গল্পেরা জোনাকি তে প্রদীপ গুপ্ত

কমেন্ট
উফফ, এতক্ষণে গৌতমী একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলো। বাব্বা, এই সকালটাতে ওর যা ঝক্কিঝামেলা যায় সে আর কহতব্য না। দাঁতটাও ব্রাশ করতে পারেনা ঠিকমতো। সুপ্রিয় রোজ রাতের বেলাতেই শোয়ার সময় গৌতমীকে আলতো করে কাছে টেনে নিয়ে বলবে,
“– কাল তোমায় চা করতে হবে না ডার্লিং, আমিই ঠিক চা করে এনে তোমার সামনে টিপট থেকে চা ঢালতে ঢালতে তোমায় গুড মর্নিং বলবো তুমি দেখো। ”
কিন্তু ব্যাস, ওই পর্যন্তই। সকাল থেকে ওকে ডাকতে ডাকতে মুখে ফেনা উঠে যায় ওর। কিছুতেই বিছানা থেকে ওকে তুলতে পারেনা গৌতমী। যত বারই গিয়ে ডাকে –” কিগো, উঠবে তো! ” ততবারই সুপ্রিয় পাশের বালিশটাকে দিয়ে মুখটাকে ঢেকে বলে উঠবে –” আর পাঁচটা মিনিট প্লিজ, ঠিক পাক্কা পাঁচটা মিনিট। আমায় ডাকতে হবেনা তোমার, আমিই উঠে পড়বো। ”
এর ভেতর সুপ্রিয়া উঠে পড়েছে। ওকে দাঁত ব্রাশ করিয়ে বাথরুম করিয়ে, স্নান করিয়ে, স্কুল ব্যাগ গুছিয়ে দিয়ে ওর মুখের সামনে দুধ আর ওট ধরিয়ে দিয়েছে গৌতমী।
—” রোজ রোজ এই দুধ ওট খেতে কারো ভালো লাগে মামনি? একটা দিনও কি অন্য কিছু দেওয়া যায় না? সব্বার মা কি সুন্দর পরোটা, কড়াইশুঁটির কচুরি, আরও কত কিছু করে দেয় সকালবেলা। তুমি শুধু ওই দুধ আর ওট। ধুস ভাল্লাগেনা। ”
–” হ্যা দেখিতো সব বেলুনগুলোকে। মা গুলো সব গণ্ডেপিণ্ডে গেলাবে আর টুনটুনির মতো ফিগার বানাবে তারপর ষোল সতেরর পর শ্রীদেবীর মতো ফিগার বানাবার নামে না খাইয়ে রাখবে। তুমি বোঝনা এই চোদ্দতেও তোমার ফিগার কি সুন্দর রয়েছে এখনো? ”
–” টিফিনে কি দিয়েছো শুনি? ” সুপ্রিয়া জিজ্ঞাসা করে।
–” কি আবার! আপেল, মুসুম্বি আর আমন্ড –”
–” ধুস মামনি। তুমি যে —, থাক, আমি কি আর কিছু বুঝিনা! আসলে খাটনি কমানোর জন্য, –”
এর ভেতরেই সুপ্রিয়ার পুলকারের হর্ণ বেজে ওঠে। ব্যাগটা পিঠে গলাতে গলাতে পায়ে পামশু টাকে গলাতে থাকে সুপ্রিয়া।
–” বাই মামনি, আমার সোনা মাটা -” গৌতমীর গালে আলতো করে গাল ছুঁইয়ে দৌড় লাগায় সে।
গৌতমী সিঁড়ি দিয়ে সুপ্রিয়ার নেমে যাওয়ার শব্দ শোনে। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। টাটা সুমোর শরীরে ঢুকে পড়ে সুপ্রিয়া।
— ” কিগো উঠবে এবার নাকি? সাড়ে আটটা বেজে গেছে কিন্তু ”
ধড়মড় করে উঠে বসে সুপ্রিয়। —” ক্কি কি বললে? কটা বাজে? মেয়ে চলে গেছে নাকি স্কুলে? ”
–” তা যাবেনা? তূমি কখন উঠবে তার জন্য বসে থাকবে? ”
–” এই দেখো, কাল রাত্তিরে ভেবে রেখেছিলাম যে আজ –”
–” মেয়ের জন্য পরোটা বানিয়ে দেবে। রোজ মেয়েটা বায়না করে পরোটার জন্য, তাইনা? ”
সুপ্রিয় হেসে ওঠে। — ” তুমি না সত্যিই একটা –”
–” অলপ্পেয়ে, কিম্ভুত, বিচ্ছু, আর —”
সুপ্রিয় বিছানা ছেড়ে উঠে এসে গৌতমীকে জড়িয়ে ধরে –” আমার সোনা বউ।”
ওর স্নান করার ভেতর গৌতমী গতকালের সবজি আর ডালটাকে ফ্রিজ থেকে নামিয়ে মাইক্রোওভেনে ঢুকিয়ে দেয়। সিটি মারতে থাকা ভাত চাপিয়ে দেওয়া প্রেশারকুকারটাকে সিঙ্কের ভেতর উলটে দিয়ে ফ্রাইংপ্যানে তেল ঢালে ফ্রিজ থেকে বের করে রাখা মাছটাকে ভেজে নেওয়ার জন্য।
( দুই)
সুপ্রিয় অফিস বেড়িয়ে গেছে। এতক্ষণে যেন একটু শান্তি পেলো গৌতমী। একোয়াগার্ড এর তলায় বালতিটাকে পেতে মেশিনটাকে ছেড়ে মোবাইলটাকে টেনে নেয় গৌতমী। সংসারের বাইরে এ টুকুই তার দুনিয়া। শান্তির দুনিয়া। বছর তিনেক হবে ফেসবুকে নিজের প্রোফাইল খুলেছে সে। কলেজ জীবনের পর থেকে হারিয়ে যাওয়া গল্প লেখার অভ্যাসটাকে সে আবার খুঁজে পেয়েছে এই ইন্টারনেটের দুনিয়ায়। সুপ্রিয় এটা নিয়ে ওকে কোনদিনও কিছু বলেতো নিই উলটে ওকে উৎসাহ দিয়েছে। প্রথমে কিছু লিটিল ম্যাগে ছাপার পর ওর লেখা এখন এদিকওদিক দু একটা বাজারি পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছে। সুপ্রিয়ই হাতে করে নিয়ে পত্র পত্রিকার অফিসে অফিসে জমা দিয়ে আসে সেসব গল্পের পান্ডুলিপি।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি নেট কানেক্ট করে গৌতমী। এরপর ফেসবুক ওপেন করে। কাল রাত্তিরে একটা খুব ইন্টারেস্টিং গল্প পোষ্ট করেছে ও। রাতের ভেতরেই একশো ছাড়িয়ে লাইক পড়ে গেছে গল্পটাতে।অনেক কমেন্ট। প্রায় তিনহাজার বন্ধু ওর ফেসবুকে। কোন কিছু একটা পোষ্ট করলেই হুড়মুড় করে লাইক আর কমেন্টের বন্যা বইতে থাকে। খুব মজা লাগে গৌতমীর। লেখাটা কিরকম হলো সেটা জানার জন্য আর দীর্ঘকাল অপেক্ষায় থাকতে হয় না। কি সুন্দর সাথে সাথেই —
একশো সাতষট্টিটা লাইক। আর অজস্র কমেন্ট। ধীরেধীরে কমেন্ট গুলো পড়তে থাকে সে। সেই একই মুখেদের ঘোরাফেরা। সেই বাঃ, সুন্দর, অপূর্ব, অসাধারণ এর ভিড়।
কে যেন একটা কমেন্ট করছে। একটা নীল ব্লকের ভেতর তিনটা সাদা বিন্দু সমানে নাড়াচাড়া করছে।
গৌতমীর হঠাৎ জলের বালতির কথা মনে পড়ে। কিন্তু ওদিকে সাদা বিন্দুগুলো সব ঘনঘন নাড়াচাড়া করছে। কে যেন বেশ একটা বড় কমেন্ট লিখছে। একটু পরে যাচ্ছি। সে নিজের মনেমনেই বললো। এর ভেতরে আটটা লাইক পড়ে গেছে স্টেটাসে, একটা অপূর্ব আর একটা অসাধারণ কমেন্টও। কিন্তু সেই সাদা ফুটকিগুলো গৌতমীর চোখের সামনে নেচেই যাচ্ছে। লেখাটা কার হতে পারে? অনুমান করার চেষ্টা করে ও। সুদীপ্তার? হতেও পারে। এরভেতর যে কটা লাইক পড়েছে তার প্রথমেই সুদীপ্তার লাইক ছিলো। আর এছাড়া ওর কমেন্টও বেশ অনেকটাই হয়। তাহলে সুদীপ্তারই হবে। একোয়াগার্ডটাকে বন্ধ করবে বলে উঠে দাঁড়ায় গৌতমী। হঠাত স্ক্রিনে সুদীপ্তার নাম ভেসে ওঠে। সুদীপ্তা লিখেছে। ফের বিছানায় বসে পড়লো গৌতমী। অন্যান্যবারের মতোই বেশ সুন্দরভাবে গুছিয়ে লিখেছে সুদীপ্তা। কিন্তু যেটুকু লিখেছে তাতে এতটা সময় লাগতে পারেনা। ওদিকে নীল ব্লকের বুকের ভেতর সাদা বিন্দুগুলো তখনো বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গীতে নেচে চলেছে। নাহ, এরকম অবস্থায় সে কক্ষনো পড়েনি। একের পর এক লাইক, একের পর এক কমেন্ট ফুটে উঠছে স্ক্রিনে কিন্তু সেই নাচ থামছে না কিছুতেই। ওই তিনটি সাদা ফুটকি ওকে সম্মোহিত করে ফেলেছে। ওর ধ্যান জ্ঞান বাহ্য অবস্থা তখন এক ফুটকিতে নিবদ্ধ। ওর চোখের সামনে তখন শুধু নৃত্যরত ফুটকি আর স্বপ্নের নীল রঙ। কে লিখছে এতোবড় কমেন্ট, কে সে লোক? সে কি ওর লেখা গল্পের উত্তরে ফের একটা গল্প লিখে পাঠাচ্ছে? ও আর কিছু ভাবতে পারছেনা। ওর চিন্তা চেতনা জুড়ে তখন শুধু —
হঠাৎ করে ওর পায়ের পাতায় একটা শীতল পরশ। কেমন যেন জলীয় স্পর্শ। ও ডান পা টাকে বাঁ পায়ের শাড়িতে মুছে ফের মেঝেতে রাখতেই —–
ওই যাঃ, এগুলো কি? নীচের দিকে দৃষ্টি মেলে গৌতমী। এ কি এতো জল এলো কোত্থেকে? মুহূর্তে চেতনা ফেরে ওর।
” একোয়াগার্ড? ”
নিজের মনেই চেঁচিয়ে ওঠে গৌতমী।
” দেখেছো কান্ড! ও মাগো আমি এখন কি করি? ” কঁকিয়ে ওঠে গৌতমী। ” নিকুচি করেছে ফেসবুকের!
জল ততক্ষণে রান্নাঘর, ড্রয়িংরুম ভাসিয়ে বেডরুমেরও দখল নিয়েছে। আর মোবাইলের স্ক্রিনে তখনো —