সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ১৫)

বাউল রাজা
তৃতীয় খন্ড (পঞ্চদশ পর্ব)
তখন সবেমাত্র মন্দিরের সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি শেষ হয়েছে। পিটুলি তলার বাঁধানো বেদিতে ভক্তরা এসে সার দিয়ে মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে গেছে। সারাটা শ্মশান জুড়ে এক আশ্চর্য নীরবতা। দুষ্টু চন্দ্রমাও যেন সাজঘরে সাজতে বসেছে। না জানি শ্রীরাধিকের সখী সাজার বাসনা আজ ওকেও পেয়ে বসেছে। নীরবতা ভাঙলো একটা নূপুরনিক্বণের মৃদু আওয়াজ। হয়তোবা ক্ষেত্র প্রস্তুত করার বাসনায় কৃষ্ণভামিনী মাটিরবুকে পায়ের আঘাতে মৃদুমধুর ধ্বনিরাগ তৈরী করছে।
আমার মাথাতেও কেন জানিনা দুষ্টুমি খেলে গেলো। নাটকের ঢঙে মৃদুস্বরে বলে উঠলাম —
যেথা চাইবে প্রেমিক মন
সেখানেই তো বেন্দাবন।
হোক না সেটা শ্মশান বাসর
হোক না সেটা ঘরের কোণ।
পৃথিবীতে কতরকমের আশ্চর্যজনক ঘটনাই যে ঘটে যায় সেটা আমি সেদিনও আর একবার প্রত্যক্ষ্য করলাম। বাউলদিদির সাথে আজ এখানে আসার সময় কানাইদাকে যে সমস্ত ভক্তজনেরা ঘিরে রেখেছিলেন তারা ইতিমধ্যেই বেদীতে গিয়ে উপবেশন করেছেন। আর এর মধ্যেই একজন ভক্ত চোখ বন্ধ করে আড়বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে উঠলেন। আর আমার মনের ভেতর কেমন করে কে জানে ছেলেবেলায় শোনা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর দেওয়া গানটা বেজে উঠলো। কখন কোন অবচেতনে আমি গেয়ে উঠলাম–
মুরলী বাজে প্রেম বৃন্দাবনে
নব অনুরাগিণী শ্যাম সোহাগিনী
অভিসারে চলে রাধা বৃন্দাবনে
আজি মুরলী বাজে প্রেম বৃন্দাবনে —
কানাইবাউলের অন্তরের একতারায় যেন সুর বাঁধাই ছিলো। সে অপূর্ব দৃশ্য মনে পড়লে আজও আমার সর্বাঙ্গ শিহরিত হয়ে ওঠে। কানাইদার সর্বাঙ্গ জুড়ে রাধাভাব সঞ্চারিত হয়েছে। যেন কিশোরী শ্রীরাধিকে প্রেমভাবে আকুল হয়েছেন। কৃষ্ণমিলনে ব্যাকুলিত প্রাণ শ্রীকৃষ্ণ অদর্শনে ভাববিলাসী হয়েছেন। দুচোখে প্রেমাশ্রুর অনর্গল ধারা গণ্ডদেশ সিক্ত করে অবিরাম বয়ে চলেছে।
কৃষ্ণভামিনী এগিয়ে এসে গান ধরলেন —
কোকিল কুহু কুহু কহে তরুশাখে
মিলনে চলে রাধা মুখ শশী ঢাকে
সুরভিত বনতলে ফুল্ল কুসুমদলে
মোহিত অলিকুল গুঞ্জরনে
মুরলী বাজে মধু বৃন্দাবনে
গাইতে গাইতে বাউলনি যেন কানাইদার সাথে একাঙ্গি হয়ে গেলেন। সে যে কী অপূর্ব দৃশ্য, কী আলো — কী জোৎস্না সারাটা বন জুড়ে, আজও ভাবি অতো আলোর জোগান দিয়েছিলো কে? আর দুজনের কী অপূর্ব অঙ্গসুষমা। কী অপূর্ব ভঙ্গিমায় দুটো দেহলতা পরস্পরকে বেষ্টন করে আছে! সারা মুখভরে আছে মধুর হাসিতে অথচ দুচোখে অশ্রুর প্লাবন। অধরং মধুরম, বদনং মধুরম, মধুরাধিপতে মধুরম।
মধুঋতু বসন্তে কহে ব্রজনারী
হে প্রিয় সুন্দর, হে গিরিধারী
দাও প্রিয় দরশন, অন্তরে অনুক্ষণ
রাধার জীবনসখা মধু মিলনে
মুরলী বাজে প্রেম বৃন্দাবনে
আজি মুরলী বাজে মধু বৃন্দাবনে…
গান শেষ হয়ে গেছে সেই কখন, কিন্তু তার সুর ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। বাঁশরীর সুরে, ভক্তদের ঘুঙুরের তালে আর দুজন প্রেমিকের ভঙ্গিমায় সেই মূহুর্ত যেন আজও অক্ষয় হয়ে আছে সেই বনতলে। সেটা না বসন্ত না গ্রীষ্ম, কিন্তু আমার পরিষ্কার মনে আছে, সেই অলৌকিক সময়ে আমি সেই বনের সমস্ত বৃক্ষরাজিকেও বন্দনা করতে দেখেছি। কী বৃক্ষ জানি না, সে সব বৃক্ষের ডালপালা কি আদৌ পুস্পভারে আনত হয় কিনা সেসব জানার প্রয়োজনও নেই কিন্তু সেইসব বৃক্ষদের আমি পুষ্পবৃষ্টি করতে দেখেছি। সমস্ত অবলোকনই যে লৌকিক হবে তার যেমন কোনও মানে নেই, সেইরকমভাবে সমস্ত অলৌকিক ঘটনাও যে অবলোকিত হবেই তারও কোনও মানে হয় বলে আমি অন্তত মনে করি না।
( চলবে )