সম্পাদিকা উবাচ

আজ এক চিরসুন্দর প্রেমের জন্মদিন

Beauty is truth, truth beauty,-that is all
Ye know on earth, and all ye need to know.”

যাঁর লেখা তাঁর নামের আগে লেখা হয় ‘চিরসুন্দরের কবি’। জন কীটস, রোমান্টিক যুগের সুবিখ্যাত কবিদের একজন। সৌন্দর্য, তারুণ্য আর একই সাথে দণ্ডিতের প্রতীক জন কীটস। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে শুরু হওয়া ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক ধারায় যে ক’জন কবি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে অনন্য একজন জন কীটস। ইংরেজি সাহিত্যের এক নতুন যুগের সূচনালগ্নে তার জন্ম। মাত্র ২৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও তার অনন্যসাধারণ কল্পনাশক্তি, মনন ও সৌন্দর্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণ দিয়ে এই সংক্ষিপ্ত জীবনকালকেই তিনি চিরস্মরণীয় করে গেছেন।

তাঁর কবিতা ২০০ বছর পরেও পাঠককে তৃপ্ত করতে পারার পেছনে অনেক কারণ আছে। রোমান্টিক কবিতার যেটি প্রধান বৈশিষ্ট্য—অনুভূতির সরস বর্ণনা, হোক তা প্রেমের, বিষাদের কিংবা হতাশার, যেকোনো আবেগের, যেকোনো মুগ্ধতা বা উচ্ছ্বাসের সাবলীল প্রকাশ, সেটি কিটসের কবিতায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে। কবিতা সম্পর্কে তাঁর মতামত ছিল সোজাসাপ্টা, খুব স্পষ্ট। প্রকাশক জন টেইলরের কাছে এক চিঠিতে বলেছেন, ‘গাছের পাতা যেমন প্রাকৃতিক উপায়ে জন্মায়, কবিতারও তেমনই স্বাভাবিকভাবে জন্ম নিতে হয়, নতুবা সে কবিতার না আসাই ভালো।’

ওড’-কে সরাসরি বাংলা করে বলা যায় ‘গাঁথা’, কিন্তু এই এক গাঁথা বা স্তবগানমূলক কবিতায় যে কত ভিন্নতা থাকতে পারে, বৈচিত্র্য থাকতে পারে তা কিটসকে না পড়লে বোঝা সম্ভব নয়। ‘ওড অন আ গ্রেসিয়ান আর্ন’, ‘ওড অন ইনডলেন্স’, ‘ওড টু সাইকি’ কিংবা ‘ওড অন মেলানকলি’ শ্রেণিবিন্যাসের দিক দিয়ে একই জনরারের ( ধারা ) হলেও বিষয়বৈচিত্র্যে একেবারে ভিন্ন, প্রতিটি তার নিজের মতন, প্রতিটির প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া আলাদা। লকহার্টের মতো যেসব সমালোচক নিওক্লাসিসিজম দ্বারা আবিষ্ট থেকে কিটসের প্রতিভাকে অস্বীকার করতে চেয়েছিলেন শুরুতে, তাঁদের হার মানতে হয়েছে ওডগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর। ‘ওড টু নাইটিংগেল’-এ কিটস বুলবুলির গানকে বলেছেন ব্যথানাশক, বলেছেন সে গান সুন্দর, কারণ তাতে মানবজীবনের যন্ত্রণা নেই। কল্পনাশক্তিকে প্রাধান্য দিতেন তিনি। শেলির কাছে লেখা এক চিঠিতে বলেছেন, ‘আমার কল্পনা হলো এক দেবালয়, আমি তার পুরোহিত।’ নিজে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়েও বলতেন বিজ্ঞানের তথ্য আমাদের কল্পনাকে নষ্ট করে, আমরা হারিয়ে ফেলি সৌন্দর্যবোধ। লামিয়াতে রংধনু নিয়ে বলেছিলেন রংধনু তৈরি হওয়ার কার্যকারণটি জেনে ফেললে তা দেখে মুগ্ধ হওয়া আর হয়ে ওঠে না।

কীটস যদি শুধু Ode-গুলোই রচনা করতেন, তবুও তিনি সাহিত্যপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে এইভাবেই বাস করতেন৷ তার সমস্ত হৃদয়-মন ছিলো সৌন্দর্যের নন্দলোকে আবদ্ধ। তার সকল সৃষ্টিকর্মে তিনি সৌন্দর্য ও মাধুর্যের পূজারী ছিলেন। তবে তার বিশেষত্ব শুধু সৌন্দর্যের বর্ণনায় ছিলো না, ছিলো প্রকৃত সৌন্দর্য খুঁজে বের করার সক্ষমতার মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ বস্তুগুলোর মধ্যে তিনি পেয়েছেন সৌন্দর্য, বিষণ্নতাকে বলেছেন সৌন্দর্যের পরিপূরক। তার কাছে প্রকৃতির মাঝে লুক্কায়িত এই নিগূঢ় সৌন্দর্যের অস্তিত্ব ছিলো মহান সত্য। আর তাই তিনি বলেছেন, “Beauty is truth, truth beauty”। সৌন্দর্যের মধ্যে একটা সুগভীর শান্তির ভাবও আছে। এই শান্তভাবের মধ্যেও রয়েছে বিষণ্ণতা। এই বিষণ্ণতা এসেছে কবিমনে স্বল্পায়ু জীবনের নশ্বরতার চিন্তা থেকে, মানব নিয়তির নিস্ফলতা বোধ থেকে। তবুও পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে যে সৌন্দর্যের যে রূপ-মাধুরী তিনি সম্ভোগ করেছেন, তাকেই চিরন্তন করে রেখে গেছেন তার Ode-গুলোর মধ্যে দিয়ে।

কীটস ছিলেন রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ কবি। তার সমসাময়িকরা সকলে শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক বেশি উচ্চে ছিলেন। কীটস স্কুলের গন্ডীটাও ঠিকমতো পার হতে পারেন নি। কিন্তু যা পড়তেন, যার সংস্পর্শে আসতেন, তাকে আত্মগত করে নেওয়ার অসীম ক্ষমতা ছিলো তার। আর তাই স্পেন্সার, চ্যাপম্যান, মিল্টন, শেক্সপিয়ার, লে-হান্ট কারও প্রভাব থেকেই তিনি মুক্ত নন। মাত্র ৬ বছরের কাব্যজীবনে যে ফসল তিনি ঘরে তুলেছেন তা মোটেও নগন্য নয়। সমসাময়িক সকলের থেকে গৃহীত বৈচিত্র্যময় সব উপাদান নিয়ে গঠিত এক অপূর্ব রূপমূর্তি ছিলো তার সৃষ্টির।

১৮২০-এর ফেব্রুয়ারিতে ফ্যানিকে কীটস লিখেছিলেন, “আমি এমন কোনো মহান কর্ম পেছনে ফেলে যাচ্ছিনা যা আমার বন্ধুদের গর্বিত করবে, আমি শুধু প্রতিটি জিনিসের ভেতরের সৌন্দর্য্যের উৎসকে ভালোবেসেছি। সময় পেলে নিজেকে স্মরণীয় করে যেতাম।” সত্য, সৌন্দর্য আর প্রেমের পিয়াসী এই কবি তার পরেও স্মরণীয় হয়ে আছেন তার অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম দিয়ে, মানুষের মাঝে সৌন্দর্যতত্ত্বের বীজ বুনে দিয়ে। এক বসন্ত যায়, আরেক বসন্ত আসে। বাসন্তী হাওয়ায় ভেসে বসন্তের দূতের মতো চিরকাল কাব্যপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে যান জন কীটস। চিরবসন্তের দুনিয়ায় চিরসুখী থাকুন চিরসুন্দরের কবি।

রবীন্দ্রনাথ ভীষণ মুগ্ধ ছিলেন কিটসে। তাঁর দর্পহরণ গল্পে নির্ঝরিণী দেবীর স্বামী তাকে ‘ওড টু নাইটিংগেল’ অনুবাদ করে শোনান। ইন্দিরা দেবীকে লেখা এক পত্রে কবিগুরু জানিয়েছিলেন তাঁর মুগ্ধতার কথা। ‘যত ইংরাজ কবি জানি, সব চেয়ে কীটসের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা আমি বেশী অনুভব করি…কীটসের ভাষার মধ্যে যথার্থ আনন্দসম্ভোগের একটি আন্তরিকতা আছে। ওর আর্টের সঙ্গে আর হৃদয়ের সঙ্গে বেশ সমতানে মিশেছে—যেটি তৈরি করে তুলেছে সেটির বরাবর তাঁর হৃদয়ের একটা নাড়ীর যোগ আছে।…কীটসের লেখায় কবিহৃদয়ের স্বাভাবিক সুগভীর আনন্দ তাঁর রচনার কলা-নৈপুণ্যের ভিতর থেকে একটা সজীব উজ্জ্বলতার সঙ্গে বিচ্ছুরিত হতে থাকে। সেইটে আমাকে ভারী আকর্ষণ করে। কীটসের লেখা সর্বাঙ্গসম্পূর্ণ নয় এবং তাঁর প্রায় কোনো কবিতারই প্রথম ছত্র থেকে শেষ ছত্র পর্যন্ত চরমতা প্রাপ্ত হয়নি, কিন্তু একটি অকৃত্রিম সুন্দর সজীবতার গুণে আমাদের সজীব হৃদয়কে এমন ঘনিষ্ঠ সঙ্গদান করতে পারে।’

মাত্র ৫৪টি কবিতা জীবদ্দশায় প্রকাশ করতে পেরেছিলেন কিটস, ছোট-বড় মিলিয়ে বাকি সব কাজ বেরিয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরে। কিছু চিঠিপত্র লিখেছেন প্রেমিকা আর বন্ধুদের, সেগুলোও নিঃসন্দেহে সাহিত্যভান্ডারের অমূল্য সম্পদ। লিখেছেন বছর ছয়েক। প্রকাশিত কবি হিসেবে বেঁচে ছিলেন মোটে চার বছর। মৃত্যুর পরেও বহুদিন সেই অর্থে জনপ্রিয় হননি। কিটসের অকালপ্রয়াণে শোকাভিভূত শেলি লিখেছিলেন দীর্ঘ এলিজি অ্যাডোনেইস। পরবর্তীকালে কিটস অনুপ্রেরণা হয়েছেন অনেক কবি আর লেখকের জীবনে। প্রকৃতি, প্রেম, সত্য আর সুন্দরের পূজারী জন কিটস নাইটিংগেলকে বলেছিলেন ‘অমর’। আসলে কিটস নিজেই অমর হয়েছেন তাঁর সৃষ্টিতে, তাঁর দর্শনে। ‘সত্য সুন্দর, আর সুন্দরই সত্য, এটুকুই জানতে পার, এটুকুই জানা জরুরি’—কিটসের মতন করে আর এ কথা বলতে পেরেছে!

১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক জীবনকাল সমান নিঃসঙ্গতার দিনপঞ্জী, অপূর্ণ প্রেমকে পূর্ণ করার আমৃত্যু বাসনা আর এক মাত্রাহীন শারীরিক কষ্ট নিয়ে চিরসুন্দরের এই কবি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। রোমের প্রোটেস্ট্যান্ট সিমেট্রিতে কবিকে দাফন করা হয়। তার শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তার সমাধি ফলকে কোনো নাম বা তারিখ লিখা হয়নি। শুধু লিখা হয়েছে, “এখানে এমন একজন শায়িত, যার নাম লিখা হয়েছিলো জলের ধারায়।” নিজের ক্ষণস্থায়ী জীবনকে এভাবেই বর্ণনা করে গেছেন কীটস।
যতদিন মানুষের জীবনে প্রেমের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন কীটস আমাদের হৃদয়ে বাস করবেন৷

সকলে সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, লিখতে থাকুন, পড়তে থাকুন৷


রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।