সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে সম্বুদ্ধ সান্যাল (পর্ব – ১৩)

অ্যালিয়েন এবং সপ্তেন্দ্রিয়

বছরখানেক আগের কথা। রাঁচির দিকে ঘুরতে গিয়েছি এক কবিসভায়। নন্দিতার কবল থেকে কয়েকদিন বিরাম পেতে কবিসভার পরেও পাঁচ-ছয়দিন থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা যে তোফা অক্সিজেনে দিনকয়েক একটু হাওয়াবদল করে ফেরৎ যাব। সারাদিন মোটের উপর কোনও কাজ নেই বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া। মধ্যে একদিন একা একা চলেও গেলাম হুড্রু ফলস দেখতে। আমরা কবিরা কখনও পাকা রাস্তা ধরে চলাফেরা করি না। তিন কিলোমিটার রাস্তায় দশ কিলোমিটার ঘুরতে হলেও আমাদের কাঁচা রাস্তা, মাঠঘাট, কোকিল, শালিক, কাদাপাঁক, শাপলা পুকুর— এসব না দেখলে কবিত্ব গজায় না। তা সেই খেয়ালেই কিছুটা বনবাদাড় ভেঙে হুড্রু ফলস দেখে ফেরৎ আসছে, অমনি পেছনে দুম করে আওয়াজ আর এলাকা যেন খানিক কেঁপে উঠল।
কী হয়েছে ঠাওর করতে খানিক দূর এগিয়ে দেখি যে মাঠের উপর দিয়ে এসেছিলাম, তার মধ্যেখানে একটা বেশ বড় গর্ত আর চারদিকে ধুলোধোঁয়া। কাছে গিয়ে দেখতে মনে হল যে উপর থেকে কিছু একটা এসে পড়েছে। এমন ঘটনায় কোনও কবিতা খুঁজে না পেয়ে মনের দুঃখে ফেরৎ আসছি। কারণ এসব মহাজাগতিক জিনিসপত্র নিয়ে কবিতা মার্কেটে খায় না, তাই আমাদের মনে আসতে নেই। বাকিটা কোনও বৈজ্ঞানিক বুঝে নেবে, আমার কী?
তা ফেরার পথে বন ভেঙে আসতে পথে দেখি একটা হলুদ রঙের কী যেন বেশ তুলতুল করছে। প্রথমে অবাকই হলাম, কোনও জন্তুজানোয়ার নয়ত? এসব জঙ্গলে জানোয়ার-টানোয়ার আছে শুনেছি। জন্তু জানোয়ারদের নিয়ে ছোটদের কবিতা আমরা লিখি না বলে এড়িয়ে চলে আসব, ও মা! এ তো দেখি নড়াচড়াও করে। বেশ কৌতূহল হল। মনে একটু ভয় নিয়ে পা টিপে টিপে যতটা সম্ভব কাছে গেলাম জন্তুটা কী ভালো করে দেখতে। খানিক এগোতেই বুঝলাম এ জন্তু আমি ইহজন্মে দেখিনি। বাঘ না ব্যাং ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আবার সামনেও যেতে পারছি না যদি কামড়ে দেয়।
তা বিধাতা বোধহয় খানিক প্রসন্নই হলেন। একটু লক্ষ করতে হঠাৎ জিনিসটা কেমনভাবে যেন নড়েচড়ে আমার দিকে ঘুরে গেল। এবার সামনের থেকে দেখতে পেলাম। অবশ্য তার আগেই আমি একটা গাছের গুঁড়ির পিছনে লুকিয়েছিলাম, উঁকি মেরে দেখে মনটা ভারি বিষণ্ণ লাগল যেন। সেই ছোট্টবেলায় প্রাইমারি স্কুলে পড়তে রঙিন রঙিন রবার পাওয়া যেত, তেমনি একটা রবার যেন বেশ খানিক বড় হয়ে গেছে। তাইতে আবার দুইখানি বড় বড় চোখ। মাথায় আবার একখানা রিবনের মতো কী যেন বাঁধাও আছে। চোখদুটোয় বেশ মনখারাপ দেখে আমার কবিমন আকুল হয়ে উঠল। একখানি লম্বা লাঠি জোগাড় করে গাছের আড়াল থেকে খোঁচাও দিলাম একটু। কিচ্ছু বলল না, একটুও চ্যাঁচালো না দেখে মনে বেশ বল এল। আরও খানিক পর তার সামনেই চলে গেলাম।
আগেই বলেছিলাম যে সেই ছোটবেলার রঙিন রবারের মতো দেখতে, এবার ভালো করেই দেখলাম চেয়ে। নাঃ, কোনও ভুল নেই। সেই ডিডি মেট্রোতে দেখা কার্টুন চরিত্রগুলোকে নিয়ে যেমন রবারগুলো তৈরি হত, ঠিক তেমনি। হঠাৎ আমার চারপাশে ডিডি মেট্রো থেকে বেরিয়ে এসে ছুটি ছুটিগুলো জ্যান্ত হয়ে উঠেছে, নয়ত যেন আমিই টিভির মধ্যে ঢুকে গিয়েছি। কিন্তু এটা কোন প্রাণী মনে করতে পারলাম না। করার প্রয়োজনও নেই, সেই ছোটবেলার কার্টুনে কী আমরা সব প্রাণী চিনতাম?
হঠাৎ আমার মাথায় এল এটা ওই উপর থেকে খসে পড়া বস্তুটার সঙ্গে এসে পড়েনি তো? সেই কোই মিল গয়া সিনেমাটায় দেখেছিলাম যাদুকে। আমিও কী সেরকম ভীনগ্রহীর সাক্ষী হলাম তবে? কথাটা মনে হতেই তার সামনে এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখতে থাকলাম। আগে বুঝিনি, এর আবার ছোট্ট ছোট্ট চারটে হাত-পাও আছে। বসে আছে যেন ঠিক টেডি বিয়ারের মতো। মাঝে মাঝে নড়ছে ঠিকই, কিন্তু তাতেও কেমন যেন একটা আলিস্যি ভাব। বেশ গোলগাল, রাবারের মতো সুন্দর প্রাণী। নিজের উপর বেশ গর্ব হল যে যাক, এই জন্মে একখানা কাণ্ড হল তবে। এবার জাতীয় পুরস্কার-টুরস্কার যদি জোটে, চাই কী একখানা নোবেলও মিলতে পারে। শুধু একে গোপনে নিয়ে গিয়ে বিজ্ঞানমঞ্চে দিয়ে আসলেই কেল্লা ফতে।
যেই না এমন ভাবা, অমনি কোত্থেকে যেন সেই ছোটবেলার রবারের মিষ্টি গন্ধ যেন আমার চারপাশ ঘিরে ধরল। খুব মনখারাপ লাগল ফেলে আসা দিনগুলোর জন্য। চারপাশের আলো যেন কেমন সেপিয়া হলদে হয়ে গেল, গাছপালাগুলোর সবুজ রঙ বদলে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট— কী আশ্চর্য। কোই মিল গ্যয়ার ঋত্বিক রোশন যেন আধো আধো স্বরে বলে উঠল, “এমন সুন্দর প্রাণীটাকে তুই ওদের হাতে দিয়ে দিবি? ওরা যে একে কেটেকুটে পরীক্ষানিরীক্ষা করে ফেলবে।”
তা ঠিক, চারপাশের মলিন পরিবেশের জন্যই হয়ত আমার গলার কাছে যত রাজ্যের কবিতাগুলো খামচাখামচি করছিল আর মুখ-হা-পা সব জায়গা দিয়ে বেরোতে চাইছিল। হঠাৎ লক্ষও করলাম এসব ভাবতে ভাবতে পায়ের আঙুল দিয়ে মাটিতে কী যেন একটা লাইনও লিখে ফেলেছি। ব্যস, অমনি আমাকে পায় কে। এতদিন কবিতা আকাশে বাতাসে খুঁজে বেড়াতাম, আর এ যে সাক্ষাৎ কবিতা আসার মেশিন। একে দেখলেই বুকের মধ্যে কেবল কবিতা আর কবিতা আসছে। এমন জিনিস কেউ হাতছাড়া করে?
এবার নিশ্চয়ই বড় পত্রিকায় কবিতা লিখব ভেবে প্রাণীটাকে ব্যাগে ঢুকিয়ে পরের দিনই বাড়ি ফিরে এলাম। নন্দিতার অবশ্য কিছুই চোখ এড়ায় না, ব্যাগ আর আমার পকেট সার্চ করে তারপরেই বাড়িতে ঢোকায়। সুতরাং প্রাণীটা গিয়ে পড়ল তার হাতে। তার চোখ তো চড়কগাছ অমনি, বলল, “এ কী বয়ে এনেছ? বাড়িতে তোমাকে পুষি, এই কত। আবার তুমিও যদি পোষার জিনিস মেলার থেকে কিনে আনতে থাকো, তবে তো ভারি মুশকিল। থাকো তোমরা চিড়িয়াখানা বানিয়ে, আমি চললাম ও বাড়ি।”
তটস্থ হয়ে বললাম, “আরে পোষার জিনিস নয়। শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবে, এটা অ্যালিয়েন। ঝাড়খণ্ডের বনের ভিতর উপর থেকে এসে পড়েছে।”
শুনে নন্দিতা তো অবাক। বলল, “তা তোমার জাতভাই নিয়ে আমি কী করব?”
“কী বিপদ, আমার জাতভাই হতে যাবে কেন?”
“তুমি আবার পৃথিবীর প্রাণী নাকি? দেখে তো আমার একটুও মনে হয় না। তা এটাকে নিয়ে কী কাব্যি করবে এবার?”
“আরে সেই কথাই তো বলছি। তোমার হেব্বি সুবিধে। এই যে আমি সেই সকাল থেকে ভেবে ভেবে সন্ধ্যেবেলায় এক লাইন লিখি, আর তুমি বলো অকম্মার ঢেঁকি। সেই সমস্যার সমাধান। জানো না গো, এর দারুণ ক্ষমতা। ওকে একটু বকুনি দাও, দেখ তুমিও কবিতা লিখবে।”
“মুখপোড়া, আমি কবিতা লিখতে যাব কেন? তুমি শিগগির এসব হটাও আমার সামনে থেকে।”
“তাহলে ইসরোতে দিয়ে আসি বলো? দু’পয়সা আসবে সরকারের থেকে। তুমি বলছিলে ফ্ল্যাটের কথা। এই বেলা যদি একটা গভর্নমেন্ট ফ্ল্যাট জুটে যায় কপালে, জয়গুরু।”
“অমনি শুরু হয়ে গেল পয়সা পয়সা। বলি মানুষ হবে কবে বলো তো? এতটুকু একখানা প্রাণী, মা-বাবা ছাড়া এখানে এসে পড়েছে, একে নিয়ে না হয় ওসব চিন্তা নাই করলে।”
আমি বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। হঠাৎ করেই যেন নন্দিতাও প্রাণীটির প্রতি কেমন যেন সদয় হয়ে উঠেছে। এবার স্পষ্টই বুঝতে পারলাম যে প্রাণীটি এখনও পর্যন্ত একটুও কথা না বললেও কেমন যেন একটা বশ করার ক্ষমতা আছে তার মধ্যে। নন্দিতাও বোধহয় সেপিয়া দেখে ফেলেছে আমার মতো।
“আচ্ছা, এটা কী খায়?” নন্দিতার প্রশ্ন।
সত্যিই তো, কী খায় তাই জানা হয়নি। কী ভাষায় বোঝে তাও বোঝা হয়ে ওঠেনি। এমনকি প্রাণীটির নামও জানি না। নন্দিতাকে বললাম, “তা তো জানি না। কিছুই যে বলে না। যাই জিজ্ঞেস করি চুপ করে থাকে। তা ট্রেনে আসার সময় ব্যাগে কিছু ছোলাভাজা রেখেছিলাম ঠোঙায়। তাও তো এসে দেখলাম অক্ষত আছে। পৃথিবীর খাবার কী ওর মুখে রুচবে?”
“সেকি! এখনও তুমি একে কিছু খাওয়াওনি?” বলেই উঠে গিয়ে এক গ্লাস দুধ গরম করে এনে দিতে দেখি সেটা বেশ দু’হাতে ধরে চুক চুক করে খেয়ে নিল। অগত্যা নন্দিতার একটা নিঃশব্দ চোখরাঙানি আমাকে ছুঁয়ে গেল। সত্যিই, এসব ব্যাপার এমনিতেই ছেলে হিসেবেই খেয়াল থাকে না, তার উপর আবার কবি। নিজের প্রতি আক্ষেপ হল।
“খালি তো পায়ের উপর পা তুলে কলম নাচাতেই শিখলে। জিনিস দেখে বুঝতে হয়, বুঝলে? তা এতদিন যে সঙ্গে রেখেছিলে, কথাটথা বলেছে কিছু?” নন্দিতা বলল।
আমি উত্তর দিলাম, “নাঃ, কোনও কথা নেই। খালি এমনি করেই বসে থাকে আর নইলে থেকে থেকেই ধপাস করে শুয়ে পড়ে। কত কিছু জিজ্ঞাসা করলাম। ভাষা না বুঝুক, হাত পা নেড়েও তো বোঝাতে পারে। কিচ্ছুটি নেই!”
এই শুনে নন্দিতা তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কী গো, তুমি কোত্থেকে এসেছো?”
কোনও উত্তর নেই তবু। আরও কয়েকবার কতকিছু জিজ্ঞাসা করল সে, তবুও কোনও উত্তর নেই। অনেকক্ষণ চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিয়ে যখন উঠে আসছে, হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলতে শুরু করল, “সে কী গো! এ আমি কোথায় উড়ে যাচ্ছি?”
শুনেই আমি সচকিতভাবে দেখি তেমন কিছু নয়। উত্তর দিলাম, “কোথায়, তুমি তো ঘরের মাটিতেই দাঁড়িয়ে।”
“না গো। আমি তো উড়ছি। এই দেখ। ট্রপোস্ফিয়ার ছাড়িয়ে স্ট্রাটোস্ফিয়ার হয়ে সবে মেসোস্ফিয়ারে ঢুকলাম।”
আমি বললাম, “মাথাটা গেল নাকি? তুমি ঘরেই আছ আমার সামনে।”
“দাঁড়াও, আমি পৃথিবীতে ফেরৎ যাই, তারপর তোমাকে আবার রাঁচি পাঠাব। এবার আর কাব্যি করার জন্য নয়, ডব্লুদার কাছে দেখাতে। বলছি উপরে উঠেই যাচ্ছি দেখতে পাচ্ছি স্পষ্ট, আর তুমি কোন মুখে বলো ঘরের ভিতর। সাবধানে এস তুমিও। এখান থেকে পড়লে কিন্তু হাত-পা আস্ত থাকবে না।”
অমনি বুঝলাম আসলে কী ঘটছে। সেই আমার সেপিয়া দৃশ্য দেখার মতো ব্যাপার। দেখা যাক নন্দিতা কী দেখে আসে। তার উৎসাহ বজায় রাখতে বললাম, “না গো। মাটি অবধি পৌঁছব না। তার আগেই ফুস করে জ্বলে যাব। সে যাক গে। আমি তোমার পেছনেই আছি। তুমি উড়তে থাকো আর দেখো কোথায় পৌঁছাও। শুধু ব্রেক করলে আগে থেকে জানিও। তোমার আর ব্যাকলাইট নেই, ধড়াম করে ধাক্কা লাগতে পারে।”
নন্দিতা উড়তে উড়তে যা রিলে করল, তা এই রকম। সে যে মহাকাশের কোথায় কোনদিক দিয়ে উড়ে চলেছিল, অনেকক্ষণ বুঝতে না পারলেও মাঝে মাঝেই লুব্ধক, ক্যাসিওপিয়া, অ্যান্ড্রোমেডা, ধ্রুবতারার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তা বুঝতে পারছিলাম। একসময় বোধয় আমাদের গ্যালাক্সি ছাড়িয়েও চলে গেল। প্রায় মিনিট পনেরো বাদে বলে উঠল, “আরে দেখ দেখ। ঠিক আমাদের মতো সবুজ দেশ। আর এ কী? এ যে এখানে সবাই এরম হলুদ হলুদ রবারের মতো লোকজন। গাছপালাও রবারের তৈরি। আচ্ছা, এবার বুঝেছি, আমি ওদের গ্রহে চলে এসেছি। তুমি পিছনে আছ তো?”
আমি বললাম, “তুমি নিশ্চিন্তে যাও, আমি ঠিক তোমার পেছনেই আছি। সব ঘুরেফিরে দেখে এসো। আমি আবার পৃথিবীতে নিয়ে যাব একটু পড়ে।”
নন্দিতার এই ভ্রমণকাহিনি দেখে আমরা নিশ্চিত হলাম প্রাণীটি আমাদের গ্যালাক্সির বাইরের কোনও গ্রহের। কিন্তু গ্রহটার নাম কোনও সাইনবোর্ডে দেখতে পেলাম না। অবশ্য পৃথিবীতেও এই একই সমস্যা। কোনও দোকানের সাইনবোর্ডে বা কোনও ঠিকানায় পৃথিবীর নাম উল্লেখ থাকে না। আমার মাঝে মাঝে ভারী চিন্তা হয় যে যদি কোনও অ্যালিয়েন পথ ভুল করে এখানে এসে পরে, তো এটা যে পৃথিবী গ্রহ তা চিনবে কী করে?
যাই হোক। কিন্তু প্রাণীটির ধরণধারণ সম্পর্কে আমরা ক’দিন অনেক চেষ্টাতেও বুঝতে না পারায় একদিন স্মরণাপন্ন হলাম পাড়াতুতো দাদাস্থানীয় বন্ধু অতুলদার কাছে। অতুলদার অনেক জ্ঞান। সে বাড়িতে এসে সবকিছু দেখেশুনে বলল, “ভায়া, এ তুমি করেছ কী? এ তো পুরো চারপাশে সিনেমা দেখে ফেললাম যেন। বুঝলে না, এ আসলে মুখে কিছু বলে না। ওর কথাগুলো এরকম সিনেমা দেখিয়ে সবাইকে বুঝিয়ে দেয়।”
আমি বললাম, “সবই তো বুঝলাম অতুলদা। কিন্তু এ যে কী খায় এখনও যে বুঝলাম না। আলুসেদ্ধ থেকে শুরু করে বিরিয়ানি-পোলাও এমনকি সেদিন কলকাতা থেকে পিজ্জাও কিনে এনে দিয়েছি। তবুও যে কিছুই মুখে তোলে না। এমনি করে মরে যাবে যে, তখন কী হবে?”
অতুলদা বলল, “ঠিক মোক্ষম প্রশ্ন করেছ। হুঁ হুঁ বাওয়া, আমি হলাম অতুল ঘোষ। সব আগের থেকে দেখে নিয়েছি। আমি কেমন খাদ্যরসিক তুমি তো জানোই। ওর গ্রহে গিয়ে খাবারদাবারের খোঁজ করছিলাম। দেখলাম আমাদের থেকে কিছুই আলাদা নয়। শুধু তোমায় বুঝে নিতে হবে।”
আমি বললাম, “মানে?”
“এই যে তুমি আলুসেদ্ধ বলছ। ওরম বললে চলবে না। বলতে হবে পোটাটা বয়েলিফায়েড। আমি নিজে দেখে আসলাম ওসব জিনিস। বাংলায় পাক্কা আলুসেদ্ধ। দিয়ে দেখ, এবার খাবেই।”
পরীক্ষা করতে একটা কাগজে পোটাটা বয়েলিফায়েড লিখে একটা কাঠিতে চিপকে আলুর মধ্যে পুঁতে দিতেই দেখি, ও মা, সে খাচ্ছে। খুব প্রসন্ন হলাম অতুলদার উপর। একটা মহাসমস্যা মিটল। এরপর বাড়িতে কিছুটা শুক্তুনি ছিল, সেখানে ‘ভেজিটেবলাটাইট-লা-মিক্সিফিজম’ লিখে দিতে দেখি শুক্তুনিটাও খাচ্ছে। যাক, এ এক নতুন আবিষ্কার।
প্রাণীটাকে খেতে দিয়ে ফিরে আসতেই অতুলদা বলল, “বুঝলে ভায়া। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেছে।”
আমি বললাম, “কী রকম?”
সে বলল, “এবার বরং আমিতুমি মিলে একটা সিনেমা হল খুলে ফেলি। ভেবে দেখো, এরম স্ক্রীণ কিন্তু কোত্থাও নেই। বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করলে অনেক প্রফিট। লোকজন একেবারে চারপাশে তাকিয়ে সিনেমা দেখে ফেলবে। ঘুরে ঘুরে সিনেমা দেখবে, শুয়ে দেখবে, বসে দেখবে, ডিগবাজি খেতে খেতেও দেখবে। কেমন প্রস্তাব বলো?”
আমি আমতা আমতা করে বললাম, “আজ্ঞে, আমি কবি মানুষ। অত কী বুঝি? দেখ যা ভালো বোঝো। তবে দাদা, একটা রিকোয়েস্ট। এর কথা যেন না ছড়ায়।”
“আরে না, না। তুমি একদম চিন্তা কোরো না। তুমি আবার কারোকে বলে বসো না, মুখে কুলুপ এঁটে থাকবে। আমার অবশ্য একজনকে জানাতে হবেই, দেখি সে কী বলে ভালোমন্দ।”
“তা দাদা, সে আরও ভালো বুদ্ধি দিলে ভালো হয়। প্রচার হলে কিন্তু এমন জিনিস সরকারে কেড়ে নিয়ে চলে যাবে।”
“তুমি মোটে চিন্তা কোরো না। সে ফেল হলে আরেজনও আছে। সে না পারলেও চিন্তা নেই, ফণীদা আছে। ফণীদাও ফেল করলে অর্ঘ্যবাবু। তিনিও যদি না পারেন…”
আমি তটস্থ হয়ে বললাম, “থাক থাক দাদা। আমি এর থেকে আর বেশি কিছু জানতেই চাই না। কী খায় জেনে গেছি ব্যস।”
“ধুর, তুমি না জানতে চাও, এমন জিনিসকে তো আমি জানতে চাই। আমি এর নাড়ি নক্ষত্র গোপনে বের করেই ছাড়ব। তুমি শুধু কারোকে বলবে না। বুঝলে তো?”
ভেবে দেখলাম অতুলদা যে পরিমাণ উৎসাহী হয়ে উঠেছে, তাকে বাড়ির বাইরে ছাড়া আমাদের বিশেষ উচিৎ হবে না। সে নির্ঘাৎ এলাকায় চাউড় করে বেরাবেই আর আমার কবিতা লেখার দফারফা। তাই সেদিন থেকে আমি আর নন্দিতা মিলে অতুলদাকে বেঁধে মুখে সেলোটেপ আটকে নিচের তলায় আটকে রেখেছি।
ঘন্টাখানেকও যায়নি, সুবোধদা এসে হাজির। দরজার বাইরের থেকেই পত্রপাঠ বিদায় করে দিচ্ছিলাম, প্রাণীটিকে দেখতে পেলে আর রক্ষে নেই। সারা পশ্চিমবঙ্গ অবধি চাউড় হয়ে যাবে, এমন বাতেলবাজ। তাকে দেখে খানিক অবাক হওয়ায় সে বলল, “ভাই, তুমি নাকি ঝাড়খণ্ড থেকে কী একটা ধরে এনেছ? তা ব্যাপারটা তো দেখতেই হচ্ছে।”
আমি বললাম, “তা তুমি খবর পেলে কী করে?”
সুবোধদা বলল, “আরে, সে ঘন্টাখানেক আগেই অতুলের মেসেজ পেলাম তোমার বাড়িতে কী নিয়ে এসেছ লিখে। আমি তো তার বাড়ি গিয়ে দেখি সে নেই। তোমার এখানে আছে ভেবে চলে এলাম।”
“সে তো এখানেও নেই। দাদা, একটু ব্যস্ত আছি, পরে আসা যায়?”
“কবিদের আবার ব্যস্ততা কী গো চেয়ারে বসে কলম দোলানো ছাড়া। সে না হয় পরেই করলে। এখন দেখি তো জিনিসটা কী যার জন্য অতুল ডেকে পাঠাল।” বলেই অদ্ভুত কায়দায় নিজেকে বেঁকিয়ে চুড়িয়ে আমার বগলের নিচ দিয়ে ঘরের ভিতর গলে গেল।
আমি অবশ্য নানাভাবে তাকে আটকানোর চেষ্টা করতেও পারলাম না। বসার ঘরের চেয়ারের উপর তাকে দেখে অবাক। বলে, “এ কী জিনিস গো ভাই। এমন প্রাণী তো কোথাও দেখিনি। ফুটবলের মতো দেখতে, ছোট্ট ছোট্ট গোল গোল হাত-পা, একটা ছোট লেজও আছে দেখছি গো। এ জিনিস কোত্থেকে পেলে? কথাটথা বলে?”
কী আর করি, অগত্যা তাকেও বলতে হল সমস্ত। সংক্ষেপে সব বলে উপায়ান্তর না দেখে নিজের একখানি দাবি রাখলাম, “বলি দাদা, সবই তো বুঝলে। কিন্তু এ যে নড়েও না, চড়েও না, কথাও বলে না, কিছুই করে না, শুধু সিনেমা দেখায়। তা বলো দেখি, সারাদিন এক জায়গায় বসে থাকা কী ভালো। একটু ঘুরতে টুরতে না গেলে হয়? তুমি কী বলো?”
সুবোধদা বলল, “কথা বলে না মানে? শেখাতে হবে। সিনেমায় দেখনি অ্যালিয়েনরা কেমন চট করে সব ধরে ফেলে। এক্ষুণি দেখ আমি কেমন বাংলা শিখিয়ে দিই। কথার ফুলঝুরি ছুটবে এবার। দেখোনি পাড়ায়, জন্ম থেকেই বাচ্চারা কেমন মিউট হয়ে জন্মায় আর বুলি ফোটাতে ছুটতে হয় আমায়। আমি হলাম গিয়ে বকাটে বংশের শেষ অধীশ্বর, কথা না শিখে যায় কোথায়?” বলেই এগিয়ে গেল তার দিকে।
এর পরে কী ঘটে তা দেখতে আমরা প্রস্তুত ছিলাম। সুবোধদা সামনে এগোতে হঠাৎ যেন থেমে গিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। ঘরের মধ্যে একবার এদিক যায় ত একবার ওদিক। খাটের নিচে ঢোকে, আলমারীর উপর উঠে চারিদিক তাণ্ডব করে বেরাতে লাগল। একবার হো হো করে হেসে ওঠে, আবার পরক্ষণেই ভেউ ভেউ করে কান্না। এই মাত্র গড়াগড়ি যাচ্ছে তো ওই পদ্মাসনে বসে ধ্যান করছে। সে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। প্রায় আধ ঘন্টা এসব চলার পর যেন সম্বিত ফিরল তার। আমরা তো ততক্ষণে ভয়ে তটস্থ।
সম্বিতে এসেই সুবোধদা বলল, “ওরেবাবা, এ কী জিনিস দেখলাম গো। চারিদিকে কত কথা শোনাচ্ছে আমাকে লোকজন ঘিরে ধরে। উপর থেকে কথা, নিচ থেকে কথা, চারপাশ থেকে কথা, পেটের ভিতর থেকে কথা, কথা আর কথা। কারতা শুনি এতক্ষণ ধরে বুঝতেই পারলাম না। আমার কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে।”
নন্দিতা শুনে বলে উঠল, “তাহলে তো ঝামেলা হল বড়! আপনার মতো পাড়ার বকাটেসম্রাটেরই যদি এমন মাথা ঘুরে যায় তাকে কথা বলাতে গিয়ে, তবে তো আমরা কোন ছাড়?”
সুবোধদা যেন এই কথায় বেশ গম্ভীর হয়ে গেল তার স্বভাবের অবমাননা ভেবে। তারপর বলল, “নাঃ, এ অপবাদ আমি আর নিতে পারলাম না। অবশ্য আসার আগেই আমি পথে বল্টুদাকে বলে এসেছি, তেমন হলে আরেকবার ডেকে আনি। আমার থেকে ভালো সে বুঝতে পারবে।
যেমনি বলাও সারা, অমনি ভবিষ্যতে আরও দুর্ঘটনার আঁচ পেয়ে সুবোধদাকেও ধরেবেঁধে অতুলদার কাছে ফেলে রাখলাম আমরা দু’জন। নইলে সারা পাড়া এসে ভিড় করবে এবার।
বল্টুবাবুর অপেক্ষাতেই ছিলাম। খানিক পরেই দেখি তিনি লাঠি ঠুকতে ঠুকতে হাজির। এই বলতুবাবু তার যৌবনে ছিলেন মস্ত শিল্পী। নন্দন, কলেজ স্ট্রিট, অ্যাকাডেমী সব একেবারে গুলে খাওয়া। আমাদের অগ্রজ সত্তর দশকের শিল্পী। তাকে বাইরের থেকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া সমীচিন মনে হল না। ভিতরে আসতে অনুরোধ করলাম তার দৃষ্টিভঙ্গীর বিচারে। অবশ্য যাওয়ার আগে নন্দিতাকে বলে রুমালে ক্লোরোফর্মের ব্যবস্থাও করে রেখেছিলাম।
বল্টুবাবু প্রাণীটাকে দেখে বললেন, “বুঝলে সতু। জিনিসটাকে কাল্টিভেট করতে হবে। তা পড়াশোনা জানে কিনা বুঝেছ?”
আমি বললাম, “না কাকা, আপনি থাকতে আমি আর সে সাহস করিনি। এখন আপনার হাতেই ছেড়ে দিলাম সবকিছু বোঝার ভার। দেখুন দেখি আপনার কাছে কিছু প্রকাশ করে কিনা।”
বল্টুবাবু প্রাণীটাকে নানাভাবে উল্টেপাল্টে পরীক্ষা করে বললেন, “ঠিক যেন আমাদের ইরেজার ছেঁদে গড়া গো। গায়েও কেমন রাবার রাবার গন্ধ। তা আমার মনে হয় যদি পেটে শিক্ষাদীক্ষা থাকত, তবে কী নতুন গ্রহে এসে জানার আগ্রহ থাকত না তার? আমার মনে হয় এটা ওই গ্রহের লাইকা ধরণের কিছু। মহাকাশে ছেড়ে দিয়েছে গবেষণার জন্য। কোনও লাভ হবে না বোধ হয়…।”
বল্টুবাবু বলে চলা বক্তব্য শুনতে শুনতে আরও হতাশ হচ্ছি, অমনি শুনি উনি চীৎকার করছেন, “এ কী, এ কী, আমি এ কোথায় চলে এলাম। সতু তুমি কী আছ আমার কাছে, শুনতে পাচ্ছ আমাকে?”
আমিও মজা দেখার জন্য বললাম, “হ্যাঁ বল্টুকাকা, আমি আপনার ঠিক পেছনেই আছি।”
“দেখেছ? দেখেছ? চারিদিক কেমন রঙে ভরে উঠেছে। এই নদীর জলটাকে দেখ, মনে হচ্ছে যেন অয়েল প্যাস্টেল থেকে কেউ নীল রঙ গড়িয়ে দিয়েছে। আকাশের সূর্যটাকে দেখ, মনে হচ্ছে যেন ব্রাশস্ট্রোক দিয়ে আঁকা। গাছগুলো যেন নানা রঙের প্যাস্টেল দাঁড়িয়ে আছে মাথায় পাতার কোলাজের কাজ নিয়ে। বাড়ি-ঘর-দোর সব যেন ফেব্রিক দিয়ে তৈরি। এ কোথায় এসে পড়লাম আমি? সারাজীবন তো এই জগৎটাকেই তুলি হাতে ক্যানভাসে খুঁজে বেড়িয়েছি। চারপাশে সেইসবই যা যা আমি মনে মনে দেখতে চাই। সবই যেন আমার ক্যানভাসে আঁকা। সতু, আমার খুব আনন্দ লাগছে। এই ঘটনা নিয়ে আমি অ্যাকাডেমীতে একটা স্পীচ রাখবই।”
আমিও অমনি নন্দিতার থেকে ক্লোরোফর্মে ভেজানো রুমালটা নিয়ে বল্টুবাবুর দিকে এগিয়ে খানিকক্ষণের মধ্যেই তাকে অতুল ও সুবোধদার পাশে চালান করে দিয়ে এলাম।
ভদ্রলোকের ওজনও খারাপ না। সবেমাত্র চেয়ারে বসে একটু জিরোচ্ছি, হঠাৎ পাশের থেকে একতা গোঁ গোঁ আওয়াজ। চমকে উঠে পাশে তাকিয়ে দেখি আমার বন্ধু গেঁতো এসে উপস্থিত। ওর ভালো নাম জটিলেশ্বর আর স্টেজ নাম কুমার বাপ্পী। স্টেজ নামের অর্থ সে খানিক গানবাজনার সঙ্গে জড়িত, এদিক ওদিক জলসায় গাইতে যায়। একেবারে মনে ছিল না দরজা আটকানোর কথা। খোলা পেয়ে এসে প্রাণীটাকে দেখে মুখ দিয়ে নানান সুরে গোঁ গোঁ করে চলেছে।
আমিই শুরু করলাম, “কী রে? কোত্থেকে এলি?”
“আরে শালা, বলিসনি তো এটা কিনেছিস?”
“না না, কিনিনি। পেয়েছি। সে এক কাহিনি।” বলে ঝাড়খণ্ডের কাহিনি শোনালাম।
সব শুনে সে বলল, “তা দারুণ জিনিস পেয়েছিস তুই। আর ওদিকে পারা তিনজন নিরুদ্দেশ খবর পেয়েছিস? সবাই নাকি তোর বাড়ির দিকে এসেছে?”
“আমার বাড়িতে? না না। কেউ নেই তো। দেখছিস কারোকে?”
গেঁতো এদিক ওদিক তাকাতেই আমি নন্দিতাকে হাঁক দিয়ে দুইকাপ চায়ের কথা বললাম। অর্থাৎ সিগন্যাল যা আগের থেকেই আলোচনা করা আছে। এর অর্থ আরেকখানা রুমাল নিয়ে এসো ক্লোরোফর্মে ভিজিয়ে।
চারিদিক দেখে গেঁতো বলল, “তা এ চিজের তো কোনও সারই নেই দেখছি। বললি কথাও বলে না, নড়েও না। তা এ রেখে কী করবি? গানটান গাইলেও কাজ দিত খানিক। এসে শুনে যেতাম। চেষ্টা করেছিস?”
“অ্যালিয়েন ধরে গান গাওয়ানোর চেষ্টা করাটা কি ভালো হবে? পুলিশটুলিস যদি এসে ধরে?”
“ধুর ব্যাটা, যার কোনও ভাষা নেই, তার সঙ্গীতের ভাষা আছে। আমাদের গুরু অরিজিনাল বাপ্পীদা আফ্রিকার থেকে এনে যে গানগুলো হিন্দিতে বানিয়েছিল, তুই কি ভাবিস যে তার অর্থ বুঝতে গুরু জুলু ভাষা শিখেছিল? কিন্তু তাই বলে কী সেই প্রত্যন্ত আফ্রিকার সুরকে কেউ আটকে রাখতে পেরেছে। সুরের কোনও ভাষা হয় না রে পাগলা হয় না। ভেবে দেখ, মহাকাশেও কিন্তু অ্যালিয়েন আছে কিনা জানার জন্য সেই সুরেরই ব্যবহার হয় নাসার থেকে, পড়িসনি?”
তা বটে। এটা তো মাথায় আসেনি। অ্যালিয়েনদের উদ্দেশ্যে সঙ্গীতই পাঠানো হয় বৈকি। আমি বললাম, “গেঁতো। ভাই আমার। তোর সুরের খেলা দেখানোর এটাই সেরা সময় রে। দেখিয়েই ফেল। এমনিতেই তুই বাপ্পী লাহিড়ি কণ্ঠী বলে বিখ্যাত। আমি নিশ্চিত যে ওই জুলুদের মতো অ্যালিয়েনও তোর বাপ্পীদার গানে রিয়্যাকশন দেখাবে। নেঃ বেটা, কেউ তোকে এমন করে সাধে না। গেয়েই ফেল একখান।”
গেঁতো এই কথা শুনে যে কী খুশি হল তা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। প্রতিভা ভরপুর থাকা সত্বেও এলাকার কোনওদিন কেউ তাকে গান গাইতে অনুরোধ করেনি বাপ্পী লাহিড়ি কণ্ঠী হওয়ার সুবাদে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে ছাপিয়ে অ্যালিয়েনকে গান শোনানোর সুযোগ পেয়ে তার চোখে জল এসে গেল। এরপর আমাকে জড়িয়ে ধরে, নন্দিতাকে প্রণাম করে প্রাণীটার সামনে গিয়ে বেল্টে আঙুল গুঁজে ডান পা নাচাতে নাচাতে গান ধরল, “তু প্রেমী আহা, ম্যায় প্রেমী আহা…”।
ভালোই চলছিল খানিকক্ষণ, প্রাণীটাও বেশ রিয়্যাকশন দেখাচ্ছিল এই হেন গান শুনে। এখন সেটা আনন্দ পাচ্ছে, নাকি অসহ্যবোধ করছে তা আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না। ওদিকে তখনও গেঁতো গান করেই চলেছে ঠ্যাং নাচিয়ে। নাচের গতিও খানিক বেড়েছে ইতিমধ্যে, বোঝাই যাচ্ছে খানিক আবেগের মধ্যে ঢুকে গেছে সে।
হঠাৎ করে দেখি, গানটান থামিয়ে এদিকে ওদিকে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না। বেশ খানিকক্ষণ এদিক ওদিক হামাগুড়ি দেওয়ার পর হঠাৎ কেঁদে ফেলে বলল, “গুরু, কতদিন যে আপনার চরণধূলি নেওয়ার শখ আমার। আপনার গান গেয়ে গেয়ে আমি চারণ গায়ক হয়ে গেলাম সব ছেড়ে। এ আমার সৌভাগ্য, আমার সৌভাগ্য আপনার চরণস্পর্শ পেয়ে। আমাকেও বলিউডে একটা হিল্লে করে দিন স্যার। ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে যে আর চলে না। গুরু হিসেবে মেনেছি আপনাকে, তাই গেয়ে যাই। এমন ভক্তের জন্য তার দেবতা হয়েও কি আপনি কিছু করবেন না স্যার?”
অমনি আমি আর নন্দিতা বুঝলাম যে নিশ্চয়ই প্রাণীটার প্রভাব তার উপরেও ভর করেছে। এরকম অনেকক্ষণ ধরে নানাভাবে হামাগুড়ি দেওয়ার পর যেন তার হুঁশ ফিরল।
আমরা ততক্ষণে কৌতূহলী। বাস্তবে ফিরে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যখন এদিক ওদিক তাকাচ্ছে তখন নন্দিতা প্রশ্ন করল, “ও গেঁতোদা। অমন হামাগুড়ি দিচ্ছিলে কেন?”
ব্যাস, অমনি গেঁতো আবার হাউ হাউ করে কেঁদে উঠে বলল, “এ আমি কী দেখলাম গো বৌদি! আমার বেঁচে থাকা আজ সার্থক। চারদিকে কিশোর, আশাজী, রফি, লতাজী, মজরুহ সুলতানপুরি, জাভেদ আখতার, গুলজার, শচীন দেববর্মন, আর.ডি., মান্না দে— কে নেই। আর, আর আমি তারও দেখা পেলাম। ঈশ্বর, ভগবান বাপ্পীদার। আমি ধন্য হয়ে গেছি আজ। আমার কেমন পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। বাপ্পীদা বলেছে আমাকে হিন্দি ফিল্মে গানের চান্স দেবে। এ আনন্দ আমি রাখি কোথায়?”
আমি অমনি বললাম, “আস্তে গেঁতো, আস্তে। বুঝতে পারছি রে তোর আবেগের কথা। চোখটা বন্ধ কর। আবার দেখবি তুই কোথায় চলে গেছিস। এবার নিশ্চয়ই তোর মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে দেখা হবে।” বলেই ক্লোরোফর্ম মেশানো রুমালটা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
অবশ্য একটা ব্যাপার ভালো হয়েছে। গেঁতোর কণ্ঠে বাপ্পী লাহিড়ির গান শোনার জন্যই কিনা কে জানে প্রাণীটা যেন নন্দিতাকে কিছু বলতে চাইছে এমনভাবে তাকালো। নন্দিতা এগিয়ে যেতেই আধো আধো স্বরে সে বলল, “তম্মা তম্মা লোগে।”
অমনি আমরা বুঝে গেলাম যে এই প্রাণী পৃথিবীর ভাষা শেখার জন্য আগ্রহী। নন্দিতাও বেশ আগ্রহ নিয়ে কোমর বেঁধে নেমে পড়ল পৃথিবীর ভাষা শেখাতে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রাণীটা বাংলা শেখায় খুব উৎসাহিত হয়েছে বাপ্পী লাহিড়ির সুরে ও ঊষা ঊত্থুপের কণ্ঠে ‘উরি উরিবাবা’ গানটা শোনার পর থেকে। আমার যতদূর মনে হয় সে খুব আশ্চর্য এমন গান শুনে, যার জন্য ভাষা নিয়েও আজকাল চর্চা শুরু করেছে যে ভাষায় এমন গান হতে পারে, সেটা কী ভাষা! মহাজগতের আশ্চর্যতম ভাষা ভাবলেও আমি অবাক হব না মোটে। নইলে একটা ভীনগ্রহীর বাংলা ভাষা নিয়ে এত আগ্রহের অন্য কোনও কারণ পাইনি।
এখন সে আধো আধো স্বরে বেশ বাংলা বলতে পারে। কদিন আগেই বাবুরাম সাপুড়ে আবৃত্তি করে শুনিয়েছে। নন্দিতা আর সে বন্ধু হয়ে গেছে। দু’জনে বেশ গল্প করে সারা দুপুর ধরে। বলাই বাহুল্য যে নন্দিতাই এখনও বকে যায়, আর তার কণ্ঠ খুব একটা পাওয়া যায় না।
তবে মুশকিল হয়েছে যে দুই দিনে সে মাত্র বারোশো শব্দ উচ্চারণ করে। এই নিয়ে আমার আর নন্দিতার মধ্যে গৃহ অশান্তি বেড়েছিল। এখন দু’জনেই প্রতিদিন নিজেদের জন্য ছয়শো করে শব্দ ভাগ করে নিয়েছি। মাঝে মাঝে একটু ঝামেলা হয় বৈকি। এই যেমন সেদিন হঠাৎ একটা কথা বলতে বলতে সেন্টেন্সের মাঝপথে থেমে গেল বারোশো শব্দ ফুরিয়ে গেছে বলে। এখন দুই দিন অপেক্ষা করে বসে থাকা বাকি অংশ শোনার জন্য। এ বাদে বড় শান্তশিষ্ট প্রাণী। তবে সে হাসেও না, কাঁদেও না, চলেও না, খেলেও না, খালি এক জায়গায় বসে বসে জাদু করে সবাইকে থ্রিডি জগতের সিনেমা দেখায়।
আমার কবিতা লেখা তর তর করে এগোচ্ছে অবশ্য। এখন তার কাছে খাতাপেন নিয়ে গেলেই সে বুঝে যায় আর কখনও ইছামতীর তীরে, কখনও বনলতা সেনের নাটোরে, কখনও হিমালয়ে নিয়ে চলে আর আমার কবিতা পায় খুব। গলার কাছে এসে খামচে ধরে ঠিক যেমনটি চাই।
প্রসঙ্গত যারা বাড়িতে আটকানো ছিল, তারা পরে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়েছিল। মুখ বেঁধে তাদের তিন দিন ধরে বোঝানো হয়েছিল যে টেঁপোফাইটিফোকাসের কথা বাইরে জানাজানি হলে কিন্তু আমাদের সিনেমা দেখার ব্যবস্থা চলে যাবে। বরং তারাও রাজি হয়েছে প্রাণীটিকে রক্ষা করার জন্য। পাঠকেরা কখনও আমাদের বাড়িতে এলে অবশ্য দেখতে পাবেন না তাকে। কারণ সে অনুমতি আমরা কারোকে দিই না।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।