কবিগুরুর ” ডাকঘর ” নাটকের কথা মনে আছে নিশ্চয় ? বিশ্বকবি যেখানে আলো-বাতাসময় পৃথিবীর সন্তান অমলের কন্ঠে দইওয়ালার উদ্দেশ্যে বলিয়েছেন –
“আমাকে তোমার মতো ঐরকম দই বেচতে শিখিয়ে দিয়ো। ঐরকম বাঁক কাঁধে নিয়ে- ঐরকম খুব দূরের রাস্তা দিয়ে।”
আজকালকার বিয়েবাড়ি থেকে শুরু করে প্রতিদিনের মধ্যাহ্নভোজনের শেষ পাত , সবেতেই দই যে একাই ওস্তাদ তা বলাই বাহুল্য । মাঝেমধ্যে তাই মনে হতেই পারে দই বাবাজীর জন্য বাংলার প্রবাদ বাক্য বদলে ” ওস্তাদের মার শেষ পাতে ” করাটাই বোধহয় শ্রেয় । আবার কোনো শুভকাজে যাওয়ার আগে এক চামচ দই মুখে দেওয়ার ও দইয়ের ফোঁটা দেওয়ার প্রবণতাও অনেকের মধ্যে প্রচলিত । এমনকি বাংলায় আস্ত একটা প্রবাদ বাক্য রয়েছে ” নেপোয় মারে দই ” ।
দই বাঙালীর জীবনে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে আমরা ধরে নিই দইয়ের উৎপত্তি হয়তো বাংলায় । কিন্তু এই ধারণা একেবারেই ভুল । দুগ্ধজাত এই খাবারটির বয়স কমপক্ষে চার হাজার বছর তো হবেই। তবে দইয়ের উৎপত্তি কিন্তু এই দেশে এমনকি বঙ্গদেশেও নয়। দইয়ের বীজাণুর নাম হল ল্যাক্টোব্যাসিলাস বুলগেরিকুশ। নামের মধ্যেই রয়েছে উৎপত্তির সংকেত । ঠিক ধরেছেন , বুলগেরিয়া ! সেখানকার প্রায় সব খাবারেই আপনি দইয়ের স্বাদ পাবেন। বুলগেরিয়াতে সকালের জলখাবার থেকে নৈশভোজ সবেতেই দইয়ের রমরমা ।
টক দইতে আছে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, যা হাড় ও দাঁতের গঠনে সহায়ক। মহিলাদের টক দই বেশী প্রয়োজন, কেননা তাঁরাই ক্যালসিয়ামের অভাবে বেশী ভোগেন। টক দইয়ের ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত উপকারী। এটা শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। এছাড়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে টক দইয়ের জুড়ি নেই । টক দইয়ে আছে ল্যাকটিক অ্যাসিড, যা কোষ্টকাঠিন্য দূর করে ও ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে। এটি কোলন ক্যান্সার রোগীদের খাদ্য হিসাবে উপকারী। যাঁরা দুধ খেতে পারেন না বা দুধ যাদের হজম হয় না, তারা অনায়াসেই টক দই খেতে পারেন। কারণ টক দই সহজপাচ্য। ফলে স্বল্প সময়ে হজম হয়।
টক দই ওজন কমাতেও সাহায্য করে। পেট দীর্ঘক্ষণ ভরা থাকায় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করতে ইচ্ছে করে না। ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। টক দই শরীরের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রতিদিন মাত্র এক কাপ করে টক দই খেলে উচ্চ রক্তচাপ প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমে যায় এবং স্বাভাবিক হয়ে আসে। এছাড়া এটি রক্তের খারাপ কোলেষ্টেরলের মাত্রাও কমিয়ে দেয়।
হার্টের অসুখ ও ডায়াবেটিসের রোগীরা টক দই খেলে রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
টক দই শরীরে টক্সিন জমতে দেয় না। ফলে অন্ত্রনালী পরিস্কার থাকে। যা শরীরকে সুস্থ রাখে ও বার্ধক্য রোধে সাহায্য করে। শরীর সুস্থ রাখার জন্য ও স্বাদ বদলের জন্য দইয়ের কয়েকটি কয়েকটি সহজ পানীয় বাড়িতে বানিয়ে ফেলতেই পারেন –
লস্যি : গরমকালে অনেক ধরনের শীতল পানীয় পাওয়া গেলেও দই ফেটিয়ে তৈরী করা লস্যির কাছে সবই বেমানান । আর লস্যি বানিয়ে যে যার পছন্দমতো ফ্লেভার যোগ করে নিলেই কেল্লাফতে । শুধু স্বাদই নয়, যেহেতু লস্যি দই থেকে বানানো হয় তাই এটি স্বাস্থ্যের জন্যও লাভজনক । লস্যি খেলে হজমশক্তি বাড়ে কারন এতে পাওয়া যায় ল্যাকটোব্যাসিলাস যা পাচনশক্তি বৃদ্ধি করে । যাঁরা টকদই খেতে পারেন না তাঁরা পেট ফুলে যাওয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যর থেকে বাঁচতে নিজের পছন্দমত ফ্লেভারের লস্যি বানিয়ে খেয়ে ফেলুন ।
আয়রান : টক দইয়ের সাথে রসুন, লবণ ও পুদিনা পাতা মিশিয়ে তৈরি করা হয় আয়রান। এটি তুর্কির একটি মজাদার পানীয়। এই পানীয়টি ক্লান্তি দূর করে, সতেজতা এনে দিতে পারে নিমেষেই ।
স্মুদি : দই দিয়ে বানানো আরেকটি মজাদার পানীয়ের নাম হলো স্মুদি। স্মুদিতে ফলের আধিক্য থাকে সবথেকে বেশি। আম, আপেল, কলা, লিচু , আঙুর ইত্যাদি ফল এবং মিষ্টি দই দিয়ে স্মুদি তৈরি করা হয়। এই মিষ্টি পানীয়টি শুধু পিপাসা মেটায় না, পেটও ভরা রাখে অনেকটা সময়।
লাচ্ছি : দই দিয়ে বানানো আরেকটি পানীয় হল লাচ্ছি। দইয়ের সাথে চিনি, বরফ দিয়ে খুব সহজেই লাচ্ছি তৈরি করা যায় । এছাড়া বিভিন্ন ফল যেমন: আম, কলা ইত্যাদি দিয়েও তৈরি করা হয় লাচ্ছি। দই থেকে তৈরি এই পানীয়টি সুস্বাদু ও তৃপ্তিদায়ক ।
বাঙ্গির শরবত : বাঙ্গি ওরফে খরবুজ বা ফুটি ছোট ছোট টুকরো করে তার সাথে জল দিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে নিতে হবে। বাঙ্গি ও জল ভালোভাবে মিশে গেলে এর মধ্যে দই, চিনি এবং লেবুর রস দিয়ে আবার ব্লেন্ড করতে হবে। মিশ্রণটি গ্লাসে ঢেলে বরফ কুচি দিয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়ে পরিবেশন করলেই জমজমাট বাঙ্গির শরবত ।
মাঠা : টক দই দিয়ে মাঠা নামক পানীয়টি তৈরি করা হয়। মাঠাতে লেবু, বিট লবণ, চিনি ইত্যাদি লাগে। গরমে শরীর শীতল করতে মাঠার জুড়ি মেলা ভার। এমনকি কিছু রোগের পথ্য হিসেবেও মাঠা খেতে হয় রোগীকে ।
ঘোল : মাঠার মতোই টকদইয়ের তৈরি আরেকটি পানীয় হলো ঘোল। এতেও লেবু, বিট লবণ দুটোই প্রয়োজন হয়। মাঠা আর ঘোল তৈরির প্রণালীও প্রায় একই রকম। তবে মাঠা আর ঘোলের মধ্যে ঘোলের স্বাদ বেশি মজাদার ।
লাবাং : অনেকটা মাঠা আর ঘোলের মতোই দই দিয়ে প্রস্তুত আরেকটি পানীয় হলো লাবাং। এটি মধ্যপ্রাচের দেশসমূহে খুব প্রচলিত একটি পানীয়। তবে মাঠা বা ঘোলের থেকে লাবাং এর ঝাঁঝ একটু বেশি হয় ।
বোরহানি : টক দই দিয়ে তৈরি করা আরেকটি পানীয় হলো বোরহানি। এটি হজমে সহায়তা করে। তাই বিরিয়ানী, তেহারি ইত্যাদির সাথে অতি প্রয়োজনীয় পানীয়ের নাম বোরহানি। বোরহানি মূলত পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পানীয়।