সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা
দ্বিতীয় খন্ড (উনষষ্টি পর্ব)
গেলোবার যখন খেয়া পার হওয়ার জন্য নদীর বুকে নৌকোর ওপরে পা রেখেছিলাম, সেবার নদী হঠাৎ করে জলে দোলা দিয়েছিলো। আমি চমকে উঠলে আমাকে নকল অভিমান দেখিয়ে বলেছিলো, ফের যখন আসবো তখন ওর সাথেও সময় কাটাতে হবে আমায়।
এখন নদী নিস্তরঙ্গ। এতোটুকুও কাঁপন নেই জলে। সেই যে আমার থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে গেছিলো, তারপর থেকে আশ্চর্যজনক ভাবে ওর জলে কখনও তরঙ্গ দেখতে পেলাম না।
কী আশ্চর্যজনক মায়ার খেলা! এ কি সত্যিই মায়া, নাকি মনের ভ্রম! যদি ভ্রমই হবে, তাহলে যে কথাগুলো আমি বলেছি ওর সাথে সে সবই কি কিছু কাল্পনিকতাকে ভিত্তি করে মনের খাতায় লেখা হয়েছিলো? যুক্তি বলছে কল্পনা, বিজ্ঞান বলছে ভ্রম আর মন বলছে — আমি কী করে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে অস্বীকার করতে পারি?
হঠাৎ যেন সামান্য তিরতির করে কেঁপে উঠলো নদী। একটা অপসৃয়মান ছায়া যেন দ্রুতপায়ে নদীর ওপর দিয়ে হেঁটে চলে গেলো। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটনাটা ঘটে গেলো।
বিষয়টা নিয়ে ভাবছি, এমন সময় আকাশের বুকের থেকে যেন খুব ক্ষীণকন্ঠে কেউ বলে উঠলো — ” আমায় ভুলে যেও ঠাকুর। “
তখন সূর্য পুব আকাশের প্রান্তভাগ ছেড়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে গেছে। খন্ড খন্ড ধূসর মেঘেরা মনের খেয়ালখুশি মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আমি একবর্ণও মিথ্যে বলছি না। আজও সে ঘটনা মনে হলে শরীরটা যেন কেমন করে ওঠে। আকাশের বুকে ভেসে যাওয়া মেঘেদের মাঝে আমি পরিষ্কার বাউলনিকে দেখতে পেলাম। একথা কোনোদিনও কাউকে বলতে পারিনি। আমি জানি, এ আমার ভ্রম। বোধহয় আমি এতোটাই বাউলনিকে নিয়ে ভাবছিলাম যে আমার চতুর্দিকে আমি ওরই অস্তিত্ব অনুভব করছিলাম। বাঁধা নৌকোর ওপর দিয়ে হেঁটে নদীর ওপারে পা রাখতেই যেন মায়াজগৎ থেকে মাটিতে পা রাখলাম। একটু এগোলেই বড়ো রাস্তা, আর সেখানেই সার দিয়ে রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখেই একজন রিক্সাচালক এগিয়ে এলেন।
— ” কুইনঠে যাইবেন গ ধুবদাদা? ইষ্টিশন না কি বামদেবের বাড়িত বট্যে? কবে আসা হইঞ্চহে হিথাইনকে গ? “
–” কাইলই আইসি রে, ভাইডা পরশু।
ষ্টেশনেই যামু, চ।”
–” আইজ্ঞা উঠেন কেনে, কিন্তুক এখুন তো কোনো… “
–” হ, জানি তো হেইডা। দেখি যদি লোকাল পাই তাইলে লোকালে লোকালে কইরাই না হয়… “
দু’জনে সারাটা রাস্তা বকবক করে চলেছে। আর আমি শুধু মনের খাতার পৃষ্ঠা উলটে চলেছি। এবারে দেখা সমস্ত চরিত্রগুলোর মুখাবয়ব মনের আকাশে ভেসে উঠছে। এই দু’ দিনে যতো মানুষের সাথে দেখা হয়েছে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাদের কথাই মনে পড়ছে।
খুব গরম না অনুভূত হলেও ক্রমশ তাপ বাড়ছে। রিক্সাচালক ভাই সমানে ঘেমে যাচ্ছে।
আমরা মুনসুবা মোড়ে লাল্টুর চায়ের দোকানে এসে পৌঁছেছি। রিক্সাচালক ভাই হাইওয়ে ছেড়ে, বাঁদিকের ঢালু থেকে রিক্সাটাকে সোজা ধাবার উঠোনে নামিয়ে দাঁড় করালো।
ধাবাটার চালা ছাড়িয়ে এসে ডানপাশে একটা বিরাট বড়ো চৌবাচ্চা। আর তার পেছন দিকেই আদিগন্ত ধানিজমির বুকজুড়ে নবীন ধানের চারায় সবুজ হয়ে রয়েছে পৃথিবী।
— ” গামছাখান আর সাবান বাইর কইর্যা ল। এক্কেবারে স্নানটা সাইরাই লই। কখন যে আইজ বাড়ি ফিরুম, কে কইতে পারে! “
একদিকে জলের পাইপ দিয়ে শ্যালোপাম্প থেকে অবিরামভাবে মাটির নীচের ঠান্ডা জল এসে উপচে পড়ছে চৌবাচ্চার বুক। অনেকক্ষণ ধরে সেই শীতল জলে স্নান করলাম। ধ্রুবদা ইতিমধ্যেই স্নান সেরে ধাবার ছাউনির নীচে একটা খাটিয়ায় গিয়ে চিৎ হয়েছেন। রিক্সাচালকভাই উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে রুটিমিস্ত্রীর সাথে বকবক করছে। আমিও স্নান সেরে পাজামা আর পাঞ্জাবি গলিয়ে নিলাম।
–” আয়, এইখানে ফ্যানের হাওয়ায় একটু গড়াইয়া নে দুইদন্ড। ভাজি, রুটি আর চা খাইয়া নিয়া রওনা দিমু নে। “
এই ধ্রুবদাকে দেখে কে বলবে যে ইনিই আজ সকালেও এতো কঠিন করে কথা বলেছেন!
–” স্নান কইরা কেমন লাগলো? “
প্রশ্নটা করে আমার মুখের দিকে তাকালেন। বুঝলাম, এখন অনেকটা পথ একসাথে যেতে হবে ভেবেই নিশ্চয়ই ধ্রুবদা রূপ বদল করেছেন।
–” খুব ভালো স্নান করলাম। শরীরটা একদম ঝরঝরে হয়ে গেছে। “
যে মিস্ত্রিটা এসে আমাদের দু’জনের খাটিয়ার ওপর একটা করে তক্তা পেতে দিয়ে গেলো, ছেলেটাকে আমি এখানে গতবারও দেখেছিলাম। ছেলেটার সেই কথাটা মনে আছে কিনা কে জানে, আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে উনুনের দিকে চলে গেলো।
— ” আরে ধ্রুবদা না? আরি ব্বাপস, প্রদীপদাও এইসেচেন দেকচি? মায়ের মন্দিরে এইসেচিলেন? “
–” আরে সাজানভাই? তুমি এইখানে? “
ধ্রুবদার প্রশ্নের উত্তরে সাজানদা মুচকি হাসলেন। সাজানদা একজন ট্রাক ড্রাইভার। আমাদের নির্মীয়মান বহুতলের সাপ্লায়ার বাবু ঘোষের হয়ে স্টোনচিপসের ট্রাক নিয়ে আসেন।
–” আমি তো এই রামপুরহাটের থেকেই পাথর নে যাই রোজ। রামপুরহাট, নলহাটি, পাচামি, এসব জায়গার পাথরখাদানই তো আমাদের মতুন টেরাক ডাইভারদের ঘরবাড়ি গো, ধ্রুববাবু। “
–” তাই? এখানে তুমি রোজ আসো সাজান দা? তাহলে তো তোমাদের ট্রাকে করেই দিব্যি চলে আসা যায় তারাপীঠে! “
–” যায় না কে বলিচে শুনি? বাবুদারে কতোবার নে এইচি না? আসার সুময়ে নে এইচি ফের ফেরার পতে তুইলে নে গেচি। “
–” তোমার কি মাল লোড করা হইয়া গেসে গা? “
–” হ্যাঁ গো দাদা, এইতো সবে লোড দে এলুম। চেহারা দেইকে বুজতি পারতেচো না? কেমুন পাথরের ধূলোয় ভূতের মতন দেইকতে নাগতিচে! “
–” তুমি কি অহনে কইলকাতা ফেরবা নি? “
–” হ্যাঁ গো, ইস্নান টিস্নান সেইরে দু’দন্ড গইড়ে নে রওনা দেবো। আপনারাও কি ফিরতেচেন নাকি? “
–” হ্যাঁ গো সাজানদা। ওই রিক্সাটাকে নিয়ে সোজা স্টেশন। তারপর ট্রেন ধরে –“
–” টেরেন ধইরবেন কেন? আমার ট্রাকে কইরেই চলেন, গল্প করতি করতি চইলে যাবো নে।”
–” ঠিকই তো। ফালতু ফালতু ট্রেনে যাওনের কী দরকার? সাজান ভাইয়ের লগেই যাই গা, তাই তো রে ভাই, না কি তুই কী কস ক। “
আর কী কস! পেট ভরে দই, রুটি, আলুভাজি আর বড় কাঁচের গ্লাসভর্তি চা খেয়ে ‘জয় মা তারা ‘ বলে শাহজাহান ড্রাইভারের পেছনের সিট দখল করে জানালায় মুখ বাড়িয়ে ডাক দিলাম।
— ” আরে চলেন কেনে গো ধুববাবু, কিন্তুক আপনার কোমরের ব্যথার কতা মা তারারে জাইনে রেকো গো।”
ধ্রুবদা খালাসীর পেছনের সিটে বসে হুঙ্কার ছাড়লেন –‘ জয় জয় মা ত্তারা ‘
সাজানভাই সিটে উঠে তার দিকের গেট বন্ধ করে সেলফ চেপে ধরলেন। গাড়ি গোঁ গোঁ করে চলা শুরু করলো।