গদ্য বোলো না -তে রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

অনুরণন

সংসারের কাজের ফাঁকে মধুরার বার বার বিয়ের আগের ঐ সব দিন গুলোর কথা মনে পড়ে |অর্পণ তখনও চাকরি পায় নি |কিন্তু মধুরা একটা কনভেন্টে পড়ায় |মাইনেও খারাপ পায় না |উচ্চাকাক্ষী অর্পণের তখনও আরো পড়ার ইচ্ছে |তাকে PHD টা করতেই হবে |মধুরার স্কুল ছুটির পরে, ওরা প্রতিদিন সবুজ কচি ঘাসের বিছানার উপর দুজনে একসাথে বসে বাদাম ভাজা খেতো , রোনাল্ডো থেকে ব্যারাক ওবামা, কিন্ডেল, বিথোভেনের সিম্ফানী, কত গল্প করতো | অর্পণ, মধুরার কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা |মধুরা আলতো করে ওর সুন্দর আঙ্গুলগুলো দিয়ে অর্পণের অগোছালো ঝাঁকড়া চুলগুলোতে বিলি কেটে দিত |অর্পণ বাচ্চা ছেলের মত মধুরাকে বলেছিল, “মধু তোর তো অনেক টাকা , প্লিজ একটা বই কিনে দে না! ওটা আমার খুব দরকার” মধুরা হেসে বলেছিল “দেখিস, বিয়ের পর সুদে আসলে সব তোর থেকে আদায় করে নেব!” তারপর দুজনের আঙ্গুল পরস্পরের আঙ্গুলগুলোকে আঁকড়ে ধরে, যেন সেই সব দিন গুলোতে পৌঁছে যেত |মধুরা ওর চিবুক নামিয়ে ওর ঠোঁট দিয়ে আলতো করে অর্পণের ঠোঁটে ভালোবাসা এঁকে দিত |
পাঁচ বছর হল ওদের বিয়ে হয়ে গেছে |অর্পণ যে বছর চাকরি পেল, সেই বছরই ওরা বিয়ে করল |একটা বড় ফার্মাসিউটিকাল কোম্পানিতে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অ্যানালিস্টের চাকরি |স্বপ্নের মতোই কাটছিল দিনগুলো, ঠিক যেমনটা ভেবেছিল, তেমনটাই |
দু বছরের মধ্যে অর্পণের একটা বড় প্রোমোসান হয় |আর তারপরই ও বলেছিল, “মধু তুই এবার ছেরে দে চাকরিটা, তোর আর চাকরি করার দরকার নেই, এবার সুদে আসলে তোর ঋন শোধ করে দেওয়ার পালা”|সেইদিন প্রথম রক্তক্ষরণ হয়েছিল মধুরার বুকের ভেতর |সত্যিই কি তার ‌আর অর্পণের সম্পর্কের মধ্যে পার্থিব ঋণের কোন জায়গা আছে? সত্যিই কি সব কিছুর মূল্য টাকার অঙ্কে মেটানো যায়? কোন উত্তর দেয় নি সেদিন মধুরা |চাকরিটা সে ছারেনি |ভাগ্যিস ছাড়েনি |
হঠাৎ মধুরা দেখল, তার চারপাশের পরিবেশটা ‌একটু একটু করে পাল্টে যাচ্ছে |তাদের সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে |সারা সপ্তাহে সকালে ঘুম থেকে উঠে, ব্রেক ফার্স্ট করে অফিসে যাওয়া, অফিস থেকে মিটিং সেরে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফেরা, ডিনার করে ল্যাপটপ খুলে অফিসিয়াল কাজ করা, আর তারপর মধ্যরাতে ঘুমোতে যাওয়া |দিনের পর দিন চলতে থাকে অর্পণের এই রুটিন |রবিবারটাও আস্তে আস্তে চুরি হয়ে যায় তাদের জীবন থেকে |ওদের আর কচি সবুজ ঘাসের বিছানায় বসা হয় না |বৃষ্টিতে ভেজা হয় না |সিনেমা হলের অন্ধকারে মধুরার আর অর্পণের কাঁধে মাথা রেখে, দু জন, দুজনের আঙ্গুলগুলো কে,আর আঁকড়ে ধরা হয় না |এখন মধুরা অসুস্থ হলেও, অর্পণ আর ওর অফিস কামাই করে মধুরার সেবা করে না |শুধু ফোন করে বাড়ির মেডের কাছ থেকে খবর জেনে নেয় |নীরবে চোখের জল গড়িয়ে পরে মধুরার গাল বেয়ে |একটু আকাশের মত উদার ভালোবাসা চেয়েছিল, কচি সবুজ ঘাসের স্বপ্ন চেয়েছিল মধুরা |ফাইভ স্টার হোটেলে নয়, দূরে কোন ধাবায় খাটিয়ায় বসে এক থালায় দুজনে খাবার ভাগ করে খেতে চেয়েছিল মধুরা |ঐশ্বর্যের ভিড়ে হারিয়ে গেছে ওর ছোট ছোট স্বপ্ন,ভালোলাগাগুলো |অর্পণ যখন শূন্যতে দাঁড়িয়েছিল মধুরা তখন তাকে পূর্ণ করার চেষ্টা করেছে |কতটুকুই বা মধুরার চাহিদা ছিল |একটা মেয়ে শুধু চায়, সবকিছুর মধ্যেও তার ভালোবাসা যেন তাকে একটু সময় দেয়, সেই সময়টুকুই তার কাছে সব চেয়ে মুল্যবান ঐশ্বর্য |একটু যত্নবান হয়, যা তাকে অনুভব করায়, সে সুরক্ষিত | তার আত্মত্যাগকে একটু সম্মান জানায়, সেইটুকুই তার পরিতৃপ্তি |
হয়ত পাঁচ বছর আগেকার অনুকম্পা, অনুভূতি, চাওয়া পাওয়ার স্বপ্নগুলো মধুরার কাছে সারা জীবন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি হয়েই থেকে যেত |কিন্তু তা হয়নি, মধুরার কলমের যাদুতে সেই সব ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবিগুলো রূপ পেয়েছে শব্দের |এক আকাশ গল্প লিখেছে মধুরা |স্কুলেরই এক চেনা শোনা প্রকাশক ছেপেছে মধুরার উপন্যাস “অনুরণন” |মধুরার ফোনটা বেজে উঠল, ওপার থেকে শোনা গেল তার পাবলিশার্সের গলা “ম্যাডাম আপনার উপন্যাস তো হট কেকের মতো হাতে হাতে বিকোচ্ছে, রাতারাতি দারুণ সাড়া ফেলে দিয়েছে” |মধুরা ধীরে ধীরে বলে “হ্যাঁ ভাই, এটা তো আর আমার একার গল্প নয়, আমার, আপনার, আমাদের সকলের মধ্যে এমন অনেক মধুরা-রা রয়েছে” |”বহু পাবলিশার্স আপনার ফোন নম্বর চাইছে , এবার একটা বাড়ির দরজায় আপনার নামের নেমপ্লেট লাগিয়ে ফেলুন, না হলে ওনারা খোঁজ করতে গিয়ে-তো বাড়ি খুঁজে পাবেনা “, পাবলিশার্স মধুরাকে বলে |
ব্যবস্থা হল নেমপ্লেটের, তাদের সদর দরজায় সাইনটিস্ট অর্পণ বোসের পাশে, লাগানো হল লেখিকা মধুরা বোসের নেমপ্লেট |মধুরা অনুভব করল, সাইনবোর্ডের ঝকঝকে অক্ষরগুলো যেন তার অব্যক্ত ইচ্ছা, না পূরণ হওয়া স্বপ্নগুলোকে মেলে ধরেছে |
আজ থেকে সে, তার একাকিত্বকে শব্দের রূপ দিয়ে মেতে উঠবে সৃষ্টির ‌ আনন্দে ||
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।