ক্যাফে টকে প্রাপ্তি সেনগুপ্ত

সেদিনও ছিল ২২শে শ্রাবণ… ঠাকুরবাড়ি লোকে লোকারণ্য। পাঁচ নম্বর বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় বসে অবন ঠাকুর আপন মনে এঁকে চলেছেন একটি ছবি— সে ছবি রবিকা-র অন্তিমযাত্রার। পরে প্রবাসীতে ছাপাও হয়েছিল সে ছবি।
অথচ সেটাই আবার ৭ই আগষ্ট, এমন জন্মদিন আসে নি এর আগে… এমনভাবে প্রিয় কেউ ছেড়ে যাবে নিজের জন্মদিনে!
গতকাল থেকে এই সমাপতনের কথাই মনে হচ্ছিল বারবার… আমায় কেউ শুধায় যদি প্রথম পড়া বই?
উত্তর হবে, ক্ষীরের পুতুল!
প্রথম পড়া উপন্যাস?
তখনও উত্তর বুড়ো আংলা!
তারপর শকুন্তলা, নালক… আর আর রাজকাহিনী।
ভারতকে জানার শুরুও তো ঐ রাজকাহিনী দিয়েই!!
কেমন ছবি লিখে মনে গেঁথে দিয়েছেন সবটুকু!!!
তারপর নিবেদিতা স্কুলের ছোটবাড়ির হল ঘরে একটা ছবি… এখনো মনে আছে একতলার ঐ ঘরটা দিয়ে যাওয়ার সময় কেমন চোখ আটকে যেতো ঐ চার হাতের গেরুয়া বসনার দিকে… নিরালঙ্কার কিন্তু পরিপূর্ণ!!!
একদিন কীভাবে যেন জেনে ফেললাম, উনিই আমাদের “ভারতমাতা”- কে এঁকেছেন এমন করে??কে যেন বলেছিল, অবন ঠাকুুর…পরে যত জেনেছি, বুঝেছি, দেখছি কীভাবে “শ্যামলাং সরলাং
সুস্মিতাং ভূষিতাম্
ধরণীং ভরণীম্
মাতরম্ “– একদম মূর্ত রূপে ধরা দিয়েছেন অবনীন্দ্রনাথের তুলিতে…
আজ একটা গল্প মনে পড়ছে, পরে কোথাও পড়েছিলাম… তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র নন্দলাল বসু উমার তপস্যা নামে একটি ছবি এঁকেছিলেন। ছবিটা দেখে অবনীন্দ্রনাথ তাঁর ছাত্রকে জিজ্ঞেস করে ছিলেন ‘‘এত রং কম কেন? আর কিছু না কর উমাকে একটু চন্দন, ফুলটুল দিয়ে সাজিয়ে দাও।’’ ছবি হাতে নন্দলাল ফিরে গেলেন। তবে সারা রাত অবন ঠাকুরের ঘুম হল না। মনে মনে ভাবলেন কেন তিনি নন্দলালকে এমনটা বললেন। সে হয়তো উমাকে সেই ভাবে দেখেনি। তপস্যায় রত উমা কেনই বা ফুল-চন্দনে সাজবে? পর দিন ভোর হতেই তিনি ছুটলেন ছাত্রের ঘরে। দেখলেন রং তুলি হাতে নন্দলাল ছবিটিকে বদলানোর কথা ভাবছেন। তাঁকে আচমকাই থামিয়ে বললেন, ‘‘তোমার উমা ঠিকই আছে।…আর একটু হলেই ভাল ছবিখানা নষ্ট করে দিয়েছিলুম আর কী’’। শিক্ষক হিসেবে এমনটাই অবনীন্দ্রনা‌থ। নিজের ছাত্রের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করতে তাঁর এতটুকুও সংকোচ ছিল না।
আমার জেঠু আমায় একবার জন্মদিনে ঠাকুর বাড়ির শিল্পকলা বলে একটা বই দিয়েছিলেন, সেখানে একটা ছবি ছিল–শাহজাহানের মৃত্যু।পরে জেঠুর মুখেই গল্পটা শুনি..
এক সময় কলকাতা প্লেগে আতঙ্কে ভুগছিল। চারদিকে মহামারির আকার ধারণ করেছিল। সেই সময় অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও বাড়ির সকলে চাঁদা তুলে প্লেগ হাসপাতাল খুলেছিলেন। সে সময় রবীন্দ্রনাথ ও সিস্টার নিবেদিতা বিভিন্ন পাড়ায় ইনস্পেকশনে যেতেন। কিন্তু সেই প্লেগ ঢুকল অবন ঠাকুরের নিজের ঘরে। ছিনিয়ে নিয়েছিল তাঁর ছোট্ট মেয়েটিকে। সেই শোক ভুলতে কিছু সময়ের জন্য জোড়াসাঁকো ছেড়ে তাঁরা চৌরঙ্গীর একটা বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন। সেখানে বেশ কিছু পাখি পুষেছিলেন। সেই সময়ে এঁকে ছিলেন ‘শাহজাহানের মৃত্যু’ সেই বিখ্যাত ছবিটি। অবনীন্দ্রনাথের কথায়, ‘মেয়ের মৃত্যুর যত বেদনা বুকে ছিল সব ঢেলে দিয়ে সেই ছবি আঁকলুম।
এমন ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ…
গতকাল ছিল রবিময়, তাই আজ দু- চার কথায় মনে করে নিলাম আরেক ঠাকুরকে…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।