।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় পাপিয়া মণ্ডল

মধুরেণ

আজ কাকভোরে উঠে থেকেই নাগাড়ে বকে চলেছেন অনুরূপা দেবী। বেচারি স্বামী স্বাধীনচেতন বাবু কবেই যে তাঁর নামের সঙ্গে চরিত্রের ডিভোর্স ঘটিয়েছেন নিজেই জানেন না। উনি ঘুম ঘুম চোখে বিছানায় শুয়ে আছেন।
অনুরূপা দেবী ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলেন—“পড়ে পড়ে ঘুমালে চলবে? বাজারটা করে নিয়ে এসো শিগগিরি।”
স্বাধীনচেতন বাবু আড়মোড়া ভেঙে বললেন—-“বাজারের লোকজনগুলোকে আসতে হবে তো!”
উনি আরও ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন—-“সবাই তো আর তোমার মতো নবাবের পো নয়। বেলা অবধি ঘুমাবে।”
অগত্যা উঠে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।
আসলে আজ ওনাদের বাড়িতে ওনার হবু বৌমা আর বেয়াই- বেয়ান আসবেন। ওনাদের একমাত্র ছেলে প্রত্যয় কলকাতায় নামকরা কোম্পানিতে কর্মরত। ওর কলিগ সহেলীর সাথে সেই সূত্রেই পরিচয় আর প্রেম। এরপর দুজনেই নিজের নিজের বাড়িতে ওদের সম্পর্কের কথা জানায়। তারপরেই ওর বাবা-মা প্রত্যয়দের বাড়ি আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আজ রোববার সকালে তাই প্রত্যয় ওনাদেরকে নিয়ে বাড়ি আসছে।
সহেলীর বাড়ি কলকাতাতেই। বাবা-মা দুজনেই কলেজের প্রফেসর। এদিকে স্বাধীনচেতন বাবুরা থাকেন মফস্বলে। উনি নিজে সরকারি চাকরি করেন ঠিকই কিন্তু অনুরূপা দেবী একেবারেই ঘরোয়া আটপৌরে মানুষ। খুব বেশি শহুরে আদব কায়দায় অনভ্যস্ত।সারাদিন সংসার নিয়েই পড়ে আছেন। আর সবেতেই একটু বেশি চিৎকার চেঁচামেচি করেন।
তাই যেদিন থেকে শুনেছেন ওনারা আসবেন, সেদিন থেকেই উনি ঘরদোর গোছগাছ করতে শুরু করেন। আর আজ তো ভোর থেকে উঠেই স্নান-পুজো সেরে রান্নার জোগাড়ে লেগে পড়েছেন আর একবার করে বকবক করে স্বাধীনচেতন বাবুকে তাড়া দিচ্ছিলেন।
বাজারে এসে ফর্দ মিলিয়ে সব জিনিস নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। ব্যাগটা কাজের মেয়ে কমলার হাতে দিয়ে বললেন—“তোর বড়মাকে বল তো এক কাপ চা দিতে।”
একটু পরেই চায়ের কাপ হাতে ঘরে ঢুকে ওনার হাতে কাপটা ধরিয়েই আলমারি খুললেন। তারপর ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী বের করে খাটের উপর রেখে বললেন—-“স্নান সেরে এইগুলো পড়ে তৈরি হয়ে নিও। ওরা আসার আগেই রান্না সেরে নিয়ে আমিও তৈরি হয়ে নেব।”
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে উনি বললেন—“তুমি আবার কি তৈরি হবে অনু, তোমায় তো এমনিতেই সুন্দর লাগছে।”
একটু লজ্জা পেয়ে উনি বললেন—“বুড়ো বয়সে ভিমরতি হয়েছে তোমার। ওনারা বড় শহরের মানুষ। কি সুন্দর করে সেজেগুজে আসবেন দেখবে। আর আমি রান্না করে ঘেমে নেয়ে! বেশ আমি হাতের কাজগুলো সেরে নিই। তুমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিও।” বলেই দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে এলেন।
কমলা ততক্ষণে মাছ, মাংস সব ধুয়ে মশলা করতে শুরু করেছে। অনুরূপা দেবী ডাল, আলুপোস্ত, আলুর দম আর চাটনি আগেই করে নিয়েছেন। এবার দুটো ওভেনের একটাতে মাছ আর একটাতে মাংস বসাবেন। কমলা লুচির ময়দা মেখে রেখেছে। ওরা এলেই গরম গরম লুচি আর বেগুন ভাজা হবে। রান্না করতে করতে বারবার ঘড়ি দেখছেন উনি। কমলা বলল—“তুমি ভেবো না বড়মা। মাছটা নামিয়ে,খাসির মাংসটা কুকারে দিয়ে তুমি কাপড় ছেড়ে, চুল আঁচড়ে নাও। ওরা এলে লুচি, বেগুন ভাজা আমি করে নেব। আর ভাতটাও পরে আমিই করে দেব।”
উনি বললেন– “বেশ তাই করবি। আলুর দমটা আর একবার গরম করে নিস কেমন!”
ওনাদের কথার মাঝেই স্বাধীনচেতন বাবু এসে বললেন—-“কতদূর তোমার? প্রত্যু (ওনারা ওকে ওই নামেই ডাকেন) ফোন করেছিল। ওরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসছে।”
উনি বললেন—-“হ্যাঁ, এই তো হয়েই এসেছে। বাকিটুকু কমলা করে নেবে। যাই আমি তৈরি হয়ে নিই।”
কিছুক্ষণ পরেই একটা বড় গাড়ি এসে দাঁড়াল। স্বাধীনচেতন বাবু ওনাদেরকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভিতরে নিয়ে এলেন। সহেলীকে আগে ছবিতে দেখেছেন কিন্তু আজ সামনে থেকে ওকে আরও সুন্দর লাগছে। ওর বাবা-মায়ের চেহারা আর পোশাকে মার্জিত রুচি আর আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। অনুরূপা দেবী প্রথমে একটু থতমত খেলেন। তারপর মনে মনে ছেলের পছন্দের প্রশংসা করলেন। যদিও ছেলেও ওনার কিছু কম যায় না। শিক্ষিত, সুপুরুষ, মার্জিত, প্রতিষ্ঠিত.. সুযোগ্য বলতে যা বোঝায়, প্রত্যয় ঠিক তাই।
সহেলীর বাবা-মাকে নমস্কার করে বসতে বললেন উনি। তারপর রান্না ঘরে গিয়ে লেবুর সরবৎ করে নিয়ে এলেন। কিছুক্ষণ পরেই সবাইকে খাবার টেবিলে বসতে বলে কমলার সাথে হাতে হাতে জলখাবারের প্লেট সাজাচ্ছিলেন। এমন সময় রান্নাঘরে হঠাৎ সহেলী এসে হাজির। বলল—-“মা তুমি প্লেটগুলো সাজিয়ে দাও, আমি সবাইকে টেবিলে দিয়ে আসছি।”
উনি অপ্রস্তুত হয়ে বললেন—–“না না, তা কেন, তুমিও বোসো গিয়ে, আমি আর কমলা তো আছি।”
কমলা হেসে বলল—-“দিতে দাও গো বড়মা, এই ঘর তো ওরই হবে একদিন। নাও নাও বৌমণি, প্লেটগুলো নিয়ে চলো দেখি, তা না হলে সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
অনুরূপা দেবী মৃদু হেসে বললেন—-“বেশ ওদেরকে দিয়ে তুমিও বসে পড়ো।”
ওকে খাবারের প্লেট নিয়ে আসতে দেখে স্বাধীনচেতনবাবু আর প্রত্যয় যারপরনাই খুশি হল। ওর বাবা-মা একটু মুচকি হাসলেন।
অনুরূপা দেবী সহেলীর জন্য খাবার নিয়ে এসে বললেন—–“বোসো এবার। খেয়ে নাও।”
ও বলল—-“তোমার প্লেটটাও নিয়ে এসো। সবাই মিলে একসাথে খাই। আর কমলাদিকেও খেয়ে নিতে বলো।”
ওর কথায় অবাক হলেন অনুরূপা দেবী। মুখ দিয়ে কথা সরলো না। স্বাধীনচেতনবাবু বললেন—-“ওনাকে টেবিলে বসে টিফিন খেতে কোনদিনই দেখিনি আমরা। ওই কাজ করতে করতে কোনদিন একটু খান, আবার কোনদিন খান না।”
সহেলী বলল—-“তা কেন হয়? কেন আপনি যখন খান, মাকেও কেন জোর করেন না?”
প্রত্যয় মুখ টিপে হাসল। ওর বাবা হতভম্ব হয়ে গেল। শুধু অনুরূপা দেবীর চোখের কোণে জল এল। সত্যিই তো ওনাকে এভাবে কোনদিনই কেউ বলেনি খাওয়ার জন্য।
নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন—“আসলে এই সময়টায় ওরা বাপ-বেটায় ভাত খেয়ে অফিস, স্কুল যেত। তাই আমার জন্য আলাদা করে আর টিফিন করিনি কোনদিন। আর এই সময়টায় এতোটাই ব্যস্ততা থাকে, তাই.. ”
সহেলীর মা বললেন—-“ঠিক বলেছেন দিদি, মায়েদের আর নিজের জন্য ভাবা হয়ে ওঠে না। যাইহোক আজ থেকে শুরু করুন, নিজের জন্য একটু ভাবুন।”
সহলী বলল—-“আমি রোজ ফোন করব এবার থেকে। তোমার খবর নেব। যদি শুনি নিজের প্রতি অবহেলা করছ, খুব রাগ করব।”
আর ঠিক থাকতে পারলেন না অনুরূপা দেবী। চোখ দিয়ে অঝোরে জল বেরিয়ে এল। সবারই বুকে মোচড় দিল। ওনার চোখের জল মুছিয়ে ওনাকে খেতে বসালো সহেলী।
মায়ের জন্য সমবেদনা আর সহেলীর জন্য গর্বে বুক ভরে উঠল প্রত্যয়ের।
সারাদিনটা বেশ কেটে গেল গল্প-আড্ডা-আলাপচারিতায়।
বিকেলে ওরা ফিরে গেল। সহেলীর মা-বাবা, বিয়ের জন্য একটা শুভ দিন ঠিক করতে বলে গেলেন।
সন্ধেবেলা স্বাধীনচেতনবাবু ঘরে বসেছিলেন। অনুরূপা দেবী ওনার কাছে এসে বসলেন। উনি বললেন—-“টিভি দেখবে না আজ?”
অনুরূপা দেবী বললেন—“নাহ, আজ আর ইচ্ছে করছে না। জানো, প্রত্যু যখন বলেছিল সহেলীর কথা ওর বাবা-মার কথা, আমার তখন খুব একটা ভালো লাগে নি। ওদেরকে বাড়ি নিয়ে আসছে শুনেও আদিখ্যেতা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, এ আবার কেমন কথা, বিয়ের আগেই মেয়ে আসবে তার হবু শ্বশুর বাড়ি।তাছাড়া বড়লোক বাবা-মার একমাত্র আদুরে মেয়ে, নিজে চাকরি করে, ওর আচার- আচরণই বা কেমন হবে? খুব অস্বস্তিতে ছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আজ সহেলীকে দেখে, ওর আচরণ আর ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি।”
ওনার কথা শুনে স্বাধীনচেতনবাবু বললেন—-“তোমার বলা কথাগুলোর সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। মিথ্যা বলব না, এই চিন্তাগুলো আমারও ছিল। সত্যি সত্যিই মেয়েটা এক নিমেষে আমাদেরকে আপন করে নিয়েছে। আমাদের ছেলেটার পছন্দ আছে বলতে হবে।”
বলেই দুজনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলেন। তারপর বললেন—“সামনের অঘ্রাণেই একটা দিন দেখে চার হাত এক করে দেব।”
প্রত্যয়কেও ফোন করে জানালেন কথাগুলো। ও খুব খুশি হল, বাবা-মায়ের কথা শুনে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।