তৃতীয় পর্বে দেবী হারিতির এবং দেবী শীতলার সাদৃশ্য নিয়ে আলোচনা করার পর, দেবী পর্ণশবরী সম্পর্কে দুচার কথা না বললেই নয়।
বজ্রযানে উল্লিখিত অন্যতমা এই দেবী পর্ণশবরীর ধ্যানীবুদ্ধ অমোঘসিদ্ধি। ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে দুইটি ত্রি-শির, ষড়ভূজা, পর্ণাচ্ছাদন-পরিহিতা পর্ণশবরী প্রতিমা দেখা যায়। ধ্যানে তাঁকে বলা হয়েছে তিনি ডাকিনী, পিশাচী এবং মারীসংহারিকা। (উৎস-হরপ্পা ব্লগ, রণদীপম বসু) নেপাল প্রদেশে ইনি পর্ণ শবরী তারাদেবী নামে খ্যাত। ইনি সৰ্ব্বদাই পত্রভূষণে ভূষিত থাকেন। পর্ণশবরীর ধারণী ( কবচ ) ধারণ করলে সকল বাধা ও বিঘ্ননাশ হয় । পর্ণশবরীর উপাসনকালে ‘ওঁ পিশাচপর্ণশবরি স্ত্রীং হঃ ক” ফটু পিশাচি স্বাহা এই মন্ত্র উচ্চারণ করিতে হয়। পর্ণশবরীসাধন সম্বন্ধে সাধনমালাতন্ত্রে বিস্তৃত বিবরণ লিখিত আছে ।
নীহাররঞ্জন্ন রায় রচিত বাঙালীর ইতিহাসের আদিখণ্ডেও দেবী পর্ণশবরীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি ব্যাঘ্রচর্ম ও বৃক্ষপত্র পরিহিতা, যুবতী, বজ্রকুণ্ডল পরিধান করেন এবং পদতলে তিনি অগণিত রোগ ও মারীকে নিষ্পেশিত করেন। দেবী পর্ণশবরীর অপর নাম সৰ্ব্বশবরনাম ভগবতী”, সকল শবরের ভগবতী বা দূৰ্গা। বজ্রযানী বৌদ্ধসাধনায় শবরদের একটা বিশেষ স্থান ছিল। একাধিক চর্যাগীতিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তিব্বতে দেবী পর্ণশবরীর যে রূপটি দেখতে পাওয়া যায়, তাতে তাঁর পরিধানে যে পাতার তৈরী বস্ত্রটি দেখা যায়, তাতে মাঝে মাঝে ফুল এবং ময়ূরের পালকের সজ্জা লক্ষ্য করা যায়। বজ্রযান অনুযায়ী, ময়ূরের একটি রূপকার্থ রয়েছে। ঋণাত্মক আবেগ থেকে জ্ঞানে উত্তরণের রূপক রূপে ময়ূরকে ব্যবহার করা হয়। দেবীর হাতে একটি ফাঁসদড়ি দেখা যায়, মনে করা হয় রোগবাহক দৈত্যদের তিনি ফাঁসদড়ি দ্বারা আকর্ষণ করবেন। তাঁর হস্তধৃত কুঠার দিয়ে তিনি ওই দৈত্যদের হৃদয়চ্ছেদ করেন, তাঁর অপর একটি প্রহরণ হলো বজ্র। বজ্র যে শুধু দেবীর বিধ্বংসী শক্তিকে নির্দেশ করে তাই নয়, অসুখবিসুখের মায়াবী, দিকভ্রান্তকারী চরিত্রকে বুঝতে দেবীর অসীম প্রজ্ঞাকে নির্দেশ করে।
আবার, বজ্রযোগিনী ও নয়নন্দাতে আবিষ্কৃত ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত যে দুটি পর্ণশবরীর ভাস্কর্য পাওয়া যায় সে দুটি দুটি আনুমানিক এগারো শতকের।
এই দেবীর স্ফীত উদর, তিনি প্রত্যয়ালীঢ় ভঙ্গিতে রুগ্নতার প্রতীক দুজন পুরুষকে পদদলিত করছেন। এই দেবীর তিনটি মাথা ও আট বাহু বিশিষ্ট। মূতির্র ছয় হাতে ঘড়ির কাটা অনুযায়ী রয়েছে যথাক্রমে অঙ্কুশ, তীর, বজ্র, পর্ণগুচ্ছ, ধনুক ও তর্জনী মুদ্রা। তিনি দুজন পার্শদদেবীসহ উপবিষ্টা। এই পার্শদদের মধ্যে একজন গাধার উপরে উপবিষ্ট। এই গর্দভারূঢ়া দেবীই যে দেবী শীতলা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এছাড়া বেদির নিচে গণেশ মূর্তি দেখা যাচ্ছে, যার এক হাতে তরবারি ও অন্য হাতে ঢাল। ভাস্কর্যটি বিঘ্ন বা বাঁধাকে প্রকাশ করছে। মূর্তিটির উপরে অমোঘসিদ্ধিসহ পঞ্চবোধিসত্ত্ব উৎকীর্ণ রয়েছে। (উৎস: বাংলাপিডিয়া)
ভারতের মহাযান বৌদ্ধধর্মই হোক বা তিব্বতের বজ্রযান বৌদ্ধধর্ম, পর্ণশবরীর অধিকাংশ মূর্তিতেই গদর্ভারূঢ়া দেবী শীতলার একটি ছোট্ট রূপ দেখা যায়। অবৈদিকরূপে পূজিতাদেবী শীতলা এবং নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের বসন্তরোগ সংক্রান্ত একাধিক লোকাচারই যে বৌদ্ধধর্মে আত্তীকরণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে না। তবে দেবী শীতলাকে যেমন শুধু বসন্তরায়ারূপেই পুজো করা হত, দেবী পর্ণশবরী সম্ভবতঃ যে কোনো সংক্রামক রোগ এবং মহামারির জন্যই পূজিতা হতেন।
সংক্রমণের প্রসঙ্গে এরপর যে দেবীর প্রসঙ্গে বলব তিনি অপেক্ষাকৃত অনালোচিত। পূর্ব মেদিনীপুরের নাচিন্দা মন্দিরে, পূর্ববঙ্গের খুলনায় এই দেবীর উপাসনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি দেবী রক্তাবতী। পূর্ব মেদিনীপুরের কোনো কোনো স্থানে দেবী শীতলা, জরাসুর এবং দেবী রক্তাবতীর আলাদা আলাদা প্রতিমা গড়ে একত্রে পূজা করা হয়। পূর্ব মেদিনীপুরের নাচিন্দা মন্দিরে দেবী কালি, চণ্ডী, শীতলা এবং রক্তাবতীর চারটি আলাদা বিগ্রহ একত্রে পূজিত হয়।
দেবী রক্তাবতী রক্তসংক্রমণের দেবী। রক্তসংক্রমণ জাতীয় অসুখকে পাশ্চাত্যে ব্যাকটিরিমিয়া, সেপটিসিমিয়া বা সেপসিস নামে ডাকা হয়। রোমান মাইথোলজিতেও ফ্রেবিস নামের এক দেবী সম্পর্কে জানা যায় যিনি সেপসিস বা পচনরোগ প্রতিরোধ করতেন। রোমানরাই সর্বপ্রথম সেপসিস এবং রক্তের সংক্রমণজনিত জ্বরের কারণ হিসাবে অদৃশ্য জীবের ধারণা দেন। ফ্রেবিস নামের এই দেবীর কাছে বলির প্রথা প্রচলিত ছিল। কোনো গবেষণাপত্রে বা বইতে অবশ্য দেবী ফ্রেবিসের প্রাচ্য অবতার দেবী রক্তাবতীর কাছে বলির উল্লেখ পাননি প্রবন্ধকার। কোনো উৎসাহী মানুষ এ ব্যাপারে তথ্যসূত্রের সন্ধান দিলে তিনি বাধিত থাকবেন।
আরেক ভয়াবহ সংক্রমণের দেবীরূপে পূজিত হন ওলাদেবী। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের ধারনা, সুন্দরবনের নোনা জলাভূমি থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘ওলাদেবী’ মিথ। মেডিক্যাল সায়েন্সে যাকে ‘কলেরা’ নামে ডাকা হয় । পাশ্চাত্যে ডাকা হত এশীয় কলেরা নামে । ‘ভিব্রিও কলেরী’ নামক জীবাণু ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহ জনিত সংক্রামক ব্যাধি ঘটালে সেই অসুখকে কলেরা বলা হত।
গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসুর মতে, ওলাদেবীর সম্পূর্ণ নাম ওলাউঠা দেবী। ওলা মানে দাস্ত হওয়া এবং উঠা মানে বমন হওয়া। এই রোগে ওলা এবং ওঠা দুটোই হয়ে থাকে, তাই এমন নাম।
পরেশচন্দ্র মন্ডলের ভাষায়, ‘ওলাদেবী অন্যতম লৌকিক দেবতা। ময়দানবের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত ওলাদেবী ওলাউঠা, বিসূচিকা বা কলেরা রোগের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি ওলাইচলী, ওলাবিবি, বিবিমা ইত্যাদি নামেও পরিচিত। অতীতে প্রায়শই ওলাউঠা [কলেরা] রোগ মহামারী আকারে দেখা দিত এবং এতে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটত। তাই এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পল্লীবাসীরা ওলাদেবীর পূজা করত। ওলাদেবী অসাম্প্রদায়িক দেবতা অর্থাৎ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এর পূজা করা হতো। তবে দেবীর মূর্তি ও পূজা পদ্ধতিতে কিছুটা পার্থক্য ঘটত। হিন্দু প্রধান অঞ্চলে এর আকৃতি হতো লক্ষ্মী-সরস্বতীর মতো, গায়ের রঙ গাঢ় হলুদ বর্ণ, হাত দুটি প্রসারিত, কখনও দন্ডায়মান, কখনও বা শিশুসন্তান ক্রোড়ে উপবিষ্টা, পরনে সাধারণত নীল শাড়ি এবং সর্বাঙ্গে নানা প্রকার অলংকার। এর কোনো বাহন নেই।
মুসলমান প্রধান অঞ্চলে ওলাদেবীর আকৃতি ও পোশাকের ভিন্নতা ছিল। সেখানে এর মূর্তি অভিজাত ঘরের কোন সুন্দরী কিশোরীর মতো, পরনে পিরান, পাজামা, টুপি, ওড়না এবং গায়ে নানা প্রকার অলংকার। এছাড়া পায়ে থাকে নাগরা জুতা এবং কখনও কখনও মোজাও। এর এক হাতে থাকে আসাদল, যা দিয়ে ভক্তের মুশকিল আসান করেন। ওলাদেবীর পূজা এককভাবেও হয় আবার ঝোলাবিবি, আজগৈবিবি, চাঁদবিবি, বাহড়বিবি, ঝেটুনেবিবি ও আসানবিবি এই ছয়জনের সঙ্গে একত্রেও হয়। এদের একত্রে বলা হয় সাতবিবি। কারও কারও মতে এরা ব্রাহ্মী, মহেশ্বরী, বৈষ্ণবী, বারাহী, ইন্দ্রাণী প্রভৃতি পৌরাণিক দেবীর লৌকিক রূপ। এদের একত্র পূজার প্রথা প্রাগৈতিহাসিক যুগেও প্রচলিত ছিল বলে মনে করা হয়, কারণ মহেঞ্জোদারো থেকে প্রাপ্ত একটি মৃণ্ময় ফলকে সাতটি নারীমূর্তি পাশাপাশি দন্ডায়মান দেখা যায়। সাতবিবির মধ্যে ওলাদেবীই প্রধান; ভক্তরা তার উদ্দেশেই পূজা দেয়, তবে অন্যরাও সে পূজার ভাগ পায়। ওলাদেবীর পূজা হয় পল্লীর বৃক্ষ তলে পর্ণকুটিরে। হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে শনি অথবা মঙ্গলবারে পূজা হয় এবং পূজায় নিরামিষ নৈবদ্য দেয়া হয়। পূজার পৌরহিত্য যে কোন বর্ণ বা সম্প্রদায়ের লোকের, এমনকি নারীরও অধিকার আছে। মুসলমান-প্রধান অঞ্চলে একে ওলাবিবি বা বিবিমা নামে হাজোত দেয়া হয়। হাড়ি বা ডোম-প্রধান অঞ্চলে তারাই পৌরহিত্য করে এবং সেখানে তাদেরই অগ্রাধিকার থাকে।
ওলাদেবীর পূজা তিন রকম। শনিবার ও মঙ্গলবার অনাড়ম্বরে যে পূজা হয় তা বারের পূজা নামে পরিচিতি। কারও মানত উপলক্ষে সামান্য আড়ম্বরের সঙ্গে যেকোনো সময় এর পূজা অনুষ্ঠিত হতে পারে। তাছাড়া কোথাও কলেরা রোগ মহামারী আকারে দেখা দিলে সে এলাকার লোকজন গ্রামের মোড়লের নেতৃত্বে সমষ্টিগতভাবে এর পূজা দেয়। ওলাদেবীর পূজায় কোনো সাম্পদায়িকতা নেই। হিন্দু-মুসলমান এক সঙ্গে একই পুরোহিতের হাতে পূজার নৈবদ্য ও হাজোত প্রদান করে। পুরোহিত নিম্নবর্ণের হিন্দু কিংবা মুসলমান হলেও কেউ তার নিকট থেকে নৈবদ্য গ্রহণে দ্বিধা করে না। ওলাদেবীর নৈবদ্য অতি সাধারণ সন্দেশ, বাতাসা ও পান-সুপারি; কোথাও কোথাও আতপ চাল ও পাটালিও দেয়া হয়। এ পূজায় বিশেষ কোন মন্ত্র নেই; তবে কোন কোন হিন্দু পুরোহিত পূজার সময় ‘‘এসো মা ওলাদেবী, বেহুল রাঢ়ির ঝি’’ এরূপ আবেদন করে থাকেন।”( সূত্র দৈনিক সংগ্রাম)
ব্রাত্যদেবীদের প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আরও কিছু অবৈদিক দেবীদের প্রসঙ্গ অনালোচিত রয়ে গেল, ভবিষ্যতে সুযোগ হলে অবশ্যই লেখার ইচ্ছে রইল।
Bibilography:
1)Rupkatha.org
2) বাংলার লৌকিক দেবতা: গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু
3) চব্বিশ পরগণার লৌকিক দেবদেবী- দেবব্রত নস্কর
4)Livemint.com
5) jstor.org
6)Religious practices in South India by B. Rama Rao and M.M Alam
7)Sitala: the small pox Goddess of India by B. Misra
8) Wadley: Sitala, the cool one.