|| কালির আঁচড় পাতা ভরে কালী মেয়ে এলো ঘরে || T3 বিশেষ সংখ্যায় রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

দক্ষিণা কালীকা দেবী

কালী মূর্তির বিশেষ রূপ নিয় বহু মানুষের তির্যক বক্তব্য বারবার হতাশ করেছে৷ তাই মনে হল ,আমার মনের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করি একবার৷ যাক আমি নিজেকে তার্কিক ,যুক্তিবাদী কোনটা প্রমাণ করার তাগিদ অনুভব করি না |বেদ পুরাণ গুলে খেয়েছি ,তাও নয় |তবু শেকড় তো জানে মাটির প্রকৃতি ,যে মা কে প্রতিদিন স্মরণ করি ,অর্চনা করি ,তাই তাঁকে নিয়ে দু এক কথা লিখেই ফেললাম |

দক্ষিণা কালীকা দেবী করালবদনা ,কৃষ্ণবর্ণা, মুক্তকেশী, চতুর্ভূজা, দিব্যা, মুন্ডমালা বিভূষিতা৷ তাঁর উত্থিত বাম হস্তে খড়গ এবং খড়গ দ্বারা কর্তিত সদ্য ছিন্নমুন্ড, উত্থিত দক্ষিণ করে তাঁর বরমুদ্রা, তিনি অভয়দাত্রি৷ ঘন মেঘের প্রভার মত তাঁর রং তিনি দিগম্বরী, তাঁর গলদেশে মুন্ডমালা থেকে রক্ত ঝরছে৷ শবসমূহের হস্তসমূহ দ্বারা তাঁর কটিমেখলা রচিত এবং তিনি লাস্যময়ী| তিনি শবরূপী মহাদেবের বক্ষের উপর অবস্থিতা৷ সুখ প্রসন্নবদনা ,তাঁর মুখমন্ডল প্রস্ফুটিত পদ্যহাস্যে সমুজ্জ্বল৷

মা কেন দিগম্বরী -কেন বিবস্ত্রা ?কেন মুন্ডমালা গলায় পরিহিতা ? কেন এত রক্তপাত ? মা কি কখনও রক্ত পান করেন ? কেন তিনি স্বামীর উপর দন্ডায়মান ? এমন অনেক প্রশ্নবাণ ছুঁড়েছেন বহু গুনিজন, এমন অনেক লেখনীতে ভরে গেছে ফেসবুকের দেওয়াল, অনুসন্ধিৎসু মন জানা না জানা তথ্যগুলোকে নিয়ে বিশ্লেষণের পথ ধরে হেঁটেছে |
পৌরাণিক কাহিনীর বিশ্লেষণ আমাদের সকলের জানা৷ মা দূর্গার হস্তে নিধন হয় সমস্ত অসুরকূলের ,বেঁচে যায় শুধুমাত্র রক্তবীজ৷ রক্তবীজ ব্রম্ভার দ্বারা বরপ্রাপ্ত হন তিনি, তার একফোঁটা রক্ত মাটিতে পরলে তার থেকে জন্ম নেবে আরও অনেক রক্তবীজ, অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেন দেবী দূর্গা৷ তাঁর পুন্ঞ্জীভূত ক্রোধে কুন্ঞ্চিত হয় ভ্রু যুগল ,সেইখান থেকে আবির্ভূতা হন মা কালী ৷ |রক্তবীজের সঙ্গে ভয়ানক যুদ্ধে কখন যে দেবী বিবস্ত্রা হয়ে পরেন বুঝতে পারেন না৷ অবশেষে সৃষ্টির রক্ষার্থে রক্তবীজের শির কর্তন করেন এবং সম্পূর্ণ রক্ত পান করেন যাতে একবিন্দু রক্ত ভূমিতে না পরে৷ দেবী কিছুতেই শান্ত হন না ,বহুবার মৌখিক অনুরোধ করেন দেবাদিদেব ,তবু দেবী শান্ত হন না, অবশেষে মহাদেব ,দেবীর পদতলে শায়িত হন এবং যেই মুহূর্তে দেবীর পদ মহাদেবের শরীর স্পর্শ করে তিনি অনুশোচনায় জিহ্বা বার করেন |
এই সোজাসাপটা কাহিনীর অন্তরালে রয়েছে নিগূঢ় তত্ত্ব ,অসীম মহাকাশের অন্তর্নিহিত তথ্য সেই কুহেলিকা সরিয়ে সত্য প্রকাশ করার চেষ্টা মাত্র৷
আজ থেকে সাতশো কোটি বছর আগে আলোর গোচরীভূত প্রকাশ হয় |সেই আলোর বর্ণচ্ছটা হল একান্নটি৷ সাতটি রঙের আবার সাতটি করে ভাগ ,লঘুতা এবং তীব্রতার উপর ভিত্তি করে |অর্থাত্ মোট উনপন্ঞ্চাশটি রং৷ তার সঙ্গে যুক্ত হয় সত্ত্বগুনবর্ণ অর্থাত্ শেতবর্ণ এবং ত্বমোগুণবর্ণ অর্থাত্ কৃষ্ণবর্ণ অর্থাত্ সর্ব মোট একান্নটি| তারই প্রতীক হিসাবে মায়ের গলায় পন্ঞ্চাশটি মুন্ডের মালা এবং মায়ের বাম হাতে একটি মুন্ড৷ মায়ের দক্ষিণ হস্তে হল বরাভয় | নৃমুন্ড হল চেতনার আধার| সৃষ্টির তরঙ্গের প্রতীক | মায়ের আলুলায়িত কেশ প্রচণ্ড তেজ ও শক্তির প্রতীক |তিনি বিবসনা কারণ অনন্ত অসীমকে আবৃত করে সীমার সঙ্গে অনন্ত অসীমকে সীমায়িত করা কখনই যায় না| মা কালীর প্রসারিত জিহ্বা খেচরমুদ্রার প্রতীক ,যা বিশ্বব্রহ্মান্ডের ভারসাম্য রক্ষা করে |আদ্যাশক্তি মহামায়া স্বয়ং জীব জড়ের কেন্দ্রীভূত লীলার লীলাময়ী |
মা কালীকে জিহ্বা বের করে রাখতে দেখি, মা আসলে জিহ্বা বের করেই রাখেন নি তিনি লাল জিহ্বাকে সাদা দাঁত দিয়ে কামড়ে রেখেছেন |এখানে সাদা রং সত্ত্ব গুণের প্রতীক৷ লাল রং রজোগুণের প্রতীক৷ লাল জিহ্বাকে সাদা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরার অর্থ সত্ত্বগুণ দিয়ে রজোগুণকে দমন করা৷ অনেকে বলেন মাকালী রক্ত পান করছেন তারই জন্য জিহ্বা লাল৷ রক্ত পান করলে তো দাঁতে লাল রক্ত লেগে থাকতো, তা কি আছে? মা সন্তানের রক্ত পান করবেন কেন? কথিত কাহিনী অনুসারে মা মহাদেবের উপর দাঁড়িয়েছিলেন বলে জিহ্বায় কামড়ে ছিলেন |কিন্তু এ সত্য বর্ণিত আছে শিবকে শক্তি দেয় শিবানী ,আর শক্তিহীন শিব ,শব হয়ে যায় |তাই তিনি মায়ের পদতলে৷ সবই শক্তির অধীন৷

পৌরাণিক কাহিনীর কুহরে লুকিয়ে থাকা তত্ত্বের এবং দর্শনের কুহেলিকা উন্মোচনের চেষ্টা করলাম মাত্র ,কালীপূজার রাত্রিতে দ্বীপাবলীর আলোক স্নানে ,কলুষমুক্ত হোক আমাদের হৃদয় ,সেই আলোয় প্রতিবার অশুভ শক্তির বিনাশ হয়ে ,শুভ বুদ্ধির ও শুভ শক্তির সূচনা হোক -এই প্রার্থনাই করি ||

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।