T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় পূর্বা কুমার

প্লাটিনাম জয়ন্তী বর্ষ
ঘুমের ঘোরে পাশের বালিশে হাতটা ঢলে পড়তেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে ছবির। মেয়েটা! মেয়েটা কোথায় গেল? ছবির বুক ধড়ফড় করে। ছবির এখন এরকমই হয়। ঘুমোলেও পুরোপুরি অচেতন হয় না। মনের একদিকটা ঘুমের মধ্যেও সজাগ থাকে,সতর্ক থাকে। রাস্তার কুকুর বেড়ালগুলোর মত। অঘোরে ঘুমোচ্ছে, কিন্তু কোথাও সামান্য একটু আওয়াজ হলেই ঘুমের মধ্যেও ঠিক কান খাড়া হয়ে ওঠে। তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে ছবি। ঘরের দরজা হাট করে খোলা। বাইরে ঝিঁঝির একটানা চিক চিক শব্দ। এখনও তো রাত রয়েছে! তাহলে কি আবার!
তুলি ই ই …. তুলি ই ই ই ই… ছবি দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তুলির নামধরে আবার ডাকে। কিন্তু কোথাও কোন সাড়া নেই। আবার ছুটে ঘরের ভিতর আসে। মেঝেতে কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে বংশী। দেওয়ালে লাঠিটা ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো। ছবি বংশীকে ঝাঁকায়, মেয়েটাকে দেখেছ? কখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল?
ঘুমের মধ্যে এরকম আচমকা হ্যাঁচকায় বংশী হতভম্ব হয়ে যায়। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারে না। তবে সে শুধু কয়েক মুহূর্ত, তারপরই হঠাৎ বংশীর মুখটাও ভয়ে আতঙ্কে বিবর্ণ হয়ে যায়। কী! মেয়েটা নেই! বংশীর কথা জড়িয়ে যায়।“ দ্যাখ বাইরের দিকটায়। কোথায় আর যাবে!” ‘কোথায় আর যাবে’ বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে যায় তার। নিজের পঙ্গু পা দুটোর দিকে তাকিয়ে মেঝেতে জোরে একটা কিল মারে। অক্ষমতার আক্রোশ?
ছবি দৌড়ে উঠোনে নামে। বংশী লাঠিটা নিয়ে ঘষটে ঘষটে বাইরে আসে। টালির এক কুঠুরি ঘর, একচিলতে দুয়ার আর এই একফালি উঠোন। বাড়িতে কোন পাঁচিল নেই। রাস্তা এসে উঠোনে মিশেছে। না, বরং বলা ভাল, ওদের উঠোন গিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে।
তুলি। তুলিকা। ছবির মেয়ে তুলি। বংশীই নামটা রেখেছিল। লেখাপড়া না জানুক, লোকটা কিন্তু কাব্যি করতে পারত। বলেছিল, তুলি দিয়েই তো ছবি আঁকা হয়। বলেছিল, তোমরা মা মেয়েতে আঁকবে আর আমি বংশী, পাশে বসে বাঁশিতে সুর তুলব। তাদের এই পরিকল্পনা শুনে বিধাতা তখন বোধহয় একটু মুচকি হেসেছিলেন। নাহলে বংশীর সেই বাঁশির বাঁশ কেনই বা পঙ্গুর লাঠিতে পরিণত হবে আর কেনই বা তুলির মত অমন ফুটফুটে মেয়ের ষোল সতেরো বছর বয়সেও বুদ্ধিটা পাঁচ বছরের বাচ্চার মত থেকে যাবে। বুক খালি করে একটা বড় শ্বাস বেরিয়ে আসে ছবির।
“এত রাত্তিরে কোথায় গেলি রে মা!” বংশী নিজের মনেই বলে।
ছবি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে । ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাড়ার ল্যাম্পপোস্টের লাইটটা কবে থেকে খারাপ! বলে বলে হয়রান। কেউ পাত্তা দেয় না। গলির ভেতর কি না! আর এ পাড়ায় থাকে তো সব তাদের মত এলেবেলে লোক। দেখি তো, একবার বকুলতলার দিকটা। ওখানটা তুলির পছন্দের জায়গা। ছবি পালেদের পানা-পুকুরের পাশ দিয়ে চলে যায়। অন্ধকার এখন চোখে সয়ে গেছে। হ্যাঁ, যা ভেবেছে তাই, তুলি বকুলতলার চাতালে পা ছড়িয়ে বসে আছে। দুলে দুলে সুর করে ছড়া বলছে আর আপন মনে হি হি করে হাসছে। বংশীর কাছেই দু একটা ছড়া শিখেছে। তাও অনেকদিন ধরে কসরতের পর।
আঁতুল বাঁতুল শামলা শাতুল শামলা গেছে হাতে
কুঁচ বলোন কন্যে যিনি, তিনি ঘুমান খাতে
খাত নিয়েছে বোয়াল মাছে, কন্যে বসে কাঁদে
ঘতি বাতি সব গিয়েছে, কিসে তবে লাঁধে?
শেষের দু’লাইন বারবার বলছে আর হি হি করে হাসছে। শরীর বেড়েছে,যৌবন এসেছে কিন্তু বুদ্ধি বাড়েনি। ‘ট’ কে ‘ত’ বলে আর ‘র’ কে ‘ল’। ঠিক করে জামাকাপড় পরতে পারে না, খেতে পারে না। মুখ দিয়ে লালা ঝরে।
ঘতি বাতি সব গিয়েছে, কিসে তবে লাঁধে?
আবার হাসি। সেদিনের পর থেকে মেয়েটার মাথাটা পুরো ঘেঁটে গেছে। ওরে তুলি! তুই কি কাঁদতে ভুলে গেলি? এত বড় হলি,তবুও কান্না আর হাসির পার্থক্য শিখতে পারলি না? ছবি পাথরের মত মেয়ের পিছনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। খুব অসহায় লাগে নিজেকে। মনে হয়, একটা জ্বলন্ত মরুভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে। কোথাও এতটুকু জল নেই,ছায়া নেই। শুধু ধু ধু গরম বালি। বংশীও আচমকা কেমন অথর্ব হয়ে গেল। মেয়েকে ভাল ডাক্তার দেখাবে বলে বেশি রোজগারের আশায় কোলকাতায় ফ্ল্যাট তৈরিতে রাজমিস্ত্রীর জোগাড়ে হয়ে কাজে গেল। ব্যাস, ভাড়া ভেঙ্গে চারতলা থেকে সটান মাটিতে। মেরুদণ্ডএর কোথায় যে লাগল, একেবারে পঙ্গু। করোনা অসুখটা যদি আর ক’মাস আগে আসত! লকডাউনে নিশ্চয়ই কাজ বন্ধ থাকত। বংশীর দুর্ঘটনাটা তাহলে হয়ত হত না। আর ছবিকেও আয়া সেন্টারে নাম লিখিয়ে লোকের গু-মুত ঘেঁটে সংসার চালাতে হত না। দু ফোঁটা গরম জল গাল বেয়ে গড়ায়।
বেশ তো চলছিল , ছবি সকালবেলায় রান্নাবান্না করে দিয়ে কাজে চলে যেত আর তুলি সারাদিন পাড়ায় এর বাড়ি তার বাড়ি ঘুরে ঘুরে বেড়াত। এ, ও,সে টুকটাক ফাইফরমাশ খাটাত। ছবির কষ্ট হত। কিন্তু কিছু করার নেই। তাকে কাজে যেতেই হবে। তাছাড়া সবাই তুলিকে ভালবাসে। ছবি এতদিন তাই মনে করত। মোটামুটি নিশ্চিন্তই ছিল। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, আসলে সে শ্বাপদসংকুল জঙ্গলে বাস করছে। চারিদিকে হিংস্র জন্তু জানোয়ার। উফফ! কিছুতেই মনে আনতে চায় না। কিন্তু দাঁতে কিছু আটকে গেলে যেমন নিজের অজান্তেই বারবার জিভ চলে যায় ঠিক তেমনি সেদিনের সন্ধ্যের ঘটনাটা…..
সেদিন ছবি কাজ থেকে ফিরে দ্যাখে তুলি বাড়িতে নেই। অন্যদিন বাপ মেয়েতে বসে ইকির মিকির খেলে। বংশী বলল, চিন্তা ক’র না, এখুনি চলে আসবে। পাড়ারই কারও বাড়িতে ঠিক আছে।
ছবিও সংসারের কাজে লেগে পড়ে।
রাত প্রায় নটা। রান্নাঘরের খানিকটা আলো তেরছাভাবে উঠোনে পড়েছে। তুলি ধীর পায়ে উঠোনের আলো আঁধারিতে এসে দাঁড়াল। ছবি একটু অবাক হয়ে গেল । তুলি এত শান্ত নয়। ওর মধ্যে সবসময় একটা অস্থির ভাব থাকে। মুখে আধো আধো কথার খই ফোটে। বাড়ি ঢোকার আগে থেকেই টের পাওয়া যায়,তুলি আসছে। সেই মেয়ে এমন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে!
–কী রে! কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
ছবির কথায় কোন উত্তর দেয় না তুলি।
–কী হয়েছে? এরকম কাঁপছিস কেন?
এবারেও তুলি চুপ করে থাকে। বংশী বলে, দুয়ারের আলোটা জ্বেলে দাও না। ছবি ডুম জ্বেলে দেয়।
–এ কী! তোর পা দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে কেন? পড়ে গেছিস কোথাও?
তুলি কোন কথা বলে না। সারাদিন গাধারখাটুনি খাটার পর আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারে না ছবি। তুলির কাঁধ ধরে জোরসে ঝাঁকুনি দেয়, বল, কী হয়েছে? তোমার ক্ষ্যাপামো আমি বের করছি! এবার তুলি মায়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসে। বলে, ভজন জেথু….জেথু…..আমাকে…….জেথু……
–কী জেথু জেথু করছিস?
মুখ ভেংচ বলে ছবি।
—জেথু আমাকে আজ ঘলে নিয়ে গিয়ে বলল, তুই খুব ছুন্দর। তোকে একতু আদল কলে দিই। আয়, তোর প্যানতা খোল।
মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল ছবির।
“কী? কী? কী বলছিস এসব?” আর্তনাদ করে ওঠে সে।
—- তালপল…. তালপল…….
চো ও ও ও প! পাশ থেকে গর্জন করে ওঠে বংশী।
তারপর বাড়িতে যেন শ্মশানের নীরবতা।
ভজন দা! মানে ভজন ঘোষাল! সবাই বলে,দেবতা! মানুষের সুখে দুঃখে পাশে থাকে! ধনী, দয়ালু, সদাহাস্যময় মানুষটা!
“এর বিচার চাই!” হাত মুঠো করে মেঝেতে অক্ষম আঘাত করে বংশী।
“কে তোমার কথা বিশ্বাস করবে? কার কাছে বিচার চাইবে? তুমি পারবে ভজন ঘোষালের সঙ্গে লড়তে? দম আছে তোমার? টাকা আছে তোমার?”
ফোলানো বেলুনকে ফুটো করে দিলে যেমন চুপসে যায় ঠিক তেমনি বংশীরও প্রতিবাদের স্বর চুপসে নেতিয়ে পড়ল মুহূর্তে।
নটাতেই যেন মাঝরাত নেমে এল।
একটা জড়বুদ্ধি মেয়ের মনের গলিঘুঁজি বড় রহস্যময়। এরপর থেকে তুলির হাসি দ্বিগুন হারে বেড়ে গেল। কী বুঝেছে কে জানে! তবে বাড়ির বাইরে আর বিশেষ বেরোয় না। বাবার কাছে চুপটি করে বসে থাকে।আজ আবার মাঝরাতে বকুলতলায় বসে ছড়া বলছে।
আজ স্বাধীনতা দিবস। হীরকজয়ন্তী বর্ষ। দেশজুড়ে মহা ধুমধাম। র্যালি, প্যারেড, বক্তৃতা। সাইকেল, বাইক,গাড়ি যে যেখানে পেরেছে পতাকা গুঁজেছে। রাস্তার এখানে সেখানেও ছোট ছোট কাগজের পতাকা। স্বাধীনতা গড়াগড়ি খাচ্ছে রাস্তায়। এবারে তুলি যায়নি, নাহলে স্বাধীনতা দিবসের দিন ওর টিকি খুঁজে পাওয়া যায় না। বিস্কুট আর লজেন্সের লোভে লোভে চলে যায় প্রাইমারি স্কুল, তারপর হাইস্কুলে। সবশেষে আসে পাড়ার রাঙামাটি ক্লাবে। এই ক্লাবের সেক্রেটারি ভজন ঘোষাল, তুলির ‘ভজন জেথু’। এই ক্লাবে প্রতিবছরই জাঁকজমক করে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়। কিন্তু এবারে কী ব্যাপার কে জানে! সকাল থেকে ক্লাবচত্ত্বর শুনশান। সকাল ন’টা বাজতে চলল এখনও সব ভোঁ ভাঁ।
ছবি আজ ইচ্ছে করেই ছুটি নিয়েছে। তুলিকে চোখে চোখে রাখবে, স্বাধীনতা দিবস যে! দুয়ারে বংশীর সরু হয়ে যাওয়া পা দুটোয় সর্ষের তেল মালিশ করছিল ছবি। একটা এম্বুল্যান্স বুককাঁপান আর্তনাদ করতে করতে সাঁ করে চলে গেল। রাস্তায় জটলা। ভজন ঘোষালের মেয়ে ভোরবেলা বিষ খেয়েছে। সেকী! মেয়েটা যে তুলির বয়সী! তুলি কী শুনল, কী বুঝল কে জানে! হঠাৎ একছুট। রাস্তায় পড়ে থাকা একটা পতাকা কুড়িয়ে নিয়ে সোজা রাঙামাটি ক্লাবে। শহিদ বেদীর উপর দাঁড়িয়ে ছোট্ট কাগজের পতাকাটা তুলে ধরে ছড়া বলতে শুরু করে,
খাত নিয়েছে বোয়াল মাছে,কন্যে বসে কাঁদে,
ঘতি বাতি সব গিয়েছে, কীসে তবে লাঁধে ?
মেয়েটার বুদ্ধিটা আর বাড়ল না। ছড়ার শুধু দুটো লাইন মনে রাখতে পেরেছে।