে চলে গেছে। এই গ্রামদেশে সন্ধে সাতটা মানে অনেক রাত। এই নারায়ণগড় স্টেশন নাকি একটা ভূতুড়ে স্টেশন। অনিকেত আগে শুনেছে। সন্ধের পর এখানে কেউ নামে না। কোন ট্রেনও আর দাঁড়ায় না। জনশ্রুতি আছে অনেক দিন আগে এখানে এক স্টেশন মাষ্টারের মেয়ে আত্মহত্যা করে। পরদিন হতভাগ্য বাবাও আত্মহত্যা করে। তাদের অতৃপ্ত আত্মা এখনও এখানে ঘোরাঘুরি করে। পথিককে ভুল পথে নিয়ে যায়। আর শেষে রেল লাইনে তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। এইসব মনে হতে অনিকেত ভয় পায়। আবার এও ভাবে, এসে যখন পড়েছে স্কুলে তো যেতেই হবে। যাবে কীভাবে? একটু চা খেলে হত, গলাটা কেমন শুকিয়ে গেছে। কোনও চায়ের দোকান চোখে পড়ল না। সঙ্গের ব্যাগটা নিয়ে বুকিং অফিসের দিকে এগোল। যদি ওদিকে কোনও রিক্সা বা অটো পায়।
এমন সময় অন্ধকার ভেদ করে একজন কেউ হাতে একটা লণ্ঠন নিয়ে এগিয়ে আসছে। অল্প আলোয় অনিকেত দেখল কালো রোগা মাঝারি উচ্চতার একজন দেহাতি লোক। পরনে রঙচটা লুঙ্গি আর গায়ে একটা ছেঁড়া গেঞ্জি। মুখ ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। শুধু লণ্ঠনের আলোয় ওর চোখদুটো জ্বল জ্বল করছে। কাছে এসে কেমন অদ্ভুত গলায় লোকটা বলল, “আপনি কোলকাতা থেকে আসচেন, বাবু? আমাদের নারায়ণগড় স্কুলের নতুন মাষ্টারবাবু?”
অনিকেত ঘাড় নাড়ে। “কিন্তু তুমি কে?”
“আমি তো বুধিয়া আছি বাবু। হেড মাষ্টারবাবু আপনাকে নে যেতি বলল। আমার রিক্সা আছে।”
অনিকেত দম পায়। মনে সাহস। যাক, তাহলে লোকটা এসেছে। এই ভূতুড়ে জনহীন স্টেশনে সারারাত পড়ে থাকতে হবে না।
“বেশ বুধিয়া, চল। তুমি বাঁচালে আমাকে। আমি তো কিছুই চিনি না, নতুন।”
“সেই জন্নি তো এলুম। আসেন বাবু।”
বুধিয়া এগিয়ে যায়। একটু দূরে ছায়ার মতো তার রিক্সাটা দাঁড়িয়ে। অনিকেত উঠে বসে। বুধিয়া ব্যাগটা তার পায়ের কাছে রেখে রিক্সার হ্যান্ডেলে লণ্ঠনটা ঝুলিয়ে প্যাড়েল ঘোরাল। আঁকাবাঁকা মাটির ধুলোভরা পথ। দু’ পাশে বড় বড় ঘন গাছপালা। বাঁশের বন। এক আশ্চর্য শব্দহীন নৈঃশব্দ্য। বুধিয়াকে পেছন থেকে কেমন রহস্যময় মনে হচ্ছে। অনিকেত ভাবছে, সে যেন কোনও অচেনা গ্রহের অপার্থিব পরিবেশে এসে পড়েছে। দু’ একটা রাতজাগা পাখি হঠাৎ ডেকে উঠে উড়ে যাচ্ছে। গা-টা শির শির করে উঠল। নিজেকে সহজ করতে অনিকেত জানতে চাইল, “আর কতদূর, বুধিয়া?”
“এই তো এসে গেচি, বাবু। আর এট্টু গেলে।”
বুধিয়া জোরে প্যাডেলে চাপ দেয়।
অনিকেত জানতে চায়, “হেড মাষ্টারমশাইকে কোথায় পাব, বুধিয়া।”
“উনি তো স্কুলেই থাকেন, বাবু। খুব ভাল মানুষ। আমাকে চাকরি দিয়েচেন। দেখবেন আপনার কোনও অসুবিধা হবে না।”
“আচ্ছা বুধিয়া, তোমার সংসারে কে কে আছে?”
“আমি তো এখানে একা বাবু। পরিবার থাকে দেশে। ঝাড়খণ্ডে। একটা ছোট মেয়ে আছে।”
কিছুক্ষণের মধ্যে একটা লম্বা এল আকৃতির বড় দোতলা বাড়ির সামনে এসে বুধিয়ার রিক্সা দাঁড়াল। সে নতুন মাষ্টারবাবুর ব্যাগ তুলে লোহার গেটের কাছে রাখল। তারপর ঝনাৎ করে গেট খুলে দিয়ে বলল, “এবার আপনি হেড মাষ্টারবাবুকে ডাকুন।”
অনিকেত জোরে মাষ্টারমশাই বলে ডাকতে বারান্দায় আলো জ্বলে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যে এক বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। হাতে টর্চ।
“তুমি অনিকেত! আমি সুধাময় হাজরা, এই স্কুলের হেডস্যর। সরি। যে ছেলেটিকে পাঠিয়ে ছিলাম, সে অপেক্ষা করে সন্ধের আগেই চলে এসেছে। আসলে ওর খুব ভূতের ভয়। তার উপর নেশা করে। আমি খুব চিন্তায় ছিলাম।”
“আসলে স্যর, ট্রেন চার ঘণ্টার মতো লেট। অবরোধ ছিল। টাওয়ার ছিল না, আপনাকে ফোনে বলতে পারিনি।”
“কিন্তু এখন তুমি চিনে এলে কীভাবে? গাড়ি পেলে কোথায়?”
“কেন স্যর, বুধিয়া ওর রিক্সাতে নিয়ে এল। আপনি তো ওকে স্টেশনে পাঠিয়েছিলেন।” সুধাময় বাবু বিস্মিত ও অবাক।
“বুধিয়া! বুধিয়া তোমাকে নিয়ে এসেছে? তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে না তো!”
“একদম না। বুধিয়া বলল, আপনি ওকে পাঠিয়েছেন আমাকে নিয়ে আসতে। ওই তো বুধিয়া ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, ওকে জিজ্ঞেস করুন।”
সুধাময় বাবু আর অনিকেত দ্রুত লোহার গেট পেরিয়ে এপারে এল। কিন্তু না, কোথাও বুধিয়া নেই। তার রিক্সাটাও দেখা যাচ্ছে না। অনিকেত ভাবল, ও হয়তো ওপাশে অন্ধকারে কোথাও সরে আছে। ডাকলে এক্ষুনি চলে আসবে। তাই জোর গলায় ডাকল, “বুধিয়া… বুধিয়া…”
কোনও সাড়া নেই। শুধু বাঁশঝাড়ের ওপাশের পাতাগুলো যেন একটু বেশি নড়ে উঠল। অনিকেত এক পা এক পা করে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সুধাময়বাবু তার হাত চেপে ধরল। “দাঁড়াও অনিকেত। যেও না। ওদিকে বুধিয়া নেই।”
“কেন? বুধিয়াই তো তার রিক্সা করে আমাকে নিয়ে এল। ও লণ্ঠন হাতে স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল। বুধিয়া যদি আমাকে না নিয়ে আসবে, তাহলে আমি এই অচেনা জায়গায় এলাম কীভাবে? বিশ্বাস করুন, বুধিয়াই আমাকে নিয়ে এসেছে।”
সুধাময়বাবু তাঁর হাতের টর্চ জ্বেলে চারপাশ দেখল। তারপর অনিকেতের হাতে চাপ দিয়ে বলল, “কোথাও ভুল হচ্ছে তোমার। সেটা সম্ভব না।”
অনিকেত জানতে চাইল, “কেন?”
“কারণ, বুধিয়া আমাদের স্কুলের নাইটগার্ড ছিল। দিনের বেলায় ও রিক্সা টানত। আর রাতে স্কুল পাহারা দিত। এই কম্পাউন্ডের পিছনের দিকে একটা ছোট্ট ঘরে থাকত। ও আদতে ঝাড়খণ্ডের লোক। পরিবার থাকত ওখানে। খুব বিশ্বস্ত আর সৎ ছিল। যে সমস্ত শিক্ষকরা দূর থেকে আসত, তাদের রিক্সা করে আনা, ছুটি হলে আবার স্টেশনে দিয়ে আসা ও-ই করত। কিন্তু দুঃখের বিষয় কী জানো, গত বছর করোনায় ও মারা গেছে। তাই বলছিলাম, একটা মৃত মানুষ তোমাকে কীভাবে রিক্সা করে নিয়ে আসবে?”
আশ্চর্য ! জলজ্যান্ত একটা মানুষ, তাকে দেখল, তার সঙ্গে কথা বলল, ওকে এতটা রাস্তাটা নিয়ে এল, এখন শুনছে সে মৃত। এটা কী করে সম্ভব! হেডস্যরের কথাও তো মিথ্যা হতে পারে না। সে অবশ্য বুধিয়ার মুখ স্পষ্ট দেখেনি। শুধু তার চোখদুটো কেমন উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছিল। তাহলে যে বুধিয়া তাকে নিয়ে এল সে কী অশরীরী! অনিকেতের সমস্ত শরীর বেয়ে একটা ঠাণ্ডা শিহরণ খেলে গেল।