মায়ের ডাকে ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো বুম্বার – অনেক বেলা হয়ে গেল, তোর অফিস কিন্তু শুরু হয়ে যাবে এবার। ঘুম জড়ানো গলায় বুম্বা বললো – আজকে রবিবার মা। আরেকটু ঘুমাতে দাও। সবে ৯টা বাজে তো। প্রায় ১০টার দিকে ঘুম থেকে উঠে মন দিয়ে ২টো ডিমপরোটা খেলো, তারপর অনেকটা গোলাপ খাস আমের বংশ ধ্বংস করল। রেডিও টা অনেকদিন পরে চালালো- একি প্যান প্যান করে কিসব গান হচ্ছে, সব কটা স্টেশন ঘুরিয়ে দেখলো, নাহ্ শোক সভার মত গান হচ্ছে কেনো? কোনো নেতা – মন্ত্রী মারা গেলো নাকি? নাকি রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হলো এই করোনার জন্য। যাইবাবা টিভি টা খুলে দেখি তো, বলে টিভি খোলা মাত্র- রিপোর্টার সুদীপদা ঝাপিয়ে পরল রবীন্দ্রনাথ ও ২৫ শে বৈশাখ নামক বস্তু নিয়ে। ওহ্! ওই দাড়িওয়্যালা দাদুর birthday আজকে। মনে আছে আগের বছর অফিসের মেয়েরা সবাই কিরম ভাবে যেনো শাড়ি পরে এসেছিল, আর অনেক কষ্ট করে বাংলায় সারাদিন কথা বলার চেষ্টা করছিল। ও তো সেই দিনটা আবার ঘুরে চলে এলো। একটু ফেসবুক খুলিত। ওমা এখানেও দেখি রবিদাদু কে নিয়ে আদিখ্যেতা চলছে। এখনো ঠিকমত কথা বলতে না পারা বাচ্ছা গুলোকে দিয়ে বাবা-মা সবাই কবিতা আবৃত্তি করাতে চাইছে। একটা বাচ্ছা তো কেঁদেই ফেললো বড়মামার বকাতে। যাইহোক সারাদিন এই করেই কেটে গেলো, আজকে mother’s Day ছিল মায়ের জন্য কিছু কেনাই হলনা।বাবা সন্ধ্যে বেলা বেশ ঘটা করেই রবিদাদুর ছবির সামনে মালা, ধুপ, মিষ্টি সাজিয়ে দিল। একটু পরে ছোটো বোন মিলি ফেসবুক লাইভে রবীন্দ্র নৃত্য পরিবেশন করে কিছু বং ছেলের ক্রাশ হয়ে উঠলো। সঙ্গীতা ও ফোন করে বললো ওর লাইভে লাভ কমেন্ট করতে, তাও করে দিল বুম্বা। কিন্তু সবাই শুধু আজকেই কেনো রাবিদাদু কে নিয়ে মেতে উঠলো বুজতে পারছেনা কিছুতেই বুম্বা। সারা বছর কেউতো একটা গান ও শোনেনা। যাইহোক ফেসবুকে মুক্তধারা নাটক টা দেখতে দেখতে, ধূপের গন্ধে সন্ধেবেলা আবার একটু ঘুমিয়ে পড়লো বুম্বা।
সত্য
মা রাতে খাওয়ার জন্য ডাকছে, শুনতে পাচ্ছি কিন্তু উত্তর দিতে একটুও ইচ্ছা করছেনা, সন্ধ্যেবেলা রাবীন্দ্রিক আমসত্ত্ব প্রসাদ খেয়ে মুখটা মেরে দিয়েছে। যাইহোক আজ বাবার যা রবি পুজোর ঘটা দেখলাম তাতে মনে হচ্ছে রাতে নিশ্চই খাসির মাংস হচ্ছে। সুরুৎ করে জিভের জলটা টেনে নিয়ে উঠে বসতে গিয়ে মাথাটা কেমন যেনো ঠুকে গেলো কিসের সাথে! ওমা, চোখ খুলে দেখি বাবা ঝোব্বা দাড়ি-গোঁফ লাগিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেজেছে। বাবার দড়িটা ধরে টানতেই ওম ব্রম্ভ: বলে উঠলো বাবা। তারপর দেখি এত সত্যিকারের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!! আমি তো পুরো থ মেরে গেলাম। মৃদুমন্দ সুরেলা গলায় বলে উঠলেন- কিহে আমায় দেখে অমন চমকে ওঠার কি আছে? তোমার বাড়ির সন্দেশটা চাখতে এসেছিলাম, তা বেশ ভালই।আজ সবাই এত্ত বন্দনা করলো আমার তুমি কিছু করলেনা কেনো হে? বলতে বাধ্যই হলাম- আপনার কবিতা, গান, গল্প কোনোটাই ভালো লাগেনা। এত্ত বড় বড় কবিতা কেনো লিখেছিলেন বলুনতো? ছোট্ট বেলা থেকে প্রতি বছর মুখস্ত করতে করতে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে। আপনার গান শুনে একটুও নাচতে ইচ্ছা করেনা, আপনার গল্প পরে একদম হাসি পায়না। আপনার কবিতা মুখস্ত বলতে না পারার জন্য কত মার খেয়েছি জানেন আপনি? একমাত্র ওই দুরন্ত আশা কবিতাটাই আমার একটু ভালো লাগে, কারণ ঐটাই আমি মাত্র দুদিনের মধ্যে মুখস্ত করতে পেরেছিলাম।
রবীন্দ্রনাথ খুবই রেগে গিয়ে বললেন – আমার শান্তিনিকেতন এ আমার শিশুদের গায়ে হাত দেয় এত বড় সাহস কার হয় নামটা বলতো ভাই আমায় আজ রাতে গিয়ে তাকে আমার সমস্ত কবিতা মুখস্ত ধরবো আমি? আর আমার কবিতা তোমরা কেনোই বা মুখস্ত করতে যাবে, ওগুলোতো আমি নিজের ভালো লাগার জন্য লিখেছিলাম।আমি বলে উঠলাম আমি কি আর তোমার শান্তিনিকেতনে পড়তাম নাকি, আমি তো পড়তাম একটা English Medium স্কুলে। এবাবা সরি আপনাকে ভুল করে তুমি বলে ফেললাম। উনি দাড়ির ফাঁকে এক চিলতে হাসি দিয়ে বলে উঠলেন – তুমি আমাকে তুমি বলো ভাই। আচ্ছা আমি কী তোমাকে রবীদাদু বলতে পারি গো? হ্যা নিশ্চই পারো, আমি তো তোমরা দাদুর ও দাদুর বয়সি। আচ্ছা রবিদাদু আমি কলেজে পড়ার সময় শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গেছিলাম জানো,তুমি নিজেও যেমন লম্বা ছিলে তোমার কবিতা গুলোও তেমনি লম্বা লম্বা। কেনো ভাই আমি তো একশটার মত ছোটো গল্প লিখেছি, তুমি সেগুলো পড়নি? হ্যা দাদু পড়েছি, কিন্তু ঠিক সব গল্প ভালো লাগেনি দাদু। তোমার বাড়ি ঘুরতে গিয়ে জানো ২দিন ধরে মা আমায় শুধু সবজি ভাত খাইয়ে গেছে, আর আমাদের পাশের টেবিলে বসে মাছ, মাংস , ডিম খেয়ে যাচ্ছিল ৩টে দাদা। টোটোওয়ালা গুলোও যেমন ভাবে লোকজনকে বোঝাচ্ছিল যে তুমি ঐ বড় বট গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে কবিতা ভাবতে, শুনে আমার খুব হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু বড়দের সামনে হাসতে পারিনি। এটা শুনে রবীদাদুর সেকি হাসি, আমি তো অবাক! আমি গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কেনো কবিতা ভাবতে যাবো, ওখানে তো আমার বাড়ির অভাব ছিলনা ভাই। আমিও ঠিক এটাই বলেছিলাম কিন্তু মা বললো ঠাকুর দেবতা নিয়ে ইয়ার্কি মারলে নাকি নরকে যাবো তাই আর বলিনি কাউকে। আচ্ছা আমার বাড়ি গিয়ে তুমি শুধু সবজি ভাত খেলে এটা শুনেই আমার কষ্ট হচ্ছে, আমি জমিদার ছিলাম আর এইটুকু একটা ভাইকে কিনা আমার বাড়ি ঘুরতে এসে সবজি ভাত খেতে হলো। এত দেখি ঘোর অন্যায়। আচ্ছা কেমন লাগলো আমার বাড়ি ভাই? দাদু আমার খুব ভালো লেগেছে তোমার বাড়িগুলো মনেহয় ওখানে মাঝে মাঝেই ঘুরতে যাই। আচ্ছা জানো সবই দেখলাম কিন্তু তোমার নোবেল প্রাইজ টাই দেখতে পেলাম না, আসলটা চুরি হয়ে গেছে, নকল টা সাজিয়ে রেখেছে। একি দাদু হাসছে কেনো? শোন ভাই আমি নিজেই ওটা লুকিয়ে রেখেছি যেভাবে ওটা হাতানোর কথা কানাঘুসো হচ্ছিলো তাই আগে ভাগে নিজেই ওটা নিজের কাছে সরিয়ে রেখেছি, তোকে ভাই একদিন এনে দেখাবো। আচ্ছা দাদু আমি তোমার কাছে একটা জিনিস চাইব? হ্যা ভাই বলতো তোকে কিছু দিতে পারলে আমি নিজেই খুব খুশি হব। আমার জন্য তোর এত্ত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে শুনে আমারি কষ্ট হচ্ছিলো। বলছি দাদু আজ তো Mother’s Day তুমি আমায় একটা কবিতা লিখে দেবে আমি মা কে উপহার দেবো। এই তো লিখে দিচ্ছি কিন্তু আমার কথা যেমন লোকে সারাবছর ভুলে থেকে শুধু আজকে আদিখ্যেতা করে আমায় নিয়ে, তাতে তোমার রাগ হচ্ছিলো ঠিক সেইরকম ভাই মা কেও সারাবছরই শ্রধ্যা ভালোবাসা দিতে হয়, শুধু একটি গিফ্ট দিয়ে আদিখ্যেতা করলে সেটাও কিন্তু মা কে অপমান করাই হয়। ঠিক বলেছো দাদু। আমি সারা বছরই মায়ের কথা শুনে চলবো কথা দিলাম। আচ্ছা তুমি ফিরে এসে সবাই কে বলনা যে তুমি এই গুলো করতে বলনি। আমি কি করে ফিরে আসবো ভাই? আমি তো তোমাদের মধ্যেই আছি। ওমা দাদু নেতাজি তো নাকি ফিরে আসছে এটা জানোনা? তাই নাকি এই গল্পটা তো পরের দিন শুনতে হবে তোর কাছে ভাই। আচ্ছা আজ তবে আসি। তুমি ঘুমিয়ে পরো খেয়ে নিয়ে।
মায়ের এক ধাক্কায় ঘুম ভাঙ্গলো আমার। চোখ খুলে ঠিক বুজতে পারলামনা কি হলো এতক্ষণ। দেখলাম আমার অফিস এর খাতায় একটা কবিতা লেখা, নিচে সিগনেচার করা ঠিক যেমন দেখেছিলাম শান্তিনিকেতন – এ রবিদাদুর কবিতার খাতায়।