গারো পাহাড়ের গদ্যে পৌলোমী রহমান নিশা

যান্ত্রিক জীবন

রোজ সকালে ভিড় ঠেলে বাসে ওঠা, ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে ঘোরাফেরা, বইয়ের পাতায় নিজেকে হারানো, গাড়ির হর্ন আর শহরের অসীম কোলাহলের সাথে আমার একাত্নতা। অন্যান্য দিনের মত আজও সেই নীল ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে হেঁটে চলছিলাম পথের ধাঁর ঘেঁষে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাত কেমন জানি আনমনা হয়ে গেলাম। ডানপাশে চোখ পড়তেই অবাক হয়ে দেখলাম কৃষ্ণচূড়া! থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়া ফুটে আছে পথের ধারে! চোখ ঝলসে যাবে মনে হল! এত লাল, এত রং, এত বিচিত্র সেই দৃশ্য! আকাশটার দিকে তাকালাম। কোন মেঘ নেই। ঝকঝকে রোদেলা একটা দিন। পথের ধাঁরে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকোন করতে বেশ ভালো লাগছিল।
বহুদিন হয়ে গেছে দেখিনি কোন সবুজ প্রান্তর, দেখিনি নদী, দেখিনি শস্য ক্ষেত ; শুধু দেখেছি সারি সারি দালান কোঠা। কতদিন হয়ে গেল শুনিনি পাখির কিচির মিচির; শুনেছি শুধু শহরের অস্থির কোলাহল, আর গাড়ির হর্ন।
রাস্তায় তখন বড় বড় যান গুলো দ্রুত বেগে ছুটে চলছে। আর ফুটপাতের ওপর চায়ের দোকান থেকে কিছু লোক আড় চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। চোখে তাদের অসীম বিস্ময়, যেন কোন সুস্থ ব্যক্তি পথের ধাঁরে দাঁড়িয়ে এভাবে কৃষ্ণচূড়া অবলোকোন করেনা।
আমি আর দেরই না করে পা বাড়ালাম সামনের দিকে। কিছু দূর হেঁটে আসতেই দেখি একটি ছোট মেয়ে, হাতে তার এক তোড়া কাশফুল। আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। এর আগে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের হাতে গোলাপ, বেলি, রজনীগন্ধা, আর কদম ফুল দেখেছি তবে কাশফুল তো কোন দিন দেখিনি! মেয়েটিকে ডেকে বললাম, “এই মেয়ে, ফুলগুলো আমায় দিবে?” সে সবকটা দাঁত বের করে হেসে ফুল আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি তাকে কিছু টাকা দিতে যাচ্ছিলাম তবে সে নিতে রাজি হল না। সে বলল, “ট্যেহা দেওন লাগবনা আফা, আপনে নিয়ে যান!” আমি একটু হেসে ফুলের তোড়াটা নিয়ে আসলাম।
ফুলগুলি এখন জানালার পাশে কাচের জারে রেখেছি। দক্ষিণের মৃদু বাতাসে দুলছে ফুলগুলি। হঠাত করেই মনে পড়ে গেল সেই দিগন্ত জোড়া মাঠ, খোলা আকাশ, বয়ে চলা নদীর কথা; সেই ছেলে বেলার কথা! কতই না অপুর্ব ছিল সেই দিন গুলি। শহরের যান্ত্রিক জীবনে বড্ড বেশি ব্যাস্ত হয়ে গেছি আমরা। ইট-কাঠ, পাথরের দেওয়ালের ভেতরে যেন সীমাবদ্ধ আমাদের পরিধি। আর কি কোনদিন ফিরে পাব সেই হারানো দিন গুলি? সেই শৈশব?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।