গ এ গদ্যে পাভেল ঘোষ

ঝালমুড়ি

“আইডিয়া”…..ডানহাতে একটা ছোট্ট তুড়ি মেরে ব্রিজেশ বলে উঠতেই আমাদের বাকী চারজনের চোখ চলে গেল ওর দিকে।
“আইডিয়া? কি আইডিয়া বৎস?ব্যক্ত করো এই সভায়…” উত্তমের এই নাটুকে ভঙ্গিমার আমরা সবাই খুব ভক্ত।আমাদের স্কুলে মাস পাঁচেক হলো জয়েন করেছে চার মূর্তি।এদের মধ্যে হীরা উত্তরবঙ্গ এবং বাকি ব্রিজেশ, আশরাফ ও অভীক আসে বর্ধমান থেকে।আমাদের আড্ডা জমে ‘ক্ষীর’ হয়ে ওঠে আসা যাওয়ার পথে ট্রেনের কামরায়।
ফেরার পথে ব্রিজেশের নতুন আইডিয়া শোনার জন্য তাই উদগ্রীব হয়ে পড়লাম সবাই।
দাড়িমুখে একগাল হেসে ব্রিজেশ জবাব দিলো, “একদিন স্টাফরুমে মুড়ি ফিস্ট করলে কেমন হয়?”
একহাত তুলে মুচকি হেসে অভীক জবাব দিলো, “ওয়াও, স্প্লেনডিড ব্রাদার.. বাট হুইচ ডে হ্যাভ ইউ ফিক্সড ?” অভীক আবেগপ্রবণ হলেই স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে ইংরেজি বলতে শুরু করে।
“মঙ্গলবার…” আশরাফ প্রস্তাব দিল।
উত্তম বিজ্ঞের মতো গম্ভীর হয়ে বললো, “তাই হোক বৎস…”
দেব এতক্ষন বাধ্য ছাত্রের মতো শুনছিলো।আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “কি পাভেলদা, মঙ্গলবার..আসবে তো?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, মাস্টারমশাই আসবে না ক্যান?”
পাশে দাঁড়িয়ে এতক্ষন নিভৃতে সব শুনছিলো কৈলাস।কথাটা কানে যেতেই ও হেসে উত্তর দিলো।
“কেমন আছো কৈলাস?”জিজ্ঞাসা করতেই একগাল হেসে উত্তর দেয় ও “ভালোই আসি..”
তবে ওর হাসির মধ্যে দীর্ঘশ্বাসটা চোখ এড়ায় না আমার। ট্রেনে বছর দুয়েক দেখছি কৈলাসকে।একটু চাপা স্বভাবের।
‘মন খারাপ করা’ এই মুখটা দেখলেই মনে হয় দুঃখটাকে জড়িয়ে ধরে দিব্যি আছে ও।
আসলে সমস্যা জর্জরিত জীবনটাকে টানতে টানতে আমরা সকলেই অপরের দুঃখের ভাগীদার হতে ভুলেই গেছি। অথচ এই সমস্ত প্রান্তিক দুখী মানুষগুলোকে ভালোবেসে একটু ‘খবর’ নিলেই ওরা বড্ড ‘আপন’ করে নেয় আমাদের।
“মাস্টারবাবুরা একখান কথা কই ?”কৈলাস সবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয়।
“একখান কেন?হাজারটা কও..” উত্তম খুব মুডে আছে দেখছি।সবেতেই বেশ হাস্যরস পরিবেশন করছে।
“কইসিলাম কি.. আমি যদি আপনাদের ঝালমুড়ি খাওনের দায়িত্বডা লই..”
কৈলাসের প্রস্তাবে আমরা সকলে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে কিছু বলার আগেই ও বলে বসলো..
“.দূরত্বের জন্যি আপনারা ভাববেন নি।সে আমি বুজে নেব খন।আর পয়সার কতা যদি কন, তাহলে বলবো আপনারা নিজেরা করলি যা খরস হবে তার থেকি আমি অনেক কম পয়সা নেবো।আমারে না করবেন না..”
ওর হাতজোড় করা করুন মুখটার দিকে তাকিয়ে বললাম, “না, কৈলাস, কটা পয়সার জন্য তোমার খুব কষ্ট হবে যে..”
“কইসি না মাস্টারমশাই,কষ্টই আমাদের জীবন..ওইডা নিয়া আপনি ভাববেন না।”
এরপর আমরা ‘না’ করতে পারিনি।
“তাই হবে কৈলাস”.. বলতেই ও হঠাৎ হাতজোড় করে একটা অনুরোধ করে বসলো সবার কাছে।
“তবে দাদাবাবুরা, আর একটা আর্জি ছেলো..”
“বলো কৈলাসদা”.. আশরফ বলতেই কৈলাস হাত কচলে বললো, “তারিকটা শুক্কুরবার করলে বড় ভালো হতো..”
“শুক্রবার কেন?”
অভি প্রশ্ন করতেই গম্ভীর হয়ে গেলো কৈলাসের মুখ।
“ও কিসু না বাবু, এমনি কইলাম।আমি আসলে শুক্কুরবার ট্রেনে উটি না।তাই…”
আমরা নিজেদের মধ্যে চোখ রেখে যতটুকু সময় নিলাম।সবার মুখ দেখে বুঝলাম,কারো শুক্রে দ্বিমত নেই।
“ঠিক আছে, শুক্রবারই এসো…”আমি কৈলাসকে বলতেই রসুলপুর চলে এলো।কৈলাস এই ট্রেনে বাড়ি ফেরে আমরা জানি।
ট্রেন থামতেই ও নেমে গেল।ঠিক ট্রেন ছাড়ার মুখে দেখি জানলায় কৈলাস।
“বাবু, ফাইপে কতগুলো সেলে পড়ে আপনাদের?”
“একশো কুড়ি-ত্রিশ হবে”…কেন?” ব্রিজেশ বলতেই ট্রেনটা ছেড়ে দিলো।কৈলাসকে আর দেখতে পেলাম না।
মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো কৈলাসের শুক্রবারের জন্য আকুতি আর ফাইভের ছাত্রসংখ্যা জানার আগ্রহটা।
শুক্রবার দেখতে দেখতে চলেও এলো। টিফিনের অনেক আগেই হাজির হয়েছে কৈলাস।সঙ্গে ওর একটা চেলাও এসেছে দেখলাম।কৈলাসের কাছে জানলাম ছেলেটার নাম বিট্টু।বয়স ষোল-সতেরো হবে।একটা বড় বস্তা নিয়ে এসেছে।জিজ্ঞাসা করতেই বললো কৈলাস, “ওতে মুড়ি আসে দাদাবাবু।”
“এত মুড়ি..!!” আমরা তো দেখে অবাক।
“আপনাদের ফাইপের কিলাসটা কোথায় বাবু?” আমি হাতের ইশারায় আট নম্বর রুমটা দেখিয়ে দিতেই কৈলাস বিট্টুকে আদেশের সুরে বলে, “বিট্টু তুই বাবুদের মুড়ি দিতে শুরু কর, আমি সেলেগুলার কাসে সাই..”
আমাদের স্টাফরুম ট্রেনের কামরা হয়ে উঠলো।ব্রিজেশ স্থানীয় একটা দোকান থেকে সবার জন্য সিঙ্গারা এনে প্রত্যেকের হাতে ধরিয়ে দিতেই আরো জমে উঠলো আমাদের অন্যরকম টিফিনবেলা। ঠোঙা থেকে সবাই মুড়ি খাচ্ছে আর নানারকম অভিব্যক্তির মাধ্যমে প্রত্যেকে নিজের খুশিকে ব্যক্ত করছে।ব্রিজেশের ‘আইডিয়া দারুন ক্লিক করেছে।এর মাঝেই আমার চোখ চলে গেল পঞ্চম শ্রেণীর কক্ষের দিকে।
‘কি করছে কৈলাস? একটু দেখি তো..’ মনে এই চিন্তা আসতেই চলে গেলাম চুপি চুপি আট নম্বর ঘরটায়।আমাকে কৈলাস যাতে না দেখে এমনভাবে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই ধরা পড়ে গেলাম ওর কাছে।
“বাবু বাইরে খাঁড়ায়ে আসেন ক্যান?ভিতরে আসেন।”
“এক্ষুনি ঘন্টা পড়বে কৈলাস।তোমার হয়ে গেলে তুমি চলে এসো।”
“আমার অনেকক্ষন হয়ে গেসে মাস্টারমশাই..ওদের সঙ্গে একটু কথা কইসিলাম।”কৈলাস ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলো।ওর চোখের কোনে চিক চিক করছে জল।তবে আনন্দে না কষ্টে বুঝলাম না।
“তুমি পয়সাটা নিয়ে যেও কেমন?” আমার কথায় কৈলাস তেমন আমল দিলো না।
“আপনি ট্রেনে দেবেন বাবু..”মাথা নিচু করে চোখের জল মুছলো কৈলাস।
এরপর স্টাফরুমে ঢুকে সবার উদ্দেশ্যে ‘আসছি মাস্টারবাবুরা’ বলে হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে বিট্টুকে ডেকে নিয়ে সেদিনের মতো বিদায় নিল কৈলাস।আমি হতবম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।ওর দ্রুত চলে যাওয়াটা ‘রহস্য’ থেকে গেল আমার কাছে।
ঘটনার তিন-চার দিন পর ট্রেনে বাড়ি ফিরছি সবাই।
“ব্রিজেশ এখনো অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছে পাভেলদা..” আশরফ বলতেই ব্রিজেশ ডানহাতে নিজের পিঠটা মুচকি হেসে চাপড়ে নিলো।ইতিমধ্যে ট্রেনটা মেমারি ঢুকতেই পল্টুকে দেখতে পেলাম আমরা।কৈলাসের বন্ধু ও।পল্টুর হাতের ‘ঘটিগরম’ এই লাইনে খুব বিখ্যাত।
“পল্টু, কৈলাসের কি খবর জানো? কদিন আসেনি দেখছি কি ব্যাপার?” আমি পল্টুর পিঠে হাত রেখে বললাম।
“আপনাদের স্কুল থেকে আসার পরেই কৈলাস অসুখে পড়েছে।” পল্টু জবাব দিলো।
“কেন?কি হলো ওর?” অভি ও আশরফ একযোগে বলে উঠলো।
“আমি বারণ করেছিলাম কৈলাসকে স্কুলে না যেতে…”
“কেন? স্কুল যাওয়ার সঙ্গে কৈলাসের অসুখের কি সম্পর্ক?” উত্তম প্রশ্নটা করতেই আমাদের প্রত্যেকের চোখ চলে গেল পল্টুর দিকে।
“শুক্রবার ছিল ওর ছেলের জন্মদিন।”
“আরে, বাঃ!চমৎকার।স্কুল থেকে ফিরেই ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে প্রচুর খাওয়া দাওয়া করে নির্ঘাত শরীর খারাপ করেছে কৈলাসদা!তাই তো..?” অভি ভুরু নাচিয়ে বললো।
“না, স্যার…!”পল্টুর মুখে একরাশ শূন্যতা আমাদের চোখ এড়ালো না।
“তাহলে কি ? বলো পল্টু….” আমি ঝড়ের পূর্বাভাস অনুভব করলাম।নিশ্চয়ই কৈলাসের এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত।
“কৈলাস ট্রেনে হকারি করছে দুবছর।তার আগে ও মুড়ি নিয়ে বসতো রসুলপুর হাই স্কুলের উল্টোদিকে।টিফিনের সময় ওর মুড়ি খাওয়ার জন্য ছেলে-মেয়েদের লাইন লেগে থাকতো।”
“তাহলে কৈলাসদা ওখান থেকে চলে এলো কেন?” ব্রিজেশ উত্তেজনা সামলাতে পারলো না।।
“বলতে দিন স্যার…”
“বলো বলো পল্টুদা..” আশরফ ইশারা করতেই পল্টু আবার শুরু করলো।
“কিন্তু কৈলাসের কপালে সুখ সইলো না জানেন..”
“কেন?” উত্তম মনোযোগী ছাত্রের মতো জিজ্ঞাসা করলো।
“ওর ছেলে ফাইভে পড়তো ওই স্কুলেই।টিফিন হলেই এক ছুটে রাস্তা পেরিয়ে বাবার কাছে ঝালমুড়ি খেতে আসতো ও।
কিন্তু হঠাৎ একদিন কৈলাসের চোখের সামনেই ঘটে গেল দুর্ঘটনাটা।বাবার কাছে আসতে গিয়ে একটা লরির ধাক্কায় ছেলেটা….”
“মারা গেল..!!!” অস্ফুট একটা স্বর বেরিয়ে এলো আমার মুখ থেকে বিস্ময়ে, বেদনায়।
“হ্যাঁ স্যার….” ঘাড় নেড়ে মাথা নিচু করে বললো পল্টু।বুঝলাম, চোখের জলকে সামলাতে পারেনি ও।
“ওই ঘটনার পর আর স্কুলের দিকে পা মাড়ায় নি কৈলাস।তারপর থেকে ও ট্রেনেই ঝালমুড়ি বেচে।আসলে সেদিন ঝালমুড়ির ফিস্ট শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি ও।আপনাদের স্কুলের পাঁচ ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে নিজের ছেলেকে খুঁজে পেতে চেয়েছিল কৈলাস।তাই ওর এত আয়োজন ছিল মাস্টারমশাই।”
আমাদের প্রত্যেকের মুখ থেকে কথা সরছিলো না।সবার চোখে মুখে স্বজন হারানোর ব্যথা।এমনও হয় মানুষের জীবনে!অথচ সদাহাস্য কৈলাসকে দেখে আমরা কোনোদিন আঁচই করতে পারিনি।হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলাম ওর বাড়ি যাবো।
মাথায় আসতেই জিজ্ঞাসা করে বসলাম পল্টুকে,”কৈলাসের বাড়ি কোথায়?” “আমবাগানে বিদ্রোহী ক্লাবের পিছনে স্যার..”পল্টু উত্তর দিতেই রসুলপুর স্টেশন চলে এলো।
দূর থেকে সুদীপদা আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, “রসুলপুর!কি ব্যাপার?”
হাত নেড়ে বললাম, “কৈলাসধাম যাবো.. ঠাকুর দর্শনে…”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।