সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৪)

বাউল রাজা
তৃতীয় খন্ড (চতুর্থ পর্ব)
মুনসুবা মোড় থেকে সোজা দক্ষিণমুখো রাস্তা চলে গেছে মন্দিরের দিকে। কখনও কখনও রাস্তার ডানদিকে নয়নজুলি জুড়ে শালুক ফুল ফুটে আছে, তো কখনও রাস্তার বাঁদিকে পানিফলের দাম। বর্ষার জলে টইটম্বুর হয়ে রয়েছে নয়নজুলির গর্ভ। দুদিকেই আদিগন্ত ক্ষেতে হাঁটু সমান গাছে সবুজ ধানের শীষেরা হাওয়ার দোলায় চামর দুলিয়ে অনির্দেশকে হাওয়া করে যাচ্ছে, রাস্তার ডানদিকের চক্রবাল জুড়ে অস্তগামী সূর্যের আলোয় যেন দিগবালিকারা রঙের আলপনা এঁকে দিচ্ছে।
শরৎ শুরুর এই সময়টা গ্রামবাংলার রূপ যে দেখেনি সে বুঝি অমরার আনন্দের থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছে। মুনসুবা মোড় থেকে মন্দির প্রায় আট কিলোমিটার পথ। মনে পড়ছে প্রথমবার যেবার ধ্রুবদার সাথে এসেছিলাম, সেবার রিক্সা করে যাওয়ার পথে গোষ্ঠগোপাল দাসের বাবা বাউলক্ষ্যাপা আমাদের সাথে ছিলেন।
–” কিগো পদীপদাদা, হেঁটে হেঁটে কোত্থাকে চইলেন গঁ? আরে বসেন কেনে রিক্সায় পৌঁছাইন দি বটে। ”
দিগবালিকাদের কীর্তি দেখতে এতোটাই তন্ময় হয়ে ছিলাম, কখন যে উল্টোদিক থেকে সুবান ভাই রিক্সা নিয়ে সামনে এসে গেছে খেয়াল করিনি। প্রথমবার যখন একজন রিক্সাচালকভাই ধ্রুবদাকে নাম ধরে ডেকেছিলো, খুব অবাক হয়েছিলাম, তাঁর এতো বিপুল পরিচিতি দেখে। এখন ট্রেনে করে রামপুরহাট এলে এই রিক্সাচালক ভাইয়েরাই ধাবা পর্যন্ত নিয়ে আসে। ভাড়া তো পায় বটেই, সাথে রুটি তরকা, চাও খাইয়ে দিই। বিদেশ বিভূঁইতে কে যে কখন কোন উপকারে আসবে কেউ বলতে পারবে না।
কৃষ্ণভামার দিকে চাইলাম। চোখেচোখে বললাম — যাবে? ও মাথানেড়ে না করলো। বুঝলাম রিক্সায় গিয়ে এতোদিনকার সঙ্গহীনতার অভাবকে পাওয়ার আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে না বাউলনি। সুবানের দিকে মাথা নাড়লাম। ও প্যাডেলে চাপ দিলো।
— ” ঠাকুর, ওই শালুকফুলগুলোকে দেকো দিকি। ”
— ” কেন ওদের ভেতর আবার কী আবিষ্কার করলে তুমি? ”
— ” কী সুন্দর তাই না? ”
হঠাৎ করে কি বাউলনি ফুলগুলোর সৌন্দর্যকে খুঁজে পেলো? নাকি কিছু একটা কথা দিয়ে দুজনের ভেতর নীরবতাকে ভাঙতে চাইছে? ঝুপ করে সূর্যটা কখন হারিয়ে গেছে আকাশের বুক থেকে টের পাই নি। রাস্তার দুপাশের কাঁটা বাবলা, আকাশমণি আর ইউক্যালিপটাসের ডালগুলো পাখিদের কলকাকলিতে ভরে উঠেছে।
–” লাক্স সাবানের সুবাসটা কিন্তুক ভারী সুন্দর গো ঠাকুর, কেমন যেন কাচে টানে। ”
বুঝলাম, স্নান করার সময় যে সাবান মেখে স্নান করেছিলাম কৃষ্ণভামা তার সুবাসের কথাই বলতে চাইছে। কিন্তু ওই কথাটা, — কেমন যেন কাচে টানে! এ কথাটা বলার উদ্দেশ্যটা কী? ওর গ্রাম্য সরল মনে যে কথাটা এসেছে, সেটাই নিশ্চয়ই বলেছে বাউলনি। নিশ্চয়ই কিছু ভেবে বলেনি।
এখন, বড়শোল গ্রামের ভেতর দিয়ে চলেছি আমরা। এর ভেতর রাস্তাঘাটগুলোর বুকে কালো পিচের আস্তরণ পড়েছে। আগেকার মতো খানাখন্দে রাস্তার বুক ভরে নেই। বড়শোল বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। বাড়িতে বাড়িতে, রাস্তায় লাইটপোষ্টে ইলেক্ট্রিকের আলো জ্বলছে। বড়শোল পার করতেই একেবারে ঝুপ করে অন্ধকার এসে ঘিরে ধরলো আমাদের। হঠাৎ আমার বাঁ হাতটাকে আঁকড়ে ধরলো কৃষ্ণভামা। যেমন করে লজ্জাশীলা বুনো লতার ঝাড় শাল্মলিবৃক্ষকে জড়িয়ে থাকে সেভাবেই। আমার বাঁ হাত ওর বুকের স্পর্শ পাচ্ছে। সেই পরিচিত কাঁচা আমের বোঁটা নিসৃত অদ্ভুত গন্ধটায় আমার ফুসফুস ভরে যাচ্ছে । অস্বস্তি এড়াতে আমি আমার হাতটাকে সরিয়ে নিতে চাইলে ও যেন আরও ঘন হয়ে এলো আমার কাছে।
— ” ঠাকুর, একটা সত্যি কতা কইবে? ”
আমি চুপ করে রইলাম। ঘন অন্ধকারে আবিষ্ট দুটো শরীর। নারী সঙ্গের অভাব কোনোদিনও আমার হয় নি, কিন্তু এতো ঘনতর শরীরস্পর্শ আমি…
–” আমি বলাতেই তুমি আমার সাতে চলে এলে কেনো গো ঠাকুর? শুদুমাত্তর আমাদের আখড়া যাবে বলে নাকি আমায় বালোবাসো বলে সত্যি করে বলো দেকি? ”
আর সত্যি করে বলা, অন্ধকার যে এতো মোহিনী হতে পারে এর আগে সে অভিজ্ঞতা আমার ছিলো না। আমি কী উত্তর করবো? আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলাম — ভালোবাসার সাথে শরীরের সম্পর্ক কী বাউলদিদি? সূর্য আর চাঁদের ভেতর যে অমোঘ ভালোবাসার সম্পর্ক সেখানে কী ছোঁওয়াছুয়ির … ”
–” শোনো কতা, আমি দেকি তোমার তেকে শিকবো বলে পতের পানে হাঁ পিত্যেশ করে চেয়ে ছিলাম গো ঠাকুর। সূজ্জ আলো দে পশ্য না করলে চাঁদকে কে খুঁজে পেতো শুনি? আলোটাই তো তাঁর হাত, আলো মাকা দুহাত দিয়ে জইর্যে দরে বলেই না চাঁদের এতো গুমোর। ”
যাঃ বাবা, কোন কথাকে কোন কথা দিয়ে কাঁটলো মেয়েটা। আমি উত্তর দেবো কী?
— ” না, মানে দেখো ভক্ত যখন ভগবানের প্রেমে আকুল হয়, সেখানে তোমার ওই… ”
—” কী কতায় কি , না শাকপাতায় ঘি। শোনো সে বালোবাসা পাতকী জেবনের তেকে উদ্দারের জন্য বালোবাসা। সত্যি করে বলো দেকি, আমাদের দুজনের মদ্যে কে ভক্ত আর কে ভগবান? ”
সত্যিই তো, কী বেফাঁস কথাই না বলে ফেলেছি। এরসাথে কথা না বাড়িয়ে নীরব থাকাটাই শ্রেয়। ঘন অন্ধকারে একটা রমণী শরীর আমার জীবনে প্রথম স্পর্শে বুঝিয়ে দিতে ব্যাকুল যে, প্রেমের অস্তিত্ব কোনো বায়বীয় সম্পর্কের সাথে সম্পৃক্ত নয়। শরীর। একমাত্র শরীরই হচ্ছে ভালোবাসার মন্দিরে প্রবেশের চাবিকাঠি।
— ” ঠাকুর, তুমি গাঁয়ের পুকুরে নেয়েচো কোনোদিনও? ”
— ” কেন নাইবো না? ”
–” পানাপুকুরে? ”
–” হুঁ, নেয়েছি তো? ”
— ” মানুষেরা খুব বুদ্দিমান। ঘাটের কাচে একটা বাঁশ ফেলে রেকে পানাগুলোকে ঘটের তেকে একটু দূরে আটকে রেকে নাইতে নামে। বাঁশ টপকে পানারা আর ইদিকে আসতে পারেনা। পরিষ্কার টলটলে কালো জল। কীগো ভুল বললাম? ”
— ” না না, ভুল বলবে কেন? এভাবেই তো? ”
একটা রিনরিনে হাসির ঢেউ বয়ে গেলো বাতাসে। যেন দুহাত ভরা কাঁচের চুরির সুরেলা হাসি।
— ” অতচ, যকন নেয়ে উটবে, তকন দেকবে গা ভরে রয়েচে পানার বোঁটকা বাসে। কেনে গো ঠাকুর? পরিষ্কার জলে পানার গন্দ আসে কেন? ”
হঠাৎ ত্বরিতে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে ছিটকে সরে দাঁড়ালো বাউলনি। দূরে একটা আলোর বিন্দু। এতোটা দূর থেকেও কী ওই আলোয় পরিষ্কার বোঝা যাবে রমনীর দুটো লতানো বাহুতে আঁকড়ে রাখা একটা পুরুষ শরীরকে?
ক্রমশ