সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা
দ্বিতীয় খন্ড (দ্বিপঞ্চাশৎ পর্ব)
দাওয়ার কুলুঙ্গিতে রাখা লম্ফটা দপদপ করে জ্বলছে, আর কালো ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়ে যাচ্ছে বারান্দার খড়ের চালার দিকে। দাওয়ার পূর্বকোণে ছুটকি বসে বসে একমনে হ্যারিকেনের কাঁচ খুলে পরিষ্কার করছে। শেষে হ্যারিকেনটাকে জ্বেলে লম্ফটাকে নিভিয়ে দিয়ে দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে গিয়ে বসলো।
সাধুবাবা ইতিমধ্যেই চলে গেছেন। কানাইদা তখনও উঠোনে পাতা আসনে বসে একমনে একতারায় পিড়িং করে যাচ্ছেন। আর ধ্রুবদা বাঁ হাতের ওপর ভর করে বসে, আকাশের দিকে তাকিয়ে কী জানি কীসব আকাশপাতাল ভেবে চলেছেন।
আমি বাড়ি ঢোকার আগেই কৃষ্ণভামা এসে হাত-মুখ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে রান্নাঘরে এসে ঢুকেছে।
–” আমরা কিন্তু কাইল ভোরেই.. “
–” কেনে গো, কাল বাদ পরশুদিনই না হয়… “
— ” না গো কানাইদাদা, অহনে সাইটে একজনও নাই, আমি না গেলে কাজকাম সবকিছু বন্ধ হইয়া যাইবো গা। “
–” তোমরা এলে যেন একটা সুন্দর সুবাস পাই গো, তোমরা সেই সুবাস সাতে নিয়ে আসো। সময়টা যে কীভাবে কেটে যায় মালুম পাই না। “
–” হেইডা তোমার মনের বাস গো। তোমার মনের ফুল বাগানে তো বারোমাসি ফুল ফোটে গো কানাইদা। “
এটাই ধ্রুবদা। কখন যে কীভাবে কোন কথাটা বলে দেবে, সেটা সম্ভবত সে নিজেও জানে না।
–” নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে
তারি মধু কেন মনমধুপে খাওয়াও না
নিত্য সভা বসে তোমার প্রাঙ্গণে —
আহা — কী সুন্দর করেই না বললে গো ধুবদাদা, মন একেবারে মইজে দিলে গো। “
গানটা বেশ ধরেছিলো অন্ধ বাউল। কিন্তু এখন সে গান শোনা বুঝি কপালে নেই। দাওয়ায় পাত পড়েছে। ছুটকি ইতিমধ্যেই একটা ন্যাতা দিয়ে মুছে দাওয়ায় বসার আসন পেতে রেখেছে। সেখানে এখন গরম ভাতের ধোঁয়া উড়তে দেখা গেলো।
কৃষ্ণভামা নিঃশব্দে এক এক করে থালা বেড়ে দিচ্ছে। চোখের ইশারায় আমায় খেতে ডাকলো। ছুটকি নিচে নেমে এসে বললো –” রাতের ভাত বেইড়েচে, খেতে চলো সবাই। “
দাওয়ার নীচে সিঁড়ির পাশে লোহার বালতিভরা জলে হাতমুখ ধুয়ে, আসনে গিয়ে বসলাম। মুগ ডাল, আলু সেদ্ধ মাখা, কলমী, কুমড়ো আর আলু দিয়ে তৈরি তরকারি আর ধোঁকার ডালনা। পেতে রাখা তিনটে আসনে আমরা তিনজন। কানাইদা থালার থেকে অল্প কিছু ভাত উৎসর্গ করে পাতে ডাল ঢাললেন।
ছাতিমগাছের পাতার জাফরির ফাঁক গলে চাঁদের আলো সিঁড়ি দিয়ে উঠে দাওয়ায় এসে পড়েছে। মনে হচ্ছে যেন আমরা এই পাঁচজনই না, চাঁদকে নিয়ে আমরা এখন মোট ছ’জন। পিঁড়ে পেতে দিলেই হলো, সে যেন এসে সেই পিঁড়েতে আসন পেতে খেতে বসবে।
–” বুইজলে গো পদীপদাদা, ও কেমন লোভা দেকেচো! আমার উচ্ছগগো করা খাবার কেমন লোভার মতো খেতে এয়েচে! “
আমি চমকে উঠলাম। সেই মুহূর্তেই ছাতিমগাছের পাতাদের ভেতর দোলা লাগলো। আর সেই দোলায় কী বিচিত্রভাবেই না দুলতে লাগলো চাঁদের আলো! মনে হলো যেন, কানাই বাউলের কথা শুনে তিনি খুশীতে লুটোপুটি খাচ্ছেন।
— “আমি কিন্তু কাইল ভোর না হইতেই হাঁটা লাগামু, তুই কি আমার লগে যাবি না কি কাইল থাকবি? “
হঠাৎ করে ধ্রুবদার কথায় এতোক্ষণ ধরে যে মায়ালোক গড়ে উঠেছিলো, সেটা ভেঙে খানখান হয়ে গেলো।
–” মানে? “
আমি যেন অযথাই একটু রূঢ়ভাবে জিজ্ঞাসা করলাম।
–” মানে আবার কী? তুই তো আর আমার লগে আসস নাই, কাজেই যাওনের সময়ও যে আমার লগেই ফিরবি এমন কোনো কথা নাই। ইচ্ছা করলে একলাও ফিরতেই পারস। “
একবার মনে করলাম বলি, যে তুমি একাই চলে যাও, কিন্তু সে কথা বললে ধ্রুবদার কথাই মান্যতা পাবে। কিছু না বলে চুপ করে খেতে লাগলাম।
–” ঠাকুর, তোমার মনে আচে কিনা জানিনে, গতবার কিন্তু আমি বারেবারেই বারণ করেচিলাম একেনে আসতে। বলেচিলাম একেনে মায়াবী কুহকজাল আচে। বলেচি কি না বলো দেকি, মনে পড়ে তোমার? ” বসে থাকা কৃষ্ণভামা বাঁশের খুঁটি ধরে দাঁড়ালো।
–” দেকো দিকি, অন্ন গহণের সময় কি এসব বেত্তান্ত না ওটালেই চলচে না রে পোড়ারমুখী! কতোবার বলিচি যে সব কতার মানে ধইরতে নেই। মুখ লাগাতি নেই সব কতায়? “
–” আমারই অন্যায় হইসে কানাইদা, এই সময় এই কথাটা তোলা আমারই উচিত হয় নাই। এইবারে সক্কলে চুপ করো দেহি –“
দাওয়ায় তাকিয়ে দেখি, ছাতিমের পাতার ফাঁকে পিছলে পড়া সেই চাঁদের আলো আছে ঠিকই, কিন্তু সে তার প্রগলভতা হারিয়ে ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে গেছে।
ক্রমশ