|| রথযাত্রা স্পেশাল – এ || লিখেছেন প্রদীপ গুপ্ত

মিউজিয়াম

মন্দিরের প্রবেশতোড়নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সুমন্ত্র। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রভু জগন্নাথদেবের মূর্তির দিকে। শুকনো, বসে যাওয়া দুচোখে একবিন্দু জলের অস্তিত্ব নেই, যেন অন্তরের পুঞ্জিভূত অভিযোগের আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে ওর দুচোখ দিয়ে। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে দেবতার দিকে ছুড়ে দিচ্ছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কিন্তু বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা সুমন্ত্র। মাতালের মতো টলতে টলতে বাইরের দিকে এগিয়ে চললো বিড়বিড় করতে করতে।

ভুবনেশ্বর পর্যন্ত একটানা গাড়ি চালিয়ে শেষপর্যন্ত ওরা ঠিক করে নিলো যে আজ রাতে ওরা ভুবনেশ্বরেই রাত কাটাবে। সেই কোন ভোরবেলা নতুন কেনা আই টুয়েন্টি গাড়িটার পুজো দেবে বলে পুরীধাম চলেছে ওরা। আগামী পরশু রথ। রথের দিনে প্রভু জগন্নাথ দেবের দর্শন পাওয়াই যেখানে ভাগ্যের ব্যাপার সেখানে গাড়ির পুজো? সুমন্ত্র অনেকবার করে বারণ করেছিলো ঐন্দ্রিলাকে। কিন্তু ঐন্দ্রিলা জেদ ধরে বসেছিলো যে না, রথের দিনেই রথের পুজো দেবে। জগন্নাথদেব ওর কাছে দেবতা নন, ওর পরমাত্মীয়। কখোনোবা জগুদাদা, কখনও জগাজ্যেঠু, আবার কখনও ওর প্রিয়তম। ওর জগন্নাথ ডার্লিং। বছরে অন্তত বার চারেক ওর আসতেই হবে জগন্নাথদেব দর্শনে। এসে মূল প্রবেশতোড়নে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকবে আর অবিরল ধারাপাত গড়িয়ে পড়বে ওর দুগাল বেয়ে।
হোটেল মেফেয়ার থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লো ওরা। কোণারক ছুঁয়ে দুপুরদুপুর যাতে পুরী পৌঁছে যেতে পারে।
কোণারক কেন জানিনা ঐন্দ্রিলাকে ভীষণভাবে টানে। পুরী যাওয়ার পথে সূর্যমন্দিরের সূর্যদেবকে প্রণাম না করে কিছুতেই ও পুরীধাম দর্শন করে না।
— তুমি এই ন্যুড মূর্তিগুলোর ভেতর কী এমন দেখতে পাও ঐন্দ্রিলা?
— কোন মূর্তিগুলোকে তুমি ন্যুড বলছো? পাথরের মূর্তির শৃঙ্গার বৈচিত্রে এই মূর্তিগুলো ভারতের অজন্তা ইলোরার থেকে কম কিছু নয়। এই মূর্তিগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কতখানি বলোতো?
— আমাদের পশ্চিমবঙ্গে এধরণের প্রস্তর শৈলীর অভাব নেই। এই পাথরের মূর্তির কাম ভঙ্গিমা দেখার জন্য এতোদূর আসার কোনো প্রয়োজন দেখিনা। আমাদের কলকাতা মিউজিয়ামেও প্রচুর কিন্নর কিন্নরীর মূর্তি সাজিয়ে রাখা আছে।
— সুমন্ত্র, আসল মিউজিয়াম তো আমাদের মন। সেই মিউজিয়ামে থরেবিথরে সাজিয়ে রাখা আছে সমস্ত ম্যুরাল। তাদের কোনোটা শরীরে ন্যুড, কোনোটা কালচারে, কোনোটা আবার চরিত্রে। তোমার যে মূর্তিটা আমার মিউজিয়ামে রাখা আছে সেটাকে প্লিজ ন্যুড করে দিও না।বিশ্বাস করো তাহলে কিন্তু আমার বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার ভেতর আর কোনো পার্থক্য থাকবে না।
— সে বুঝলাম ঐন্দ্রি, কিন্তু আমি অন্তর থেকে বলছি, প্রথম আমি যেবার তোমার সাথে এখানে এসেছিলাম সেবার সত্যিই আমি খুবই এনজয় করেছিলাম। দ্বিতীয়বারও এ জায়গাটা একঘেয়ে মনে হয় নি। কিন্তু এতোবার এই এক নোংরা মূর্তিগুলোকে দেখলে আমি এতোটুকুও উপভোগ করতে পারিনা। মূর্তিগুলোকে আমার এখন জাস্ট…
— এ মন্দিরটার নাম কি সেটা তুমি জানো সুমন?
— জানবো না কেন? কোণারক মন্দির।
— না, এটা কোণারকের সূর্য মন্দির। সূর্য যে সপ্তাশ্ব করে পরিক্রমণ করেন সেই সপ্তাশ্ব এই মন্দিরের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য। তুমি যখন ওই কিন্নর কিন্নরীদের মূর্তিগুলোকে দেখো, আমি তখন সূর্যের পরিক্রমাকে লক্ষ্য করি। আমাদের প্রাণের উৎস সূর্যদেবের চলার পথে পথের ধুলা আমার মাথায় ছূঁইয়ে প্রণাম করি। এই মন্দিরের চারদিক ঘুরে দেখো, মৈথুনপরায়ণ মূর্তির সাথেসাথে তুমি সূর্যদেবের কৌণিক অবস্থানেরও খোঁজ পাবে। যাকগে, চলো আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে।
ঐন্দ্রিলার কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলো সুমন্ত্র। আর মনেমনে নিজেকে নিজে ধিক্কার দিচ্ছিলো। রাস্তায় আর কোথাও গাড়িকে না দাঁড় করিয়ে ওরা যখন হোটেল পুলিন পুরীর পার্কিংএ গাড়ি দাঁড় করিয়ে রুমের লক খুলে ঘরে ঢুকলো, ততক্ষণ ওদের দুজনের কেউই কোনো বাক্য উচ্চারণ করেনি।

— তুমি বিশ্রাম করো, আমি স্নান সেরে প্রভু দর্শনটা সেরে আসি।
— একা যাবে কেন? আমার স্নান করা পর্যন্ত একটু অপেক্ষা করো প্লিজ।
— এতোটা পথ ড্রাইভিং করার ধকল গেছে তোমার, তুমি খানিক বিশ্রাম করো, লাঞ্চের অর্ডারটা দিয়ে রাখো, আমি এলে আমরা একসাথে লাঞ্চ করবো।

আজ চার বছর হলো, একসাথে লাঞ্চ খাবো বলে যাওয়া ঐন্দ্রিলা লাঞ্চ খেতে আসেনি। সুমন্ত্র এখন আর ঐন্দ্রিলাকে খুঁজে ফেরে না। সমুদ্র সৈকতের ধারে আর মন্দিরের প্রবেশতোড়নের সামনে দাঁড়িয়ে ওর মনের মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখা র‍্যাকগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে আর…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।