T3 || কোজাগরী || বিশেষ সংখ্যায় রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

” কো জাগরী “
” কো জাগরী “- কে জেগে আছ ? ডাক দিয়ে যান তিনি৷ মলয় বাতাসের মন্দ্র প্রবাহে রাতের কুহেলিকা ভেদ করে দ্বারে দ্বারে কড়া নাড়েন৷ ভক্তেরা উন্মেলিত চোখে চেয়ে থাকে দরজার দিকে ৷ পথের দুধার জ্যোৎস্নায় ভেসে যায়৷ সমস্ত চরাচর সেজে ওঠে অনাবিল ঐশ্বর্যে৷ গাছের পাতায় চাঁদবাড়ি৷ ভুবনমোহন ইন্দ্রজালে রাতের শরীর জুড়ে সলমাজরি৷ আবেগি উঠোন৷ ধূপ দীপ মালা চন্দনে মা লক্ষ্মীর আবাহনে কোন ত্রটি রাখা যাবে না৷ আতপের গন্ধ মেখে রাত ধীরেধীরে পাখা মেলে মর্তের অলিতে গলিতে৷
মনোময় সন্ধ্যা ঘিরে এয়োদের হুলধ্বনি, পাঁচালীর পবিত্র সুর৷ পোয়াতি ধানের ক্ষেতে মহতী ঝিল্লীদের অবিছিন্ন একটানা শব্দের আলাপ৷ ঘাটের অন্যমুখে কলসীর বগবগ শব্দ৷ শ্যাওলার কালশিটে মেখে, পার দুটো, অতীতের স্মৃতি হাতরায়৷ ভেসে ওঠে মুখ৷ পরিবার,পরিজন, হারান সম্পর্ক, মানুষ৷ জলছবি বাস্তব খেলা করে শান্ত শীতল জলের আনাচে কানাচে৷ বন্ধুত্বের পান সুপারি হাতে সময়ের দ্রুত পায়ে চলে যাওয়া৷ অরণ্যের নিস্তব্ধ মায়ায় খুঁজে ফেরা জীবনের অমোঘ রহস্য৷
নবীন প্রবীনের আড়াআড়ি আড়ি ভাব৷ দেওয়া নেওয়া আশা, স্বপ্নের বুদবুদগুলো কখনও বা রঙীন হয়ে ওঠে! কখনও রাশভারী কাঁধে চেপে যাতায়াত ন্যায্য অন্যায্যের আকাশ কুসুম কথারা৷ অযাচিত সংস্রব বিষাক্ত মৌতাতে ধ্বংসের বীজ বুনে চলে৷ বিভেদ বিচ্ছেদে আততায়ী সজাগ৷ সময়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসে আঁধার কিংবা আক্রমণ৷ আক্রান্ত মানুষের দিনলিপি ছাপা হয়৷ অক্ষরে অক্ষরে সেজে ওঠে ভীষ্মের শরশয্যা৷ প্রলয় আসন্ন তাই বিরোধিতা, বিরুদ্ধযোগ৷ প্রতিশ্রুতি খোলস ছাড়ে, লোভ চৌকাঠ পেরোয়৷ অবিশ্বাস অনায়াসে জ্বলে ওঠে লেলিহান শিখায়৷ মধ্যযাম পেরিয়ে মৃত্যুর ভ্রূকুটি আরও স্পষ্ট হলে জীবন পিছন ফিরতে চায়৷ পারে না৷
তবু ষোড়শী চাঁদের দর্পনে মা লক্ষ্মীর আগমন৷ সে বার্তা পৌঁছে যায় ইহকাল পরকালের গর্ভ থেকে গর্ভান্তরে৷ আবেগরা তখন মঘবেলায়, ভাসে- ভাসায়৷ ধন, ঐশ্বর্য, ভান্ডারে জমতে থাকে পাকা ধানের ছড়৷
চঞ্চলা মতিতে সন্ধানী দ্বার থেকে দ্বার৷ চরণ এঁকে প্রতীক্ষায় প্রহর গোনা৷ সে পথে তাকিয়ে থেকে জ্বেলে দেওয়া প্রদীপ, হাতে শাখা সিঁদুর৷ ধূপধুনা, ফলপাকাড়ি, অন্নাদি ভোগের ঘ্রানে ম-ম৷ অগণিত হৃদয়ে ভক্তির স্রোত৷ উচ্চারণে দেবী স্তোত্র, পুষ্পাঞ্জলি ফুল৷ সেই মন্ত্রের আবেশে ক্রমশঃ বুঁদ হয় বিশ্ব চরাচর৷ হরিপ্রিয়া এসেছেন৷ অপার সমৃদ্ধি, সুখ শান্তিতে তাই পৃথিবী জারিত৷ তিমিররাত্রির পর, অনেক ধ্বংসের পর, অনেক মৃত্যুর পর এসো জীবনকে জড়িয় ধরি৷
আসন পেতেছি বোসো মা কমলা, বাতাস করি, জিরোও৷ ফুল বিল্লপত্র সহযোগে করজোড়ে বলি-
নমস্তে সর্বদেবানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে।
যা গতিস্তং প্রপন্নানাং সা মে ভূয়াত্বদর্চবাৎ।।
নমস্তে সর্বদেবানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে।
যা গতিস্তং প্রপন্নানাং সা মে ভূয়াত্বদর্চবাৎ।।
নমস্তে সর্বদেবানাং বরদাসি হরিপ্রিয়ে।
যা গতিস্তং প্রপন্নানাং সা মে ভূয়াত্বদর্চবাৎ।।