অফিসটায় জয়েন করেছেন তিনমাসও হয়নি রাজেনবাবুর, বাড়ির কাছেই অফিস, যাতায়াতে পাক্কা আধঘণ্টা সময় লাগে। রিটায়ার করার পর একটা অবলম্বন খুঁজছিলেন সময় কাঁটানোর, এই সময়ই তাঁর ভাগ্নে এই অফিসের খোঁজটা দেয়। রাজেনবাবু অ্যাকাউন্টেন্সির ছাত্র ছিলেন, দীর্ঘ কুড়ি বছর সরকারি অফিসে করণিকের কাজ করেছেন, এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকার ফলে নতুন অফিসে অ্যাকাউন্টেন্টের পদ পেতে তাঁর কোন সমস্যাই হয়নি !
অফিস না বলে কোম্পানি বলাই ভালো, ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, গেঞ্জি কাপড় তৈরি হয়। অফিসের পাশেই প্রোডাকশন হাউস, সারাক্ষন মেশিনের ঘটর-ঘটর শব্দ হচ্ছে কানের কাছে, তবু মন্দ লাগে না রাজেনবাবুর, রিটায়ার করবার পর আবার কাজ করবার এবং নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করবার সুযোগ পেয়েছেন, তাছাড়া মাইনেটাও ভালোই পান, তাই এইসব ছোটখাটো অসুবিধা পুষিয়ে যায় !
তবে এই তিনমাসে একটা জিনিষ তিনি বুঝতে পেরেছেন, এই নতুন অফিসে থিতু হতে এবং এদের কর্মপদ্ধতির সঙ্গে সড়গড় হতে তাঁর বেশ সময় লাগছে। এখানকার সবকিছুই বড় বেশী দ্রুত এবং গতিময়! তবে এ কথাও ঠিক যে এই ক’দিনে তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়ে এসছেন, তবু কিছু স্টাফ আছে, যারা সরাসরি না হলেও ঠারে-ঠোরে জানিয়ে দেয়, রাজেনবাবু এখনও কতোটা সেকেলে! বিশেষ করে তাঁরই সঙ্গে একই সেকশনে কাজ করা দীপক সরখেল, রাজেনবাবুর থেকে বছর পনেরো ছোটই হবে, কিন্তু হাবেভাবে এবং কর্মপদ্ধতিতে রাজেনবাবুর চাইতে অনেক বেশি আধুনিক, সেটা প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করে সে ! এই যেমন, রাজেনবাবু কম্পিউটারের খুঁটিনাটি ব্যপারে অতো জানেন না, কোন সমস্যায় পড়লে দীপক তাঁকে দেখিয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে যোগ করে দেয়, “একটু আপডেটেড হন, এইভাবে আর কদ্দিন? মানছি আপনি রিটায়রড ম্যান, কাজে উন্নতি করার দিন শেষ, কিন্তু কোম্পানিতে যখন জয়েন করেছেন তখন তার আদপ-কায়দাগুলো রপ্ত করে নিতে হয় তো নাকি?”
রাজেনবাবু কোন প্রতিবাদ করেন না, চুপচাপ মুখ বুজে মেনে নেন।
দেখতে-দেখতে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন চলে আসে, রাজেনবাবুদের অফিসেও প্রতিবছর পুজো হয়। কলকারখানার ব্যপার, পুজো না হলে চলে ? কিন্তু এবছর তাদের পুজোর প্রধান রাঁধুনি ডেঙ্গিতে ভুগে দশদিনের মতো শয্যাশায়ী, পুজোর ভোগ রাঁধার কোন ক্ষমতা নেই ! অন্য বিকল্প ব্যবস্থাও পাওয়া যাচ্ছে না, শেষ সময় কোন পাচক ঠাকুরই রাজি হচ্ছেন না, বা হলেও এতো দর হাঁকছে যে খরচে কুলিয়ে ওঠা অসম্ভব। সবার তাই মাথায় হাত ! শেষে গোডাউন কিপার পল্লব এসে বলে, “আমার হাতে একটা ভালো কুক আছে, যদিও সে আগে পুজোর ভোগ রাঁধেনি বটে, কিন্তু রান্নার হাত চমৎকার, একসাথে অনেকজনের রান্নাও করতে পারবে ! আর পুজোতে করবে তো ওই পোলাও আর আলুর দম, এ আর এমন কি ব্যপার !”
পুজোর দায়িত্বে থাকা দীপক সরখেল লাফিয়ে উঠে বলল, “বাঁচালি ভাই, কি নাম তোর কুকের ?”
নামটা শোনার পর দীপকের মুখভঙ্গি পালটে যায়, সে রেগে গিয়ে বলে, “তুই কি পাগল হয়েছিস, একটা মহামেডানকে দিয়ে বিশ্বকর্মার ভোগ রাঁধাবি !”
“সেই মহামেডানের হাতের বিরিয়ানি দাম দিয়ে খেতে কিন্তু মন্দ লাগে না !” এতক্ষণ চুপ করে থাকা রাজেনবাবু এবার বলে উঠলেন, তারপর পল্লবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বিশ্বকর্মা পুজোর আর তিনদিন বাকি, এর মধ্যে দীপক যদি অন্য ঠাকুর জোগাড় না করতে পারে তবে তোমার ইয়াসিনকেই ডেকো, বিরিয়ানি কারিগরের হাতে পোলাওটা কিন্তু ভালোই হবে !”
দীপক সরখেল কোন কথা বলল না দেখে রাজেনবাবু তার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “একটু আপডেটেড হন, এইভাবে আর কদ্দিন ?”