সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৩১)

বাউল রাজা
প্রদীপ গুপ্ত (তৃতীয় খণ্ড)
গানটার অনেকটাই চেনা লাগলেও অনেকটাই অচেনা মনে হলো। যাই হোক, রওনা দিয়েছিলাম ব্যাঞ্জন রাঁধবো মনে করে, কিন্তু সে মনে করায় বুঝিবা ছেদ পড়ে সেই ভাবনাতেই যেন সারাদিনের শেষে ক্ষুধাবোধ জাগ্রত হলো।
— তোরা এগো না কিষ্ণা, আমি বিশু বাউলকে নে আসতিছি। ওর জন্যেও একমুটো চাল ডাল হাঁড়িতে ডালিস। আর শোন এই নে বেগুনটা ধর দিকিনি। আর এই নে, এ টাকাটা ধর, তকন তেকে কোঁচড়টাতে যেন আগুন জ্বেইলে দিয়েচে।
সবে এগোতে যাবো, এমন সময় ফের বাধা।
— আরে, ও কানাইসখি টুকুসকানি দেঁইড়ে যাও, এ পোড়ার চোক কতোদিন দেকেনি আমার পরাণসখিকে।
— পোড়ার কপাল আমার, সকি সকি কইরে যেন হেঁদিয়ে মরচে। যকন অতই সকি বলে ডাকার ইচ্চে ত্যাকন আকড়াতে নিয়ে গে রাখলিই পারো কয়েকদিন। পেচন পেচন এসো তাড়াতাড়ি, আমার ঠাকুরকে আজ সারাদিনের তরেও ভোগ নিবেদন করা হয়নি।
— বাউলের আবার ঠাকুর কিসের রে? তুই তো দেকচি জাত খোয়াবি।
— এই তো হাসালে গো বিশুদাদা, বাউলের আবার জাতবেজাত কি? কোন বাউল কোন জাতের বল দিকিনি?
আমি এতোক্ষণ শুধু দুজনার খুনসুটি শুনছিলাম। হঠাৎই বোকার মতো জিজ্ঞাসা করে বসলাম, বাউলের যদি জাত না থাকবে তবে ধম্মও নেই, তাহলে বোস্টোম বোষ্টুমিদের ভেতর যারা বাউল ভেক ধরেন তারা তাহলে কোন জাত?
এতোক্ষণে বিশু বাউল আমাদের ধরে নিয়েছেন। বেশীরভাগ বাউলদের চেহারার ভেতর একটা স্বাভাবিক রুক্ষতা দেখা যায়। তার বিভিন্ন কারণ থাকে, প্রথমত তাদের কপালে বেশীরভাগ দিনই সেরকম শাকসবজি, ফলমূল, জোটে না, ওদের দিনরাত তামাক সেবনের ফলেও এটা হতে পারে, এদের প্রসাধন বলতে শুধু সস্তা দামের সাবান আর চুলের জন্য সর্ষের তেল। তামাক খাওয়ার কারণে স্নানটানেও টান ধরে।
কিন্তু এই বিশু বাউল কিন্তু বাউলদের ভেতরে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। সারা শরীরে লাবণ্য যেন উপচে পড়ছে। তারওপর চোখে রিমলেস চশমাটা যেন আভিজাত্য প্রদর্শনের একটি সুন্দর বিজ্ঞাপন।
— বাউলদের সত্যিই কোনো জাত থাকেনা, বাউলরা একটা সম্প্রদায়, কিন্তু তাই বলে এটা ঠিক, বাউলরা বৈষ্ণব নন। তারা পরম বৈষ্ণব। শাক্ত নন কিন্তু পরম শাক্ত, শৈব নন তবুও পরম শৈব।
এতোক্ষণে কানাইদা একটা গান ধরেছেন, চেনা গান। সম্ভবত লালনের —
জাত গেলো জাত গেলো বলে
এ কি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজী
সবই দেখি তা না না না।
আসবার কালে কি জাত ছিলো
এসে তুমি কি জাত নিলে
কি জাত হবা যাবার কালে
সেই কথা ভেবে বলো না।
ক্রমশ