সে এক সময় ছিলো আমাদের। সারাবছর টিউশনির টাকা জমিয়ে বন্ধুরা দলবেঁধে বেড়াতে যেতাম। কোথাও কোনো বাহুল্য থাকত না। নূন্যতম খরচ, সীমাহীন আনন্দ। পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল পথ পেরুনো। অর্থাভাবে বুনো পেয়ারা খেয়ে দুপুর কাটানো। ভাঙা স্কুলবাড়িতে হাতির ডাক আর মশার উৎপাতে রাত জাগা। অদ্ভুত লাগে! কবেই ফরেস্ট ম্যালেরিয়া হয়ে টেঁসে যাবার কথা ছিল। সেক্ষেত্রে আজ এই মধ্যচল্লিশে এসে গালগল্প করার সুযোগ থাকত না। যাইহোক “একটাই লাইফটাইম, একটাই চান্স”। তাই বলেই যাই। আজ বিশান সিং কিংবা সুরজ মুন্ডার কথা। আসলে নাম হারিয়ে ফেলেছি ছেড়ে আসা তেইশ বছরের কোনো মোড়ে, নাম না জানা চায়ের দোকানে। তবে মানুষটি মনে আঁকা আছে। আর সেটুকুই যথেষ্ট।
পুরুলিয়া স্টেশন থেকে একটা ট্রেকার নামিয়ে দিয়ে গেছে শিরকাবাদ পেরিয়ে খানিকটা এসে। বিগত শতাব্দীর নব্বই দশকের শেষের দিকে এক শরৎকাল। পাথরের দেশে রোদের তীব্রতা তখনও যথেষ্ট। পাঁচ বন্ধুর দল। পিঠে ব্যাগ ফেলে হাঁটা শুরু। সদ্য কুড়ি পেরোনো বয়স। পায়ে অদম্য এনার্জি। একবুক উৎসাহ। আর খানিক গেলেই পাহাড় শুরু। এই আনন্দেই পা চালাচ্ছি জোরে। বৈচিত্র্যহীন সমতলের বাসিন্দা, তাই পাহাড়ের প্রতি টান প্রবল। দূরত্ব জানি না। রাস্তা কেমন জানি না। কখন পৌঁছাব জানি না। শুধু মনে মনে এটুকু জানি দিনের শেষে অযোধ্যা টপে উঠে পড়ব নিশ্চয়ই।
ঘন্টা খানেক হাঁটার পরে শুরু হল পাহাড়ি পথ। তবে ঘন বন ও পাহাড়ের গা বেয়ে সাপের মতো কালো পিচের রাস্তা। কদাচিৎ দু’একজন স্থানীয় মানুষ। মাথায় কাঠের বোঝা। বুঝতে পারছি যে অনেক শর্টকাট আছে। তারজন্য পিচ পথ ছেড়ে বনে ঢুকতে হবে। কিন্তু অপরিচিত পরিবেশে সেই সাহস জুটিয়ে উঠতে পারছি না। পথের বাঁকে বড় বোল্ডার দেখেও হাতি ভেবে থমকে দাঁড়াচ্ছি। এদিকে সূর্য মাথার উপর উঠে গড়িয়ে নামছে ঢাল বেয়ে। রাস্তার মাঝ বরাবর আড়াআড়ি বয়ে যাচ্ছে জলধারা। টিফিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। লজেন্স মুখে ফেলে জল খেয়েছি পেটভরে। সারা গা বেয়ে গড়িয়ে নামছে ঘাম। ভিজে গেছে পোশাক। ক্লান্তি একটু একটু করে গিলে খেয়ে নিচ্ছে আমাদের। যাকে জিজ্ঞেস করি সেই বলে আর একটু পথ বাকি। কিন্তু সেই পথ আর শেষ হয় না কিছুতেই।
পায়ে পায়ে কেটে গেছে আরও খানিকটা সময়। গড়িয়ে নেমেছে ফোঁটা ফোঁটা ক্লান্তির নোনা স্রোত। সকালের শক্তিসমুদ্র প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। মনের জোরে হেঁটে চলেছি শুধু। তীব্র হঠকারিতার জন্য নিজেদেরই দুষছি। পথে হেঁটে যাচ্ছে এক আদিবাসী বৃদ্ধ। সাথে তার নাতি। গিয়ে ধরলুম মানুষটিকে।
পিচ রাস্তা ছেড়ে বন-জঙ্গলের রাস্তা ধরলাম আমরা। পথ দেখিয়ে সামনে চলেছেন সেই লোলচর্ম বুড়ো মানুষটি। লালমাটির সুঁড়িপথ। দুদিকে দেড় মানুষ উঁচু ঘন লতাপাতা, ঝোপঝাড়। তারও উপরে আকাশ ছোঁয়া মহাদ্রুম। শেষ শক্তি দিয়ে এক’পা এক’পা করে এগোচ্ছি। বৃদ্ধের মুখে অভয়বার্তা ম্লান হচ্ছে না। অবশেষে আরও ঘন্টাখানেকের যুদ্ধ শেষ করে পৌঁছলাম অযোধ্যা টপে। পথের ধারে কাঁচা ছোলা লেবু-পিঁয়াজ দিয়ে মেখে বিক্রি করছে একজন। খিদে-তেষ্টায় তখন আমরা সহ্যের শেষ সীমায়।
সেই বৃদ্ধ এবং তার সংগী ছোট্ট ছেলেটি ফিরে যাবে নিজেদের পথে। বৃদ্ধের হাতে একটি পাঁচ টাকার কয়েন তুলে দিয়ে আমরা যারপরনাই লজ্জিত। কিন্তু আমাদের ক্ষমতাও সীমিত। তাই হাতে অন্য উপায়ও নেই। বৃদ্ধ এগিয়ে দিয়েছে তার নাতি কে, বলেছে ‘ওর হাতেও আটআন্নি দাও’। আকাশ থেকে পড়েছি আমরা। বৃদ্ধের ভুল ভাঙিয়ে বলেছি যে কাকা ওটা আটআনা নয়, পাঁচ টাকা। ঘোলাটে চোখে সেই কয়েনের দিকে তাকিয়ে পরম যত্নে ধুতির খুঁটে গুঁজে দ্রুত হাঁটা লাগিয়েছেন তিনি। কাঁচা সবুজ শালপাতায় ছোলামাখা খেতে খেতে অদ্ভুত বুনো গন্ধ চেটে নেওয়ার ফাঁকে আমরা কখন হারিয়ে ফেলেছি সেই মানুষটির নাম, যে অহেতুক আমাদের পথ দেখিয়ে আনার জন্য নিজের গ্রামের রাস্তা ছেড়ে কয়েক কিলোমিটার উজিয়ে ছুটে এসেছেন সাথে সাথে। ক্লান্ত ধ্বস্ত শহুরে যুবকদের ত্রাতা হয়ে পথ দেখিয়েছেন। আর মাত্র পাঁচ টাকার একটা কয়েন হাতে পেয়ে কোনো মানুষ যে এত বিস্মিত ও আনন্দিত হতে পারে তাইই অবাক হয়ে ভেবেছি আমরা।