অণুগল্পে পার্থপ্রতিম পাঁজা

মুখোশ ও মুখশ্রী
— কী ছবি আঁকলেন?
— আমায় বলছেন? কৃশানুর দিকে ডাগর দুটি চোখ মেলে তাকালো অটোতে মুখোমুখি বসা সহযাত্রী উচ্ছল মেয়েটি। আপেলের মতো পেলব পুরুষ্টু মুখমন্ডল।কোঁকড়ানো চুলগুলো হাওয়ায় বারবার চলে আসছে কপাল আর মুখের উপর। চম্পাকলির মতো আঙুল দিয়ে আলতো করে সেগুলো সরাতে সরাতে প্রশ্ন করল মেয়েটি। কৃশানু বলে–
–হ্যাঁ আপনাকেই, সামনে তো আর কাকেও দেখছি না।
মেয়েটি মিষ্টি করে হাসলো।
— আপনিও ছিলেন বুঝি শিল্পগ্রামের কর্মশালা আর প্রদর্শনীতে ? কিন্তু আপনার সঙ্গে তো আমার মতো আঁকার সরঞ্জাম নেই! তাছাড়া আঁকার জায়গাতেও আপনাকে দেখেছি বলে তো মনে পড়ছে না। তাহলে? ….. ও এবার চিনতে পেরেছি। আপনাকেই এবছরের স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হলো, না? তার মানে আপনিই ড. …….
— কৃশানু বসু। আমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর এখনো পেলাম না।
— আমি এখানে আমার মুখোশ ও মুখশ্রী সিরিজের একটা ছবি এঁকেছি। লাইভ কাজ করা বেশ টাফ জানেন তো। এই দেখুন এই ছবিটা, খুব ভালো হয়নি, না? মেয়েটি তার মোবাইল ফোনটা এগিয়ে দিল। স্ক্রিনের উপরে একটি ছবির ফটো। একটি সুন্দরী মেয়ে, তার মুখের অর্ধেকটা একটা সুদৃশ্য মুখোশে ঢাকা। কী আশ্চর্য! ছবির মেয়েটির মুখটি তো অবিকল….
— ঠিকই ধরেছেন, ছবির মডেল আমিই। নিজের মতো করে নিজেকে ছাড়া আর কাকেই বা চিনতে পারি বলুন?
— সে তো ঠিক কথা। কিন্তু মুখোশ?
এবার মেয়েটির চোখে বিষন্নতা। দ্বিধাতুর ভাবে সে বলে–
— মিষ্টি মুখ দেখে ভুলবেন না, প্রথম আলাপে হয়তো এত কথা বলাটা প্রগলভতা হচ্ছে, তবু আপনি সাহিত্যিক বলেই বলছি, আপনি যেমনটা ভাবছেন আমি কিন্তু মোটেই তেমনটা নই।
–না না থাক না, আপনার নিতান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার……
— কোনো অসুবিধা নেই, এই অঞ্চলের প্রায় সকলেই জানে, আপনি নতুন বলেই হয়তো জানেন না। আসলে আমি কিন্তু একজন ডিভোর্সি, বিয়ের আগেই আমার পেটে বাচ্চা এসেছিল। বাধ্য হয়ে অ্যাবরশান করিয়েছি। এখন লিভ ইনে থাকি। লোকে কিন্তু আমাকে নষ্ট মেয়েই বলে, এমনকি বাড়ির লোকেরাও….. কি লেখক মশাই, মুখে আর কথা নেই যে বড়?
— না মানে, এমন তো হতেই পারে। তাহলেও আপনাকে নষ্ট মেয়ে বলতে পারছি না। কিন্তু আপনার জন্য একটা উদ্বেগ তো থেকেই যাচ্ছে…….
এবার হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়ে মেয়েটি। বিদ্যুৎ চমকের মতো চোখের চকিত ইঙ্গিতে কৃশানুকে প্রায় বিদ্ধ করে দিয়ে বলে–
— কি সাহিত্যিক মশাই, গল্পটা কেমন বানালাম?
— তার মানে? হতবাক কৃশানু প্রশ্ন করে মেয়েটিকে।
— কেন? মুখোশ ও মুখশ্রী!