গোরুবাথান থেকে মালবাজারের দিকে যেতে গুগুল ম্যাপ যে পথনির্দেশ এঁকে দিয়েছে সেখানে একটা শর্টকাট আছে। লাইভ রোড ম্যাপের সাথে ড্রাইভ করায় আমাদের পাহাড়ি ড্রাইভার তেমন দক্ষ নয়। পাশে বসে ডানদিক বাঁদিক করতে করতে এগোচ্ছি।
পাহাড়ের অবশিষ্ট রেখা খাড়া দেওয়ালের মতো জমে আছে চা বাগানের পিছনে। সেখান থেকে নেমে আসা অসংখ্য পাথরের বোল্ডার ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে গোটা বাগানে। একঝলক তাকালে হাতির বাচ্চা বলে মনে হতেই পারে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে এখনো। রাস্তার ধারে চা গাছের ফাঁকে পোকা খেতে খেতে ভিজছে দুটো ময়ূরী। বাইকাররা নিরুপায় হয়ে অপেক্ষা করছে পথপ্রান্তের শেডের নিচে।
আর একটু এগোতেই পাহাড় শেষ হয়ে আসে। এবারে শুধুই বিস্তৃত সবুজ চা গাছের সারি। মেন রোড থেকে আমরা শর্টকাটে ঢুকলাম। মায়ের সিঁথির মতো চা বাগান কে আড়াআড়ি কেটে কালো পিচের রাস্তা। আদিগন্ত সবুজের মাঝে ডানদিকে পাশাপাশি দুটি সাদা বাংলো। প্রথমটি বাগান ম্যানেজারের। তার পাশে মেডিকেল অফিসারের বাসা। আরও সামনে রাস্তার কাছে ছোট্ট লম্বাটে বস্তি। দু’একটা মুদি দোকান। সাদা রঙের ইস্কুল বাড়ি। আর এসবের আগে পিছে শুধু চা গাছ। রাস্তার পাশে ডোকো নামিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে চিয়া পাত্তি সংগ্রহকারী মহিলার দল। ঝাঁপ খোলা ছোটা হাতির পিঠে সারাদিনের চা-পাতা গহ্বরে পুরে ফুলে ঢোল হয়ে রয়েছে নাইলনের জালি।
এ যেন এক মিনি ভারতবর্ষ। স্বয়ম্ভর। রক্সি, হাড়িয়া ও পচাই রঞ্জিত জীবন। চিতা, ভালু কিংবা হাতির ভয়ে কিছু নির্ঘুম রাত। এখানে শাসক আছে, এখানে শোষিত আছে। বুর্জোয়া-প্রলেতারিয়েত আছে। দালাল, খোচর আছে। তীব্র প্রেম আছে। শরীরী টান আছে। বৈধ-অবৈধ আছে। জন্ম-মৃত্যু আছে। তবে সব কিছুর পরে সবুজ চা পাতার মতো কাঁচা জীবনের গন্ধ আছে। হাজারো না পাওয়ার মাঝে বেঁচে থাকার ঘ্রাণ।