সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৪)

পদাতিক
পৃথিবীর পান্থশালায় সেই কোন সূর্য ওঠার কাল থেকে সারা গায়ে, হাতে পায় বহুবর্ণ ধুলো মেখে পদাতিকের মতো হেঁটে চলেছি, কিন্তু সেরকম কিছু জানতে পারলাম কই? সঙ্গী সাথীদের জানার পরিধির কাছে আমি বারেবারেই নত হয়েছি। কুন্ঠিত হয়েছি এটা ভেবে যে, সত্যিই আমি কতো কিছুই জানি না, অথচ…
যে টিম নিয়ে আমরা মন্দারমণি এসেছিলাম ইয়াস বিদ্ধস্ত মানুষজনের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, আমাদের সেই টিমের একজন সদস্য প্রদীপ্ত। কবিতা লেখে, কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশনের চাকুরে, হাওড়া জেলার অধিবাসী। ওর একটা কথায় চমকে উঠলাম।
–” আপনার সাথে তো সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের ভালো বন্ধুত্ব আছে, তাই না? ”
বলরামবাবু অফিসঘরের চেয়ারে হেলান দিয়ে চায়ে চুমুক দিতে যাচ্ছিলেন। প্রদীপ্তের প্রশ্নে ওর মুখটাতে যেন সামান্য আলো খেলে গেলো।
— ” আপনি কি আগে কোনোদিনও এখানে এসেছিলেন?”
–” না তো! আমি আসলে দাদাগিরিতে আপনাকে দেখেছিলাম। সেখানেই শুনেছিলাম যে আপনার সাথে -”
দাদাগিরির কোন এপিসোডে প্রদীপ্ত বলরামবাবুকে দেখেছিলো জানি না, কিন্তু টিভির রিয়ালিটি শোতে মেক আপ নেওয়া একজন মানুষকে সামনাসামনি দেখে চিনে ফেলা তো সাধারণ বিষয় না। আমি বোকার মতো জিজ্ঞাসা করে বসলাম — ” কোন দাদাগিরিতে? সৌরভের? ”
— ” হ্যাঁ গো প্রদীপদা, বেশ কিছুমাস আগেকার একটা এপিসোডে আমি এনাকে দেখেছিলাম। সেখান থেকেই তো এই অনাথ আশ্রমের কথা, দাদার সাথে বিভিন্ন গুণীজনেদের ঘনিষ্ঠতার কথা শুনেছিলাম। ”
প্রদীপ্তর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আমার এতোদিনের চেনা প্রদীপ্তকে খুঁজে ফিরছিলাম। এই কি সেই প্রদীপ্ত? যে প্রদীপ্ত সময়মতো গুছিয়ে কথাও বলতে পারেনা, সাধাসিধা, প্রয়োজনহীনভাবে হাসিমুখে সবারসাথে অনর্গল কথা বলে যায়?
–” হ্যাঁ, তিনি আমাদের এই আশ্রমেও কয়েকবার এসেছেন। খুব ভালো মানুষ। প্রাণখোলা। আড্ডা মারতে বসলে কোত্থেকে যে সময় কেটে যায় কে জানে? আমাকে খুব স্নেহ করেন। ”
— ” বাবা, ডাইনিং এ এনাদের জলখাবার দিয়েছি। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, এনারা কি আজ থাকবেন না কি আজই রওনা দেবেন? ”
একদম সাধারণ একটা শাড়ি পড়ে একজন যুবতী বলরামবাবুকে উদ্দেশ্য করে সম্ভবত আমাদের দিকেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন।
— ” না না, আমরা এখুনিই রওনা দেবো। এখন না রওনা দিলে বাড়ি ফিরতে –”
আমার কথাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা।
–” জ্যেঠু, সারাদিন ধরে খেটেছেন আপনারা। সামান্য একটুই জলখাবার দিয়েছি। হাতেমুখে একটু জল দিয়ে খেয়ে নিন। শরীরটা নিয়েও তো ভাবতে হবে। ”
কথাগুলো অনুরোধের সুরে বললেও কেমন যেন একটা অভিভাকতত্বের সুর বেজে উঠলো। বুঝলাম এ কথাকে মান্যতা না দিলে অন্যায় করা হবে। যুবতীর ভেতরে শহুরে চটক নেই, অথচ ঠিক গ্রাম্যও বলা যাবে না। সবাই মিলে অফিসঘর আর ডাইনিংএর মাঝে একটা লম্বা বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে এসে বসলাম। ডাইনিং রুমের সার দেওয়া টেবিলের দুপাশে ছটা করে চেয়ার। আমরা ছজন এসে একটা টেবিলে বসলাম।
বুঝলাম ডাইনিং রুমের দায়িত্বে বেশ কিছু মহিলাকে রাখা আছে। তখনও জানি না, যিনি আমাদের খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন তিনি দাদার বড় মেয়ে, ওই মহিলাদের মধ্যে একজন অল্প বয়সী স্ত্রীলোক, যিনি পরম যত্নে টিফিন বেড়ে দিলেন তিনি দাদার ছোট মেয়ে, অন্য যারা রান্নাঘরের উনুন সামলাচ্ছেন, বাসনকোসন পরিষ্কারের কাজ করছেন, রাতের খাবারের জন্য ডাই করা সবজি কুটছেন, তাদের সবার সন্তানেরাই এই আশ্রমের আশ্রমিক।
একজন বয়স্কা মহিলা বছর দুয়েকের একটি শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে এসে দাঁড়ালেন। দাদার বড়ো মেয়ের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞাসা করলেন — ” ময়না, সবার টিফিনের সময় হয়েছে ? ”
— ” হ্যাঁ, মা। এই জ্যেঠুরা কলকাতা থেকে মন্দারমণিতে ত্রাণ দিতে এসেছিলেন। এনাদের টিফিন খাওয়া হয়ে গেলেই টিফিনের ঘন্টা বাজাবো। ”
একটা সাধারণ সুতির ছাপা শাড়ি পড়ে ইনি তাহলে দাদার স্ত্রী! আমি অবাক হয়ে দেখে যাচ্ছিলাম যে একজন মানুষের কতোটা ডেডিকেশন থাকলে তিনি নিজে ও তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে গড়ে তুলতে পারেন এই বিশাল কর্মযজ্ঞ। অথচ কী সাধারণভাবেই না তিনি নিজে ও পরিবারের বাকী সবাই মিশে রয়েছেন পিতৃমাতৃহীন, কুলশীলহীন অনাথ শিশুদের মাঝে।
এনাদের কর্মকান্ডের কিছুটা হদিস পেতে জিজ্ঞাসা করলাম –” আচ্ছা, এই আশ্রমে মোট কতোজন আশ্রমিক শিশু আছে? ”
দাদার বড়ো মেয়ে এগিয়ে এলেন – জ্যেঠু, এই পাঁউশিতে আমাদের দুটো শাখা আছে। এটা ছাড়াও, যে খালটা পেরিয়ে এখানে এলেন, তার ডানদিকে একটু এগোলেই আমাদের শুধু মেয়েদের থাকার হোম। এই দুটো শাখা মিলিয়ে প্রায় একশো বিয়াল্লিশ জন আশ্রমিক আছেন।”
বিস্মিত হওয়ার তখনও কিছু বাকী ছিলো। সন্ধ্যার আশ্রম আলোকমালায় সেজে উঠেছে। দলে দলে শিশুকিশোরেরা হাতে খোপকাটা স্টিলের থালা নিয়ে ডাইনিং হলে এসে জড়ো হচ্ছে। কথার ফাঁকে কখন যে টিফিনের ঘন্টা বেজেছে খেয়াল করিনি।
ক্রমশ