গদ্য বোলো না -তে পরিমল মন্ডল

করোনা ভার্সেস পুঁজি

মার্ক্সবাদী চিন্তা নায়ক স্লাভস জিজেক তার বই “The Pandemic” এ লিখছেন, যে ভাইরাস ধনী গরিব বা রাজা উজির, মানে না সেই ভাইরাসের সাথে পুঁজির একটা অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। তিনি বলেন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় “পুঁজি” এবং “করোনা ভাইরাসের ” চরিত্র একই।”করোনা” যেমন শরীর না পেলে বিস্তার করতে পারে না মাটিতে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যায়,তেমনি পুঁজি ও যদি বাজার না পায় তার বিকাশ করতে পারে না।সেও ধীরে ধীরে শক্তি হারায় ।
সারা পৃথিবী এখন করোনা আতঙ্কে মৃত্যুর দিন গুনছে।সংক্রমিত দেশ গুলোর স্কোর বোর্ড ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।এই প্রতিবেদন টা যখন লিখছি তখন সারা পৃথিবীতে সংক্রমিতের সংখ্যা 38 লক্ষ 22 হাজার 8 শত ষাট। মৃত্যুর সংখ্যা 2 লক্ষ 65 হাজার ছিয়াত্তর ।
আমাদের দেশে সংক্রমিতের সংখ্যা 53 হাজার সাত ।মৃত্যুর সংখ্যা 1694 এবং 212 দেশ আক্রান্ত এই মারণ ভাইরাসে।আমাদের দেশে 22 শে মার্চ জনতা কারফু ও 23 শে মার্চ শহীদ ঈ আজম ভগৎ সিং এর ফাঁসির ঐতিহাসিক দিন টির থেকে এখনও পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে লকডাউন চলছে।তিন দফায় ঘোষিত এই লকডাউন এ আমরা দেখছি গরিব সাধারণ মানুষের থেকে বেশি মাত্রায় হাঁফিয়ে উঠেছে পুঁজির লগ্নিকারীরা।
অতীতে ও আমরা দেখেছি রাষ্ট্রের গরিব সাধারণ জনগণ স্বেচ্ছায় শিকল কাটার কোনো দিন চেষ্টা করেনি। যতই তাদের উপর নেমে এসেছে অত্যাচার।রাষ্ট্র যখন ব্যার্থ হয়েছে,রাষ্ট্রের কাছে যখন মুক্তির পথ নেই,রাষ্ট্র যখন পথ দেখাতে পারেনি ,তখনই বিদ্রোহ হয়েছে,বিপ্লবের আগুন জ্বলেছে।
আজকে প্রায় দুমাস ধরে আমরা দেখছি পৃথিবী জুড়ে যেমন করোনার দাপাদাপি চলছে,তেমনি বিশ্বপুঁজি বা লগ্নী পুঁজি ও ধীরে ধীরে তার শক্তি হারাচ্ছে।তাই যে পুঁজির কারবারিরা করোনার প্রাদুর্ভাবে চিৎকার করেছিল লকডাউন ই একমাত্র বাঁচার পথ।আর জনগণ ভুখা পেটে নীরবে মেনে নিয়েছিল সব।আজ আবার সেই পুঁজি পতিরাই ধীরে ধীরে আওয়াজ তুলছে শুধুই লকডাউন করে বাঁচার রাস্তা বেরোবে না ।বিকল্প পথ খুঁজছে তারা। কারন মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে পুঁজির কারবারী দের।পুঁজির নিষ্ক্রিয়তা তারা আর মেনে নিতে পারছে না।অথচ দেখুন এই পুঁজি পতিরাই আজ থেকে দুই মাস আগেও মরিয়া হয়ে উঠছিল লকডাউন এর জন্য।কারন তারা ভেবেছিল প্রকৃতি থেকে তৈরি এই ভাইরাস টিকে কয়েক দিনের মধ্যেই বিজ্ঞানীদের দিয়ে ল্যাব থেকে এন্টিভাইরাস তৈরি করে জব্দ করে দেবে।কিন্তু হলো না ।মনে হওয়া টা মনেই রয়ে গেল।না গণতান্ত্রিক ভাইরাস টি কাউকে মানতে নারাজ।বিজ্ঞানীরা বলছে হয়তো দুই বছর ও লেগে যেতে পারে তাকে জব্দ করতে।কিন্তু পুঁজিপতি দের আর ধৈয্য থাকবে কেন?
যে পুঁজিপতিরা একদিন ধর্মঘট হলে ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠায়।
সমস্ত মিডিয়া দিয়ে প্রচার করতে থাকে একদিনে দেশ হাজার হাজার কোটি টাকা লস করেছে।
আবার দেখুন এতদিনের লকডাউন কে শুধু মনে হওয়ার উপরে ভর করে কি অদ্ভুত ভাবে মেনে নিল তারা।আজ আবার যখন হিসাব মিলছে না তখন মত বদলাতে চাইছে।আর এই জনগণই তাদের এক মাত্র মাধ্যম মতামত প্রয়োগ করার।লকডাউন এর শুরুতে আমরা দেখেছি সব বাজার শুনশান।কোথাও 3 টে মানুষ কে একসাথে দেখলেই ক্যামেরা সেখানে চলে যাচ্ছে।পুলিশের থেকেও তারা ছিল অনেক বেশি তৎপর।কিন্তু এখন আমরা সেই মিডিয়াকেই দেখছি ধীরে ধীরে প্রচার শুরু করে দিয়েছে মানুষের ধৈর্য এর বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে ,তারা আর ঘরে বসে থাকতে চাইছে না।এই গুলো বোঝার সময় এসেছে।কোনো কোনো দেশে রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে মানুষ লকডাউন তোলার জন্য।এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো বোঝার সময় এসেছে।তারা আর চাইছে না এই পুঁজির বিকাশের প্রতিরোধ।সাধারণ মানুষ ক্ষতি স্বীকারে অভ্যস্ত।তারা জানে “শরীরের নাম মহাশয় যা সওয়াবে তাই সয়”পরিযায়ী শ্রমিকরা জানে লকডাউন মানেই হাঁটা।হাঁটতে হাঁটতে না খেয়ে মরা।গৃহবন্দিরা জানে একবেলা খেয়েই বাঁচতে হবে।সরকার যা দেবে তাই ঠিক।কিন্তু পুঁজিপতিরা তো তা পারে না। তারা প্রকৃতি কে নিজের মতো করে পেতে চায় ।তারা আম্যাজন কে পর্যন্ত ধ্বংস করতে পিছপা হয়না।তারা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে একটা ভাইরাসের সাথে লড়তে।
করোনা আক্রান্ত ইরানের ডেপুটি হেলথ মিনিস্টার ইরাচ হাবীচি বলছেন “This virus is democretic,and it doesn’t distinguish between poor and rich or statesmen and an ordinary citizen.”তাই সত্যি বোঝার সময় এসেছে এই ভাইরাস হয়তো ধনী গরিব কাউকেই প্রাণ কেড়ে নিতে পিছপা হয়না।কিন্তু”Corona is the Virus,Capitalism is the Pandemic” ভাইরাসের নাম করোনা কিন্তু মহামারীর কারণ হলো পুঁজিবাদ।(রেডিকিস মিডিয়ার প্রথম প্রকাশিত একটা ওয়াল থেকে)।
দেখুন লকডাউন উঠবে,প্রতিষেধক আসবে, কিন্তু শোষণ বাড়বে।লকডাউন চলা পিরিয়ডে আমরা দেখেছি সমাজতান্ত্রিক দেশ গুলোতে করোনা কে যথেষ্ট সামলে নেওয়ার চিত্র।কিন্তু ইউরোপিয়ান দেশ গুলি কোনোভাবেই প্রতিরোধ করতে পারছে না।দিন দিন বেড়েই চলেছে
কেন?তার কারন বিশ্বের সমস্ত পুঁজি তান্ত্রিক দেশ গুলো
জনস্বাস্থ খাতে ব্যয় করে কখনোই 3% এর উপর নয়।যেমন মার্কিন যুক্ত রাষ্ট্র জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে জিডিপির 2.65%।আমাদের দেশ ব্যায় করে মাত্র 1.8%।তা না হলে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে লগ্নী পুঁজির এত রমরমা বাজার পাবে কোথা থেকে।
যে দেশের জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার জন্য টাকা লাগে না।সেই দেশ তো করোনার বিরুদ্ধে ফাইট করবেই।
কিন্তু কি হবে আমাদের ?
আমাদের পুঁজিপতিদের ই বা কি হবে ?
কি হবে তাদের স্বাস্থ্য ব্যাবসার?
সারা পৃথিবী সংক্রমণে আক্রান্ত ।
পুঁজি কিন্তু পারছে না মানুষ কে বাঁচাতে।তাদের সব প্রক্রিয়া ফেল।
অথচ সমাজ তান্ত্রিক দেশ গুল ঘুরে দাঁড়িয়েছে।তারা জানে করোনা কে নিয়েই চলতে হবে।সেই পরিকাঠামো তাদের প্রস্তুত।তারা নিজেদের দেশ কে সামাল দিয়ে ও পাড়ি দিয়েছ প্রতিবেশী দেশের সহযোগিতায়।শত চাপ ,বদনাম নিয়েও তারা মানুষের পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছে।শুধুই মানবিকতা তাদের সম্পদ।পুঁজিকে সম্পদ ভেবে চলতে শেখেনি তারা।সময় এসেছে এই গুলো এখন বোঝার।তাই এই প্রতিবেদন।
এই কঠিন সময়ে যদি না বুঝি ,
পুঁজি তার বিকাশের জন্য মরা কামড় টা কিন্তু দেবেই।
এক কথায় কার্ল মার্কস পুঁজির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন ,পুঁজি হচ্ছে “value in motion”
তাই তো এই চরম বিপর্যয়ের মুখেও আমাদের রাষ্ট্র মনে করে,
এখনই সময় অস্ত্র কেনার।
এখনই সময় বিজয় মালিয়াদের 68000 কোটি টাকার ঋণ মুকুব করার।
এখনই সময় 8 ঘন্টার কাজকে 12 ঘন্টা করার।
এখনই সময় করোনা ভাইরাস কে চীনা ভাইরাস হিসাবে প্রচার করার।
এখন ও যদি এই সব আমরা না ধরতে পারি আরো হাজার বছরের অন্ধকারে নিশ্চিত ডুবছি আমরা।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।