কখনও কখনও কাউকে দেখে মনের মধ্যে পাখোয়াজ বাজতে শুরু করে৷ মিছরির দানার মত অনুভূতিগুলো রোদের কণায় ঝলমল করে ওঠে৷ কত কথা এমন আছে আমরা মুখ ফুটে বলতে পারিনা৷ পাকদণ্ডীর মতো সেই কথাগুলো ঘুরে ঘুরে শেষে তোরঙ্গের অন্ধকার কোণটাতে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে বসে থাকে৷ কথা থাকে, কিছু কথা থাকে, যা অসূর্যম্পশ্যার মত সূর্যের আলোর বিপরীতে থেকে যায় সারা জীবন৷
কিন্তু কেন এই সংকোচ, এই গোপনীয়তার কারণ কি ? কেন মনে হয় এ অনুভূতি ঘিরে কুয়াশারা খেলে বেড়াক, পালকের নরম বিছানায় যত্নে পরিচর্যায় বেড়ে উঠুক আলালের ঘরের দুলাল৷ আসলে ভালো লাগা, ভালোবাসা যতই মানুষের সহজীয়া অনুভূতি হোক না কেন, সেই ভালোবাসার ওপর রয়েছে সীমানার আঁচড়৷ যেন পেরলেই জরিমানা দিতে হবে৷ ভালোবাসার মত সহজাত প্রবৃত্তিকে কি জোড় করে টেনে হিঁচড়ে সীমানার মধ্যে আটকে রাখা যায়? যে হৃদয়টাতে ওমনভাবে বাঁধ দেওয়া হলো সেই হৃদয়টা কি সাবলীলভাবে শ্বাস নিতে পারবে ?
আমরা সমাজবদ্ধ জীব৷ বহু বিধি নিষেধের চোখ রাঙানী মেনে জীবনকে আবদ্ধ করে রাখতে বাধ্য হই৷ বদ্ধ জলাশয়ের মত ? জীবনের যদি বৃষ্টির মত অঝোর ধারা না থাকল তবে, তাতে কাগজের নৌক ভাসবে কি করে? কি করে কদমের গন্ধে মাতাল হবে মন, কি করে ঘুড়ির সুতোয় বেঁধে স্বপ্নগুলোকে ওড়াবো ? তবু কত মানুষকে সরাটা জীবন যাপনের, ক্ষরণের হিসাব করতে করতে কাটিয়ে দিতে হয়৷ ভালোবাসা তো বহুমুখী! আর সেটাই তো স্বাভাবিক! মন তো কোন আসবাব নয়, কোন গয়না নয়, গাড়ি বাড়িও নয়, যে হস্তান্তরিত হয়ে যাব! কোনও এক অলিখিত সম্পর্কের শর্তে, কোন এক অদৃশ্য দড়ি দিয়ে নিজের সংযমকে বেঁধে রাখার চেষ্টা কিংবা ইচ্ছের ডাটাদুটো ছেঁটে দেওয়া৷
সম্পর্কের সমীকরণ যে বড় জটিল৷ বড় সূক্ষ্ম ৷ আর সেই সূক্ষ্মদেহীর অস্তিত্ব রক্ষা করতে জীবনে বারবার আমরা সামঝোতা করি নিজের সাথে সম্পর্কের সাথে৷ কত মানুষের সাথে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত পরিচয় হয় আমাদের৷ বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন দিক আমাদের আকৃষ্ট করে৷ কারোর কথা বলার ধরন ভালো লাগে, কেই সুদর্শন, কারোর সাহিত্য সৃষ্টি ভালো লাগে, কারোর হাসি ভালো লাগে৷ এত রকম ভালোলাগার মানষগুলোর সাথে বন্ধুত্বের অধিক কিংবা বলা ভালো প্রেমাষ্পদের সম্পর্ক হয় তবে তো বড় বিশৃঙ্খলা ঘটবে! প্রত্যেকটা মানুষই তার কাছের মানুষটাকে একান্ত নিজের করে পেতে চায়, এক্কেবারে নিজের৷ আমরা তাই প্রতিশ্রুতির জন্য, বন্ধনের জন্য, সমাজের জন্য, সংস্কারের জন্য, সংসারের জন্য, নিজেকে বেঁধে ফেলি, বলা ভালো বাঁধা পড়তে শিখেই নি৷
জীবনে দু ধরনের মানুষ দেখেছি৷ একধরনের মানুষ যারা চেতনা, চৈতন্য, দৃষ্টি, শ্রবণ সবকিছুকে একটা একরৈখিক অভিমুখে প্রবাহিত করে সেখানেই নিমজ্জিত করে রেখেছে, কিছুতেই অন্যদিকে দৃষ্টিপাত বা কর্ণপাত করবেই না৷ তাদের ক্ষেত্রে জীবন পাতকুয়োর জলের মত নিস্তরঙ্গ, আবদ্ধ৷ আর এক ধরনের মানুষ যারা পৃথিবীর অনাবীল সৃষ্টির মাঝে ভালো লাগাকে প্রশ্রয় দেয়, দুচোখ মেলে দেখে, হৃদয় দিয়ে আস্বাদন করে৷ বকের মত সীমানা বদল করে! ফলতঃ বহু ভালোলাগা ভালোবাসা দরজায় কড়া নেড়ে যায়৷ কাউকে ভালো লাগা বা ভালোবাসার মধ্যে কোন অন্যায় নেই, পাপ নেই৷
আসলে পাপ পূণ্য, ন্যায় অন্যায় বড়ো আপেক্ষিক৷ ব্যাক্তি, সময়, অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে বড়ো পাল্টে যায়৷ তবে সমমনস্ক সঙ্গী না হলে পাপ পূণ্যের জের বড়ো বেশি করে ছুটিয়ে মারে৷ রক্তের সম্পর্ক ব্যতিরেকে বন্ধুত্ব আর ভালোবাসার সম্পর্কের মত সুন্দর আর মূল্যবান সম্পর্ক এ পৃথিবীতে খুব কমই আছে৷ তবে যে সম্পর্কের কাছে তুমি প্রতিশ্রুতি বদ্ধ সেই সম্পর্কের ভালো লাগা মন্দ লাগার খোঁজ তোমায় একটু রাখতে হবে বৈকি! সম্পর্ককের যত্ন করতে হয়! কিন্তু তার মানে এই নয়, মেরুদণ্ডকে বেঁকিয়ে, স্বাধীনতাকে থেঁতলে, নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছাকে অগ্রাধিকার না হোক একেবারে অগ্রাহ্য করে, কলুর বলদের মত অক্ষের চারিদিকে ঘোরা৷ এমন জীবনও কিন্তু কোন উৎকৃষ্ট জীবনের উদাহরণ নয়!
ভালো থাকবেন সকলে৷ কাজের চাপে জেরবার৷ স্লিপ ডিস্কের যন্ত্রণা নিয়ে জীবন, ভালোবাসা, প্রেম আর সবচেয়ে কাছের বন্ধু কাজকে নিয়ে এগিয়ে চলেছি৷ আপনারাও আমাকে সাহায্য করতে পারেন৷ অনেকটা কাজ হালকা করে দিতে পারেন আমার৷ আরে বেশি বেশি করে গল্প, কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধ পাঠিয়ে! সাথে থাকুন, পড়তে থাকুন৷