গল্প গাথায় রাহুল বোস

অচেনা আপন

সময়টা বড়ো কঠিন। হয়তো দুশো বছরে এ হেন সংকট আমার স্বপ্নের পৃথিবীতে ঘটল প্রথমবার। কোরোনা, এক অলিখ পৃথিবীর গ্রীম রিপার ছন্নছাড়া করে চলেছে বিশ্ব, মানব সভ্যতা, আমার দেশ। তবে তা নিয়ে আমি বিশেষ মাথা ঘামাই না অথবা ঘামাতে হয় না। জুলিয়ে যখন সকাল সকাল রাটাটুয়ী চড়ায় তার গন্ধে যেন শান্তির রোদ এসে পড়ে আমার ফার্ম রেঞ্জের ওপর। কেমন এক ভরসা পাই।
আজ দুসপ্তাহ হল তাদের সঙ্গে আমার দেখা নেই। কেমন এক বিশেষ ঘরবন্দী দশায় আছি‌। তবে, যে কষ্ট হচ্ছে তা নয়,‌ বেশ আয়েশ করেই দিন কাটছে আপনাদের সঙ্গে। তাই তো চিন্তা হয়। মনটা হু হু করে । কি খাচ্ছে, কি করছে কে জানে! সময়টা খারাপ বলে নিজেই সান্তনা দি নিজের আবেগকে। কিন্তু তাতে কি চিড়ে ভেজে?
সাতটা বাজে। এখন জুলিয়ে কফি বানায় আমার জন্য। অবশ্য সেটা দালগোনা নয়। Jokes apart . ওর হাতে জাদু আছে, বলতে হয়। ওই মধু আবৃত ব্ল্যাক কফি খেয়েই তো আমার প্রথম লেভন জুলিয়ের প্রেমে পড়া। বড়ো রোমান্টিক ছিল সেই দিন। নাহলে আমার মতো অড্ ফার্মারকে পাত্তা দেয় কে ! তারপর আমাদের হাত বাঁধা পড়লো ডায়মন্ড রিং-এর সুখ্য আলেয়ায়, দি ভন পরিবার। কিছু সময় পার হলে আমাদের হাত ধরতে এল অ্যান্টন। আমরা খুব খুশি হয়ে ছিলাম ওকে পেয়ে। বাবু তখন সারা দিন না হয় বার্চ গাছের ওপর বানানো ট্রী হাউস থেকে উঁকি দিচ্ছেন, নতো বা ড্রেকোর সাথে সারা ফার্ম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর জুলিয়ে রেগে গেলেই বাবু লক্ষী ছেলের মতো আমার পিছনে লুকিয়ে বলতো- “ড্যাড, বাঁচাও”। এরপর এল নিনা, আমার ছোট্ট প্রিন্সেস। বেশ কাটছিল এদের নিয়ে যতোদিন না এই ছন্নছাড়া মহামারী আলাদা করে দিল আমাকে ওদের থেকে,দূরে, অনেকখানি দূরে।
জানেন, আজ সকালটা বড়ো অদ্ভুত। ওদের কথা বড়ো মনে পড়ছে। এখন হয়তো‌ জুলিয়ে রান্নাঘরে। অ্যান্টনকে বলে এসেছিলাম কর্ণ ফিল্ডটার যেন ভালো করে দেখাশোনা করে। ফসল তোলার মরসুম এটা। ওর আবার পড়াশোনাও আছে। একদিন বাবু এসে বলে – “ড্যাড, পার্টি আছে, ফিরতে দেরি হবে। এনায়ার বার্থডে।” বাবুকে যেই জিজ্ঞাসা করেছি – শুধুই কি বার্থডে, না সামথিং এল্স?” ওমনি বিনয়ের সঙ্গে বলে উঠলে -“ড্যাড”! গাড়ির চাবি খানা এগিয়ে দিতে লাফিয়ে জড়িয়ে ধরলে। কানে কানে বললেন – “thanks dad।”
তবে কি জানেন ডাক্তার সেন, ছেলেটাকে নিয়ে বড়ো চিন্তা হয়। বড়ো বদ মেজাজি।
ডাক্তার সেন ইনজেকশন পুশ করে বলেলন – “থামলেন কেন? ক্যারি অন, আমি শুনছি”। আমি আবার শুরু করলাম। মায়ের সঙ্গে কিছু হলেই ড্যাড – এর ডাক পড়ে। জুলিয়ে ওকে ঠিক বোঝেনা। But he is my best friend. নিনা এখন ফার্দিনান্দের সঙ্গে খেলছে, সিয়োর। নাহলে ড্রেকোর সঙ্গে গাছে জল দিচ্ছে। বয়স কম হলেও ওর মতো নম্র এবং বুদ্ধীমতি মেয়ে আমি এখন আর দেখতে পাই না। কয়েক মাস আগে parents visiting day তে গিয়ে শুনি নিনার বান্ধবী আমারই ক্লাইন্টের মেয়ে লুনা তিনটি ছেলেকে নাকি মেরে লাল করে দিয়েছে। তবে মেয়েটি বড়ো ভালো। নিনার কিছু হলে দৌড়ে আসে খোঁজ নিতে। ওদের দুজনের ভালো জমেও। নিনা এবছর সায়েন্স ফেয়ারে ফার্স্ট হয়েছে। টির্চারা প্রসোংশা করছিল।
এরপর আসে আমার ফ্যামেলির দুই অতি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, ফার্দিনান্দ আর ড্রেকো। এদের বন্ধুত্ব তো ইতিহাসে তুলে রাখার মতো। খাওয়া, ঘুম, ঘোরা সব এক সাথে, ভিন্ন প্রকৃতির জীব হয়েও। ড্রেকোকে আমিই কিনে এনেছিলাম সেফার্ড ডগ হিসেবে। বাস ড্রেকো আর অ্যান্টন ভাই ভাই হয়ে গেল। তবে ফার্দের আসাটা ছিল বড়ো অনিশ্চিত। এক সকালে ঝড়ে ভেঙে যাওয়া বেড়া ঠিক করতে গিয়ে ওকে খুঁজে পাই। বার্চের স্যাতস্যাতে ছায়ায় একটা বাছুর শুয়ে কাঁপ ছিল। সারা গায়ে কাটা দাগ। ডান পাটা খারাপ ভাবে জখম হয়ে রক্ত পড়ছিল। দেখে মায়া হল। বাড়িতে নিয়ে এলাম, বাস নিনার খেলার সঙ্গী হল ফার্দ।
তবে ডাক্তার শুনছি নাকি এই কয়েকদিনে দেশটাও অনেকটা বদলেছে। তা চোখে পড়েছে অনেকের। একদিকে মৃত্যু মিছিল তাড়া করে চলেছে মানব সভ্যতাকে অপর দিকে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখে মহিত গোটা বিশ্ব। মৃত শহরতলীতেও নাকি শোনা যাচ্ছে পাখির ডাক। পরশু জুলিয়ে ফোনে বলছিল আমাদের ফার্ম রেঞ্জের কাছে লিং – এর পাল বেরিয়েছিল। অ্যান্টন রাতে শুতে যাওয়ার সময় বাড়ি পিছনে উঁচু ঢিবিটায় শুনেছে নেখড়ের ডাক । পোর্টের কাছে খেলা করছে মিষ্টি জলের ডলফিন। অনেকে হাম্ফ ব্যাকের পরিবার দেখেছে। আকাশ মাতাচ্ছে গোলডেন ঈগল‌। মানবতার বন্ধনটাও যেন বেশ সুস্থ জায়গা নিয়েছে। Casa del toro নাকি ফাঁকা। মাটাদোরকে ছেলের সঙ্গে ফুটবল খেলতে দেখা গেছে । সেই ছবি ছেয়েছে সোশাল মিডিয়া। কিছু দিন আগে হাসপাতালের পাশের অ্যাপার্টমেন্টের লোকেরা রেজিস্তিরে গাইছিল, বেশ ভালো।
জানেন ডাক্তার সেন, সুর বড়ো অদ্ভুত জিনিস। অচেনা মানুষকে কত সহজে চেনা করে দেয়। ডাক্তার সেন মেডিসিন বোর্ড দেখতে দেখতে হাসলেন। আমি বললাম, না এই যে আপনার আর আমার মধ্যে কয়েক লক্ষ মাইলের দূরত্ব কত সহজে এক হয়ে গেল আরেক জন‌ মানুষের অচেনা সুরে। আপনার প্রথম শোনানো গান, হেমন্তের- ‘নতুন নতুন রঙ ধরেছে’। কথা বোঝা না গেলেও ও সুর বড়ো আপন, বড়ো শান্তির। তারপর মান্না দের ওই গানটা, আরে ‘আমি যামিনী’। মনে হচ্ছিল নদীর ধারে বার্চের ছায়ায় বসে আমি আর জুলিয়ে হারিয়ে যাচ্ছি অন্য জগতে।
আপনার মনে হয় না!

ডাক্তার সেন বললেন – ” মান্না দের অনেকগুলো প্রিয় গানের মধ্যে আমার সব থেকে পচ্ছন্দের একটা ‘ এসেছি আমি এসেছি’। ঠিক আমার মতো, বাধাহীন উড়ন্ত পাখি,ভেসে বেড়াচ্ছিল এদেশ ওদেশ। অবশেষে ডানা মেলে দেবে নিজের বাসায় পড়ন্ত সূর্যালোকের রেখা ধরে।”
বেশ ভালো লাগলো ডাক্তার সেন। মনে হচ্ছে কয়েক দিনে নতুন পৃথিবীর খোঁজ পেলাম বলে। আসলে কোরোনায় আক্রান্ত হলেও মনটা তো সুস্থ।

তো ডাক্তার সেন, অনেক তো আমার গল্প শুনলেন এবার আপনার পালা। আজ কি শোনাবেন মান্না দে, না ওই হেমন্ত। এক মাস হল, না আগের মতো গান শোনান, না গল্প করেন। জানি কাজের চাপ অনেকটাই বেড়েছে, তাও কিছু অসুবিধা থাকলে আমাকে বলতে পারেন।মনটা হালকা হবে।
ডাক্তার সেন, হেসে ঘাড় নাড়লেন। বললেন – “সুসংবাদ, your are completely fine now. এবার বাড়ি ফেরার পালা। তবে, আজ আর কিছু না। এবার সুস্থ হয়ে বাংলায় দেখা হবে। ওখানে কয়েক দিন থাকতে হবে কিন্তু। সেদিন সবটা বলবো।”
আমি হেসে বললাম – “হ্যা, নিশ্চয়ই। তার মানে আপনি ইন্ডিয়া ফিরছেন!” ডাক্তার সেন হাসলেন। স্টেথোস্কোপ তুলে বেড়িয়ে যেতে যেতে বললেন – “আদিয়োস পাটনার”।
কিছু ক্ষনের জন্য ফাঁকা হয়ে গেল ঘরটা।
খালি বিছানা,নিঃশব্দ ঘর, পাল্স মেশিনের টিক টিক আওয়াজ, বড়ো কঠিন এ সময়। আশা করি অন্ধকার কাটলে, পৃথিবী শান্ত হলে, এলোমেলো ধাঁধার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টুকরোগুলো আবার জোরা লাগবে ঠিক আগের মতো।
ঘন্টা কয়েক পর এক নার্স ঘরে ঢুকলেন। বললেন – “স্যার, আপনি সুস্থ, কাল আপনার ডিসচার্জ হবে।” আমি বললাম – “জানি, ডাক্তার সেন বলেছেন।” নার্স অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। বললেন- ” ডাক্তার সেন! আপনি ডাক্তার সেনকে চেনেন?” আমি বললাম ‌- “যিনি আমার চিকিৎসা করছেন তাঁকে চিনব না!” নিষ্পলক দৃষ্টিতে নার্স কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন আমার মুখের দিকে। তারপর বললেন – ” গত একমাস হল ডাক্তার সেন ইন্ডিয়া ফিরে গেছেন। গত মাসের কোভিড স্পেশাল ফ্লাইটেই তিনি ফিরত যান। দেখি বিপিটা”।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।