সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৫)

পিরিচ পেয়ালার ও একটি সন্ধ্যা
পিরিচ পেয়ালার ঠুংঠাং- এ ভরে ওঠে সন্ধ্যা, সাথে ভীমসেন মেজাজী আড্ডা৷ কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কচ্ছ থেকে কোহিমা গোটা ভারতটা ঘুরে ফেলি কিংবা বলা কি যায় গোটা পৃথিবীটাই হয়ত ঘুরে ফেলি আমরা আড্ডা দিতে দিতে৷ আর বিষয়? সম্পর্ক থেকে রসায়ন, রাজনীতি থেকে সংস্কৃতি কোন বিষয়ে আলোচনা হয় না বলুন তো এই আড্ডায়! যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বারেবারে ধরা পড়ে পিরিচ পেয়ালার এই সন্ধ্যার আড্ডায়৷
তেমনই এক সন্ধ্যায় বিজয়া সম্মেলনীর আড্ডা নিয়ে বাঁধল গোল৷ কোনটা ভুল আর কোনটা অন্যায় তাই নিয়ে চলল বিস্তর তর্ক৷
একেবারে চুলচেরা বিচার৷ নিত্তি মেপে এগানো৷ সমানুপাত ব্যস্তানুপাত কিছু কি বাকি থাকল? আমার আবার হিসেব কষাকষির এমন বহর দেখলে কেশব চন্দ্র নাগের কথা ভারি মনে হয়৷ আর ঐ বাঁদরটার কথা
তেল মাখা ডান্ডায় কিছুটা উঠছে আবার স্লিপ করে ততটাই নেমে আসছে৷
বিজয়া সম্মেলনী মানেই নিমকি জিভেগজা নিকুতি মোহনভোগ সাথে ফিসফ্রাই আর কফি হলে তো জমে যায়৷ কিন্তু বিস্মৃত হলে চলবে না মশাই! যেখানেই বাঙালীর আড্ডা সেখানেই তর্কবিতর্কের ঠান্ডা স্রোত, না না একেবারে ফুটন্ত ভাতের মত গরমা-গরম কিছু একটা সর্বজন বন্দিত নন্দিত বিষয় থাকবেই থাকবে৷ আর সেই বিষয়টা একখানা মইয়ের মত এগিয়ে দেওয়া হব এতে আর বিচিত্র কী ?
কালী পুজোর আগে পর্যন্ত বিজয়া চালিয়ে যাওয়ার একটা রীতি বাঙালী বেশ কৌশলে অনুপ্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছে আমাদের সমাজজীবনে৷ তাই কালী পুজোর আগে পর্যন্ত রমরমিয়ে চলে বিজয়ার আড্ডা, বিজয়া সম্মেলনী৷
সন্ধ্যা গড়িয়ে আসে বকের পাখায়৷ বিন্যস্ত ঘরবাড়ির গায়ে কমলা মখমলে সূর্য শেষ রশ্মির ছাপ এঁকে দিচ্ছে৷ রাস্তায় উপুড় হয়ে আছে সময়ের আপাত ক্লান্ত শরীর৷ বাতাসের গায়ে উর্বশী ওড়না সম্মোহন ছড়াচ্ছে৷ বিধাতার হাতের তুলির টানে রাতের শরীর সেজে উঠছে শ্লথ অতি শ্লথ গতিতে৷ মেক আপের ভাঁজে ভাঁজে লুকোচ্ছে বলিরেখা৷ কাজলের টানে ঠোঁটের রঙে অপ্সরী রমনীর মোহিনীবিদ্যা ক্রমে আছন্ন করছে সন্ধ্যার অলিগলি৷ পুরুষের চওড়া বুকে অভিমানী কথারা একটু একটু করে প্রজাপতির মত ডানা মেলছে৷ আপাত গম্ভীর মুখোশটা ধীরে ধীরে খসে পড়ছে মৌসুমি আবেগে৷ মিলন উৎসবের টানে সুগন্ধিত আলাপ ক্রমে জমে উঠছে আলো আঁধারির মঞ্চ মঞ্চে৷
কেমন কাটল পুজো ? জমাট আড্ডায় একে অন্যের অভিজ্ঞতা হাত বদল করছে ৷ সমর্পণ আপোস যন্ত্রণা প্রাপ্তি কত রঙবেরঙের বুদবুদ উড়ে বেরাচ্ছে অন্তরঙ্গ আবেশে৷ চুল চেরা বিশ্লেষণ, চিরুনি তল্লাশি৷ এই যে মুখোশ ছাড়া উন্মুক্ত খোলা আকাশের নীচে থিকথিকে ভিড়ের প্রাচীর ঠেলে তুমি পুজোর বাজার করেছ, ট্রেনে বাসে ভ্রমণ করেছ, ঠাকুর দেখছ এ প্যান্ডেল থেকে ও প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে, বুর্জ খালিফার সামনে সেলফি তুলেছ, তাতে আমাদের আগামী দিনগুলো কি আবার অভিশপ্ত হবে, বিষ ছড়াবে বাতাসে, আবার চিতা জ্বলবে, আবার স্বজন হারা হবে মানুষ ?
চিল চিৎকারে দোষারোপ করেছে মানুষ একে অন্যকে, সরকারকে, দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষকে৷ তার সাথেই চলেছে আড্ডার মেজাজে ককটেল, শ্যাম্পেনের ফোয়ারা৷ বিজয়ার সেই চিরাচরিত আলিঙ্গন, কোলাকুলি, বাদ যায়নি তাও৷ শুধু কোন কোন ঘরে উৎসব চৌকাঠ পেরিয়ে ঘরে ঢোকেনি৷ ঘরের কোণে কোণে ছত্রেছত্রে শুধু জমাট বেঁধেছে অন্ধকার৷
আমরা মাঝে মাঝে ভুলে যাই প্রদীপের তলাতেই জমে থাকে অন্ধকার৷ আড্ডার সুরও কখনও কখনও কেটে যায়, মলিন হয় কারণ- ” পৃথিবীর আজ বড় অসুখ “৷
এই সুযোগে আমিও জানালাম সকলকে “শুভ বিজয়া”৷
আসছে সপ্তাহে আমাদের সন্ধ্যার আড্ডায় আবার কী নিয়ে দক্ষযজ্ঞ বাঁধে দেখি! চিন্তা করবেন না, একেবার সেই বিষয়টা নিয়েই চলে আসব আগামী সপ্তাহে " পেয়ালা পিরিচ ও একটি সন্ধ্যা"-র পরের পর্বে৷ ভালো থাকুক সকলে৷
বিঃদ্রঃ পেয়ালা পিরিচ সহযোগে সন্ধ্যায় আপনিও জমিয়ে আড্ডা মারুন