মুচকি হাসি হাসতে হাসতে ভদ্রলোক আমার দিকেই এগিয়ে আসছেন। ফর্সা চামড়ায় রোদের প্রভাবে তামাটে রঙের ছোপ ধরেছে। বেশ কয়েকটা রুদ্রাক্ষের মালা গলায়। স্থূলকায় বলা না গেলেও আমার দেখা অন্যান্য বাউলের মতো নন, চেহারাটা বেশ ভালো।
ভদ্রলোককে দেখে ভীষণ পরিচিত মনে হচ্ছে, কিন্তু —
–” কী গো ঠাকুর, কেমন আচেন আজ্ঞে –”
আমি একটু চিনি চিনি ভাব করে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম — ” হ্যাঁ গো ভালো আছি গোঁসাই। আপনি ভালো তো? ”
ভদ্রলোক আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। — ” কানাইদার ঠাঁয়ে যাচ্চেন বুজি? আমাকে চিনতে পারলেন না তো? আমি শ্যামাদাস গো ঠাকুর, সেই যে প্রভাতী গান গেয়ে সকালের আলোকে ঘুম থেকে তুলি — আহা, আপনার গাওয়া সে প্রভাতী সংগীত — বাউলরাজার সেই গান — শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি — আহা, জীবনেও ভুলবো না গো ঠাকুর। ”
সমস্ত ছবিটা মনে পড়ে গেলো। কানাইদার সেই সারামুখে আলোর বন্যা — মন্দিরের চূড়ায় এসে প্রভাতী সূর্যর প্রথম আলোর প্রণাম জানানো, কৃষ্ণভামার সাথে দেখা সেই অপূর্ব দৃশ্য সব সব সব — মনে পড়লো আমার গাওয়া গান শুনে শ্যামাদাস বাউলের সেই আকুলতা।
আমি সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়ালাম।
— ” সে দিনের কথা যে আমি আমৃত্যু ভুলতে পারবো না গোঁসাই। সে গান তো আমি গাই নি, আমার গলায় অন্য কেউ গেয়েছেন। আমার সাধ্য কি যে সেরকম তদগত ভাব নিয়ে –”
–” ঠাকুর, জন্মাবধি আমি তারাপীঠেই আচি। যেদিন থেকে এই খমকের তারে আঙুল ছুঁইয়েচি, সেদিন থেকেই আমি আমার অন্তর থেকে সুর নিঃসারিত করে প্রভাতী সূর্যর আরাধনা করি,জেবনে কতো কতো মানুষকে আমি গাইতে শুনেচি। কিন্তু সেদিন যে অপূর্ব সুধারসধারায় তুমি আমার মনকে চান করিয়েচো ঠাকুর, এমন অপূর্ব অঘটন আমি আমার জেবনে কোনও দিনও ঘটতে দেকিনি। সেদিন যে ভাবে তোমার সুরের মূর্ছনায় আমি সূর্যকে হাসতে দেকেচি, সে অঘটন দেকার জন্য আমি হাজারবার জন্মগহণ করতে রাজি আচি গো ঠাকুর। ”
আমার ভেতরে যে কি আনন্দের দাপাদাপি শুরু হলো, ভদ্রলোক কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি ওঁর চরণ স্পর্শ করলাম।
–” আজ আপনি আমাকে বারণ করবেন না গোঁসাই। এ প্রণাম একজন নরনারায়ণকে আরেক জন নরনারায়ণের। অন্তরস্থিত আহ্লাদের প্রকাশ। ঠাকুর, আমার এখনও মনে হয় বুঝি স্বয়ং আলোকদায়িনী আমায় দিয়ে আলোক স্তুতি করিয়ে নিয়েছেন। এ সুর যদিও আমার কন্ঠ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল, কিন্তু সে উৎসারণের দাবীদার আমি ছিলাম না। ”
–” তা ধুবদা কই গো ঠাকুর, তাঁকে তো দেকচি না? এ যাত্রায় বুজি তুমি একাই এয়েচো?”
হঠাৎ করে এ কথা জিজ্ঞাসা করায় কেমন যেন হতচকিত হয়ে পড়লাম। তাহলে কি ইনিও —
— ” পদীপবাবু, তুমিও কিন্তু মনে মনে বাউল হয়ে গেচো। আমরা এবারে ভাদ্দরের আমাবস্যায় তোমাদের কতা আলোচনা করেচি। ধুবদার মন আর তোমার মন — এ দুয়ের মনের ভেতর অনেকটাই ফারাক। কানাইদা বলচিলেন, পদীপদা নিজেই নিজের মনের পরীক্কা নিচ্চেন গো, তাই এ যাত্তায় এলেন না। তবে না এসে থাকতেও পারবে না গো, মনপাখিরে কি আর শেকল দিয়ে বেদে রাকা যায় গো? পদীপদার মন আসলে বাউলের মন। কটা মানুষ আর বাউল ঘরে জন্মায় বলো দেকি? যে মানুষ জন্মের পর বাউলের মনকে অধিকার করে সেই তো পকিত বাউল গো, আমাদের পদিপদাও তেমনি। ”
মনের ভেতর একা আসা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিলো, শ্যামাদাস বাউলের কথায় এক ঝটকায় সে সংশয় নির্মূল হলো।
রাতের অন্ধকারে একঝলক আলোর বৃত্তে গাড়ি এসে আমোদপুরে দাঁড়ালো।
আমোদপুর আসতেই শ্যামাদাস বাউল উঠে দাঁড়ালেন।
–” তাহলে ঠাকুর, আমি এবারে আসি… ”
–” সে কি গো গোঁসাই, আপনি রামপুরহাট যাবেন না? ”
— ” না গো ঠাকুর, এখানে একটু কাজ সেরে –”
–” তাহলে কাল প্রভাতী সঙ্গীত কে গাইবেন? ”
–” ভেতর ভেতর আমোদপুর তেকে মায়ের থানে হেঁটে যেতে এমন কিচু সুময় লাগে না গো পদীপভাই। আমি একান তেকে ভোরাই গান গাইতে গাইতে ঠিক পৌঁচে যাবো গো –”
আমার এ বিষয়ে এতোটুকুও জানা নেই। বাউলকে বিদায় জানাতে আমিও উঠে দাঁড়ালাম, তিনি ধীরে ধীরে দরোজার দিকে এগিয়ে গেলেন। আধো অন্ধকার, আলো ছায়ার মাঝে বাউলের শরীর ক্রমশ ঘন কালো আঁধারের বুকে মিলিয়ে গেলো। আমি আমার নির্দিষ্ট আসনে এসে বসলাম। এ পথটুকু যে কীভাবে পেরিয়ে এলাম, এতোটুকুও টের পেলাম না। এই সরল গ্রাম্য মানুষগুলোর মাঝে যে কি বিশাল এক একজন মানুষ লুকিয়ে থাকেন, সেটা এনাদের সাথে সঙ্গত না করলে বোঝা যায় না।
ট্রেন চলছে, ট্রেনের দুলুনিতে সবে একটুখানি তন্দ্রাভাব এসেছে এমনসময়ে একটা মৃদু পরিচিত গন্ধ নাকে এসে লাগলো। গন্ধটা ভীষণ চেনা কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না কিসের গন্ধ, কোথায় এর বাস পেয়েছিলাম। ট্রেন যেদিকে চলছে, সেদিকের জানালায় মুখ রেখে বসে আছি। হাওয়ায় হাওয়ায় মাথার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। গন্ধটা বুঝি হাওয়ায় ভেসেই আসছে। আমি নাসারন্ধ্রটাকে ফুলিয়ে গন্ধটাকে বুকের ভেতর টেনে নিচ্ছি। খুব অস্বস্তি হচ্ছে। চেনা গন্ধটা যেন আমার অস্তিত্বের ভেতর বাসা বাঁধছে ক্রমশ। আমাকে কেমন আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য একটু উঠে দাঁড়াতেই মনে পড়লো। গন্ধটা অনেকটা কাঁচা আমের গন্ধের মতো। তবে যেন একটু বুনো। এই গন্ধটাই তো আমি বাউলনির গায়ের থেকে পেয়েছিলাম ! তাহলে কি কৃষ্ণভামা আমার আশেপাশেই আছে? নিশ্চয়ই না। কিন্তু সে তো অশরীরী নয়, তাহলে কি এর মধ্যে ওর…
নিজেই নিজের মনকে ধমক দিয়ে উঠলাম। মনে পড়লো, গতবার ফেরার পথে ও বলেছিলো — ” ঠাকুর, ভালোবাসার মতো কঠিন ব্যামো আর নেই গো। সব সময় যেন সে তোমায় ঘিরে থাকপে। তোমার চিন্তায়, চেতনায়, স্বপ্নে, জাগরণে, তোমায় তিষ্ঠোতে দেপে না গো। এই দেকো না কেনে আমি কোতায় যাই, কার সাতে কতা বলি, এই যে ধরো আমার চুলে তুমি যে ফুলটা বেঁদে দিলে সে সবকিচু কিন্তু গোঁসাইএর নজর এড়ায় নি গো। আমার গায়ের গন্দে তিনি টের পান আমি কতোদূরে আচি। ”
তাহলে কি আমি সত্যি সত্যিই বাউলনিকে… ? আমার এবারের যাত্রার মূল কারণ কি তাহলে ওই টান? ভালোবাসার অমোঘ টানই কি আমায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে কানাই বাউলের আখড়ায়? আমি মনে মনে চিৎকার করে উঠলাম — তুমি কি বিশ্বাস করো বাউলনি যে আমার মতো একজন শহুরে যুবক শহরের এতো সুন্দরী নারীকে ছেড়ে তোমার বাঁধনে বাঁধা পড়েছি? এ গন্ধ কি সেই ভালোবাসার অস্তিত্বকে প্রমাণ করতেই আমায় ঘিরে ধরেছে, নাকি এ ভ্রম! এ মায়া! এ তোমার তৈরি কুহক ! আমি এইসব অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস-আনুগত্যের কেন্দ্রে পৌঁছুতে চাইনা। আমি এক ঘোর বস্তুবাদী যুবক। এ সমস্ত ভাববাদী চিন্তাচেতনার কুহক জালে আমাকে আটকে রাখতে পারবে না। এ অবিশ্বাস্য বিশ্বাসের কুহকী মায়ার বন্ধন ছিন্ন করার জন্যই আমি এসেছি। আমি প্রমাণ করবোই যে, এ সব আজগুবি চিন্তাভাবনা যে কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে, সে কক্ষপথ বাস্তববাদী কক্ষপথের সাথে সংঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। তুমি যতোই তোমার শরীরের কাঁচা আমের গন্ধের জালে আমাকে বন্দী করতে চাও, আমি এসব —
–” কোই সামান হ্যায় সাব –”
জানালা দিয়ে মুখ বাড়ানো কুলির ডাকে হুঁশ ফিরতে দেখি গাড়ি কখন রামপুরহাটে পৌঁছে গেছে।
এখন সবে রাত তিনটে। স্টেশনের বাইরে এসে যখন দাঁড়ালাম তখন শীতটা বেশ লাগছে শরীরে। কলকাতায় এখনও একটা মোটা ফুলহাতা জামা পরলেই চলে যায়। সার দিয়ে রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে। সবাই সমানে তারস্বরে তারাপীঠ — তারাপীঠ বলে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। প্যাসেঞ্জার সাকুল্যে আমাকে নিয়ে জনা আটেক হবে।
রিক্সাস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে চিন্তা করে নিলাম কীভাবে যাবো। পায়ে হেঁটে যাওয়াটা বুদ্ধিমানের হবে না। পথঘাট এমন কিছু চিনি না। শুধু একবার যাওয়া আর একবার ফেরার অভিজ্ঞতার সঞ্চয় জমা রয়েছে অভিজ্ঞতার ঝোলায়। কাজেই রিক্সা করে যাওয়াটাই ঠিক হবে। দরদাম করে একটা রিক্সাকে বারো টাকায় ঠিক করলাম। কথা হলো মুনসুবা মোড়ের ধাবায় চা খেয়ে ফের রওনা হবো। ধাবার মালিকের নামটা ঠিক মনে পড়ছিলো না। রিক্সাওলাই জিজ্ঞাসা করলো
–” কুনঠে যাবেন বট্টে — লালটুর ঠাঁয়ে ত? “
রিক্সায় উঠে ঝোলা থেকে বাড়ি থেকে আনা বাবার তুসের আলোয়ানটাকে গায়ে জড়িয়ে নিলাম। বেশ ভালোই শীত পড়েছে এদিকটায়। হাইওয়েতে ওঠার আগে পর্যন্ত বেশ ঘন বসতিপূর্ণ অঞ্চল। তবে বাড়িঘরগুলো তেমন উন্নত না। নিঃসাড় হয়ে, আলোহীন হয়ে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রাতটা স্টেশনে কাটিয়ে এলেই ভালো ছিলো কিনা ভাবছি। রিক্সাওয়ালা বলে উঠলো –” বাবু মনিব্যাগটো সিট্টের তলায় রাইখ্যে দেন কেনে গ। অঞ্চলটো সুবিধার লয়। মুনসুবার পর থ্যিক্যে রাস্তাটো –”
হাইওয়ে থেকে মুনসুবা মোড়ের ধাবাগুলোর সামনে জ্বেলে রাখা টিউবলাইটের আলোগুলো পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। হুসহাস করে ভারী ট্রাকগুলো দৈত্যের মতো ছুটে যাচ্ছে। আমি ইচ্ছে করেই বলে উঠলাম — ” আমার কাছ থেকে আর নেবেই বা কী? টাকাকড়ি কীই বা আছে। গিয়ে তো উঠবো গুরুপদবাবার আখড়ায়। আর বেকার মানুষ, একটু সাধুসঙ্গ করা, তামাকটামাক খাওয়া এজন্যই তো –”
— ” গুরুপদবাবা মানে — শ্মশানের দাদুর ঠাঁয়ে? সিখাইনকে ত কইলকাতার আরেক বাবু আমার রিক্সা ছাড়া — কী যেন নামটো বট্যে — কালাপানা – বাঙ্গাল বট্টে উও -”
ও কি ধ্রুবদার কথা বলছে না কি? ধ্রুবদা কি এতোটাই পপুলার নাকি যে একজন রিক্সাওয়ালাও তার খোঁজ রাখে?
— ” তুমি কার কথা বলছো? ধ্রুববাবু? ”
–” হ – হ – সি নামটোই আছে। ধুবদা বট্ট্যে। খুব দিলদার মানুষ গ। না চাইতেই –“
রিক্সাওয়ালা রিক্সাটাকে সটান হাইওয়ে থেকে ধাবার উঠোনে নামিয়ে দিলো।
–” শুধু চা, নাকি সাথ্যে রুটিও বুইলবো? ”
রিক্সাওয়ালা প্রশ্নটা করে আমার মুখের দিকে চাইলো।
বুঝলাম আমার সাথে সাথে,বেচারারও একটু খাওয়াটা জুটে যাবে। তাছাড়া এই রাতের বেলায় এখনও প্রায় আট কিলোমিটার পথ ওর সাথে যেতে হবে।
— “হ্যাঁ, চারটে করে রুটি আর ডিম আলু ভাজি বলে দাও। “
বড়শোল গ্রাম এ অঞ্চলে বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। বেশ কিছু পুরোনো দিনের পাকা ইমারত দেখতে পেলাম এখানে। এই বড়শোলের পরেই দিগন্ত বিস্তৃত ধূ ধূ মাঠ। দুপাশে নয়ানজুলি। নয়ানজুলির পরে যতদুর চোখ যায় কোনও জনবসতি নেই। মনে পড়ছে গতবার এই পথ ধরে যাওয়ার পথে এমন একজন সন্ন্যাসীর দেখা পেয়েছিলাম, যার কথা জীবনেও ভুলবো না। দীর্ঘদেহী জটাজুটধারী শ্বেতকায় একজন সন্ন্যাসী রাস্তার এদিক থেকে ওদিকে মিলিয়ে গেছিলেন। সেকথা মনে পড়তে গায়ের রোমগুলো দাঁড়িয়ে গেলো। কিছুটা এগোতে দূর থেকে মন্দিরের চূড়া দেখতে পেলাম। তখন সবে সূর্যদেব তাঁর সপ্তাশ্বর রথের লাগাম হাল্কা করেছেন।
দূর থেকে একটা অস্পষ্ট গানের সুর ভেসে আসছে। বাণী পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে না। কুয়াশার চাদরে মুড়ে একটা সলজ্জ ভোরাইয়ের সুর মাঠঘাট পেরিয়ে ভোমরার গুনগুন শব্দের মতো কানে এসে পৌঁছুচ্ছে। এটা নিশ্চয়ই শ্যামাদাস বাউল। কি আশ্চর্য, এর ভেতর তিনি তারামা কে ভোরের গান শোনাতে পৌঁছে গেলেন?
–” বাবু, চলেন গো, এইটুস পথ পায়দল চলেন কেনে। ”
সামনে নদী — সেই নদী — আমার কৃষ্ণভামার প্রাণের সই। আমাকে চিনতে পেরেই কি নদীর জলে সামান্য কাঁপন লাগলো?
আগেকার দিনে হলে হয়তো বলা হতো হাফ ফার্লং দূরত্ব, আমরা এখনকার দিনের মানুষ ফার্লং টার্লং বুঝি না। বুঝি ফার লং না নো ফার লং। মোটামুটি পঞ্চাশ পা দূরত্ব পথ হেঁটে গেলেই ওপারে নিয়ে যাওয়ার জন্য নৌকো বেঁধে রাখা আছে। দুটো নৌকো পরপর, একটার সাথে আরেকটাকে কাছির দড়ি দিয়ে বাঁধা। খেয়াঘাটের দিকে এগোতে এগোতে মনে করতে লাগলাম, গতবার নদীর সাথে একটা কথাও বলা হয়ে ওঠেনি। সারাটা পথ বাউলনির সাথে কথা বলেই কেটে গেছে। আজ পুরো রাস্তাটা নদীর সাথে গল্প করতে করতে যাবো বলেই ঠিক করলাম।
নৌকোয় পা দেবের মুহূর্তে হঠাৎ করেই নৌকোটা দুলে উঠলো। নিস্তরঙ্গ নদীর বুকে বেঁধে রাখা নৌকোয় হঠাৎ করে দুলুনি কেন? বুঝলাম, এটা নদীরই কারসাজি। ঘাটে আর কেউ নেই। আমি আর আমার সেই রিক্সাওয়ালা। আমার ব্যাগ কাঁধে করে আমাকে গুরুপদবাবার আশ্রমে পৌঁছে দেবে বলে সঙ্গ নিয়েছে।
ঈষৎ নীচু হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম — ” কেমন আছো সই? ”
হঠাৎ কলকল করে একটা শব্দ ভেসে এলো — ” উহ্, কেমন আছো সই, না কি কেমন আছে সই? ”
আমি স্থানকালপাত্র ভুলে গিয়ে হোহো করে হেসে উঠলাম। রিক্সাওয়ালা থতমত খেয়ে বলে উঠলো — ” কী হইলো গ বাবু? কুনো হাসির কুথা মন্যে পইরল না কি গ? ”
–” হ্যাঁ গো ভাই, গতবার এখানে পিছলে পড়ে গেছিলাম তো, সেটা মনে পড়লো হঠাৎ। ”
–” অ, সি টো বুল্যেন কেনে, আমি ত ভাইবলাম বুঝি -“
আমার ধারণা ছিলো গুরুপদবাবাকে বুঝি স্নানের ঘাটে স্নান করতে দেখবো। তিনি তো এই ঊষালগ্নে স্নানাদি সেরে আসনে গিয়ে বসেন। কিন্তু তাঁকে দেখা গেলোনা। তার মানে, হয় তিনি ইতিমধ্যেই স্নান সেরে নিয়েছেন, নয়তো —
–” কে গো, পদীপবাবু নাকি? ”
সোনাদা। গুরুপদবাবার আশ্রমের হেঁসেল যার আওতায় চলে সেই। গতবার অমাবস্যার রাতের ভান্ডারা যিনি একা হাতে সামাল দিয়েছিলেন।
–” আজ্ঞে হ্যাঁ সোনাবাবা। এই তো সবে এলুম গো। আশ্রমে দাদু আছেন তো? ”
–” কে গুরুপদবাবা! হ্যাঁ আছেন, শরীরটা একটু খারাপ। সামান্য জ্বর জ্বর করছে।”
এই সোনাবাবা আসলে একজন গৃহী মানুষ। হাওড়ার মন্দিরতলার দিকে ওঁর বাড়ি। সংসার ভালো লাগে না বলে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। অসম্ভব গুণী মানুষ। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবকিছুতেই একজন মাস্টারপিস।
–” তা আশ্রমে যাচ্ছেন তো? চলুন, আমি স্নান সেরে আসছি। ”
রিক্সাওয়ালা আগে আগে চলেছে, যেন আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। আমি অবাক হয়ে ভাবছি এনাদের কি অসম্ভব স্মৃতিশক্তি। প্রায় দেড়বছর আগে দেখা একজন মানুষকে কীভাবে মনে রেখে দিয়েছেন!
আশ্রমের ভেজানো কাঠের পাল্লা ঠেলে যখন ভেতরে ঢুকলাম, তখন সবে গুরুপদবাবা ঘুম থেকে উঠে বসেছেন।
চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, দাদুর শরীর একদম ঠিক নেই। ওরকম হাড় জিরজিরে শরীরে চোখ মুখটা যেন একটু ফোলাফোলা মনে হচ্ছে। প্রণাম সেরে ব্যাগটাকে রিক্সাওয়ালার কাছ থেকে নিয়ে মেঝেতে রাখলাম। ব্যাগটার ভেতর থেকে একটা হরলিক্সের বোয়াম বের করে ওনার সামনে ধরলাম। তিনি বিস্ময়বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে চাইলেন।
–” আপনার জন্য। ”
–” তাও তোমরা বেটিকে অস্বীকার করো প্রদীপবাবু। নাস্তিকতার ধুয়ো তুলে ভালোবাসার সাম্রাজ্যে থাবা বসাও। ”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। এর ভেতরে ইনি নাস্তিকতা আস্তিকতাকে খুঁজে পেলেন কীভাবে?
–” শরীরটা এতো দুর্বল লাগছিলো গতকালই ভাবছিলাম এসময়ে একটু এ জাতীয় খাবার পেলে ভালো হয়। আর আজ সকালেই তুমি এটা হাতে করে নিয়ে হাজির হলে। তুমি ভাবছো বটে এটা তুমিই আনলে, আসলে এটা তুমি আনোনি গো, তোমার হাত দিয়ে ওই তিনিই পাঠিয়েছেন। ”
বলেই চোখ বন্ধ করে দুহাত বুকের কাছে নিয়ে অনুচ্চস্বরে বলে উঠলেন — ” জয় জয় মা তারা — জয় গুরু বামদেব। “
গুরুপদবাবার আশ্রমের মেঝেতে পাতা মাদুরে বসে ঝোলাটাকে খুলে গামছা বের করতে যাবো, ইতিমধ্যেই সেই রিক্সাওয়ালা ভাইয়ের ত্তত্বাবধানে গরম চা সাথে গরম জিলিপি আর সিঙ্গাড়া এসে হাজির। দেখলাম একজন টেনিয়া হিসেবে এই ছেলেটি দারুণ রকমের চৌকস। কত হয়েছে সে কথা জিজ্ঞাসা না করে একটা দশ টাকার নোট ওর দিকে বাড়িয়ে ধরলাম। ও ওর লুঙ্গীর খুঁট থেকে খুচরো টাকা বের করতে যেতেই আমি চোখের ইশারায় ওকে কিছু ফেরত দিতে বারণ করলাম। আর দুটো দশ টাকার নোট বের করে ওর দিকে বাড়িয়ে ধরলাম।
ছেলেটি সকৃতজ্ঞ চোখে আমার দিকে চাইলো। আমি একটু মুচকি হেসে মাথা নেড়ে সবটাই নিয়ে নিতে বললাম। বিদেশবিভুঁইয়ে এরা খুব কাজে আসে।
— ” প্রদীপবাবু, আমি বলি কি, এখুনি নদীতে নাই বা নাইতে গেলেন। সবে শীত পড়েছে। এখন এই ভোরবেলা স্নান করলে জ্বর চলে আসতে পারে।”
–” আমার একটা কথা আপনাকে রাখতে হবে বাবা। ”
–” বলুন –”
–” আমাকে আপনি আজ্ঞে আর বাবু বলে সম্বোধন করবেন না। আপনি আমার পিতৃতুল্য। কথাগুলো আমার খুব কানে বাজে। ”
গুরুপদবাবা খানিক চুপ করে রইলেন।
–” আসলে কি জানো বাবা, আমরা কেউ অন্তরের প্রসাধনে সাজতে ভালোবাসি না। নকল প্রসাধনী ব্যবহার করে নিজেকে সুন্দর দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তুমি বাবা একজন শহুরে যুবক। তোমাকে মান দেওয়ার কথা ভেবেই আমি তোমাকে আপনি বলে সম্বোধন করতাম। এ কথাটা বলে তুমি আমার অন্তরের বাসাতে জায়গা করে নিলে। ”
আমি ব্যাগটাকে দাদুর কাছে রেখে উঠে দাঁড়ালাম।
–” বেশ তাই হবে, দুপুরবেলা এসেই স্নানটা সেরে নেবো। এখন যাই একটু মাতৃদর্শন সেরে –”
–” হ্যাঁ, সেটাই ভালো। মন্দির থেকে একেবারে কানাইয়ের সাথে দেখা করে এসো। ওরা দু’জনেই তোমাকে খুব ভালোবাসেন। ”
কথাটার ভেতরে নিশ্চয়ই কোনো ইঙ্গিত নেই। তাহলে আমার মনেই কি পাপবোধ লুকিয়ে আছে? নইলে কেউ ওদের প্রসঙ্গ তুললেই আমার মনের ভেতর একটা কাঁটা খচ করে বিঁধে যায় কেন?
ভেবেছিলাম স্নান করার সময় নদীর মান ভাঙাবো। দাদু সে আলাপে বাধ সাধলেন। আশ্রমের চাতালের টিউবওয়েলে ভালো করে গা হাতপা ধুয়ে মন্দিরের দিকে রওনা দিলাম।
সকালবেলা মা তারাকে দেখে মন ভরে গেলো। এ বিষয়টা আমায় সত্যিই অবাক করে। মুখে যত বডো বিপ্লবীই হই না কেন, মায়ের সামনে এলে কেন যে এভাবে আবিষ্ট হয়ে পড়ি নিজেই বুঝতে পারি না।
প্রভাতী আলো মন্দির গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে পারে কিনা জানি না। নিশ্চয়ই পারে না। কিন্তু তাহলে দিনের বেলায় আর রাতে মায়ের রূপের এ পরিবর্তন কেন? সবে মায়ের বেশ পরানো হয়েছে। মন্দিরের পুরোহিতেরা দেখলাম আমাকে কেউ চিনতে পারলেন না। ত্রাতা হিসেবে সেই রিক্সাওয়ালা। হঠাৎ দেখি আমার হাত ধরে আমাকে গর্ভগৃহের দিকে টেনে নিয়ে চলেছে। নিয়ে একদম মায়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিলো। ( আমি যে সময়ের কথা বলছি, মনে রাখতে হবে সেসময় পান্ডাদের এরকম রাজত্ব ছিলো না।)
পুষ্প অলংকারে সালঙ্কারা মা তারা। আবক্ষলম্বিত রূপোর বক্ষাধান, উজ্জ্বল মুকুটে শোভমান পুষ্পতাজ — মা যেন আমার রাজরাজেশ্বরী। অপূর্ব স্মিতহাস্যে যেন সেই গর্ভগৃহ আলোয় আলোয় দেদীপ্যমান হয়ে উঠেছে। একজন আমারই বয়সী পুরোহিত এসে আমার মাথাটাকে মায়ের কোলে দিয়ে দিলেন। মুহূর্তে যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল বিদূরিত হলো। এক অতলান্ত নীরবতা এসে আমাকে পরম শান্তির কোলে বসিয়ে পূর্বদিগন্তের সমস্ত আলোকবর্তিকাকে প্রজ্জ্বলিত করলো। আমি মুহূর্তের জন্য আপনহারা হয়ে গেলাম।
নদীর পাড়ে এসে যখন পৌঁছেছি, সূর্য তখনও পুব দিকের গাছের ডালের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাননি। ভোরবেলার চাইতে এখন নদীর জল কিছুটা বেড়েছে। ইচ্ছে হলো নদীর সাথে একটু মজা করে বলি –” নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো? ” অমনি নদী কলকল করে বলে উঠলো –” আমি অন্তত মহাদেবের জটা থেকে আসিনি গো ঠাকুর, তুমি তো বোধহয় জানো না নদীর লিঙ্গ বিচারে আমি নদী নই, নদ। আর সমূদ্রসঙ্গমেও যাইনি, গেছি নদী সঙ্গমে। ”
ভুলেই গেছিলাম এই নদীও যে মনের কথা শুনতে পায়। তাই প্রথমটায় চমকেই গেছিলাম। পরে ধাতস্থ হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম –” তাহলে তুমি কৃষ্ণভামার সই কীভাবে হলে? ”
নদী হো হো করে হেসে উঠলো।
নদীর হাসির শব্দ শুনে আমার যেন একটু অভিমান হলো। এ কথায় হাসির কী হলো? বাউলনির কাছে তো আমি বহুবারই নদীকে সই নামে বলতে শুনেছি। একজন পুরুষ আর মহিলার মধ্যে যে বন্ধুত্ব সেখানে সইয়ের অস্তিত্ব কোথায়?
–” ঠাকুর, তোমার মনে আচে , গতবার ফেরার সুময়ে তুমি আমার সাতে একবেলা গল্প করবে বলে কতা দিয়েচিলে? ”
ওরে বাবা সে কথা ইনি এতোকাল ধরে মনে করে রেখেছেন! আমারই তো মনে ছিলো না।
–” বোধহয় বলেছিলাম। তুমি বলায় মনে পড়লো। তোমার অভিমান কমাতে কথা দিয়েছিলাম। ”
–” ও! বোদয় ? নিচ্চয় নয়? অবিমান কমাতে? বালোবেসে নয়? তালে থাকগে ঠাকুর, আমার সাতে কতা কইতে হপে না।”
— ” এই দেখো, অমনি বাচ্চা মেয়ের মতো ঠোঁট ফোলানো শুরু হলো। আরে এ কথা আর নতুন কী? শুধুই কি তোমাকে গো নদী, এখানকার আকাশবাতাস, গাছপালা, রাস্তাঘাট, রোদ্দুর, আঁধার সবকিছুই তো আমার ভালোবাসার। কী যে যাদু জানো তোমরা, তোমাদের ভালো না বেসে উপায় আছে? ”
–” ও, তালে সবার সাতে আমাকেও সবার মতোই, – আমার কোনো আলাদা পিঁড়ে জুটলো নি কো তোমার হিদয়ে –! তা জুটবেই বা কীভাবে বলো, কিষ্ণভামী পোড়ারমুখী তো তোমার গোটাটাই দকলে রেকেচে। ”
আমি যে কী বলি! এ এক জ্বালা। যাই কিছু বলি না কেন, ঠিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে –
–” তা যাকগে, আমি জানি এই চাঁপা ফুলের গাচটা তোমার খুব পিয়। মনের মতো করে এর ফুল দে সাইজে চিলে তুমি তোমার পিয়ার রাত্তিকালো চুল। মনে আচে ঠাকুর? আমি শুদু দেকে গেচি আর হিংসেয় জ্বলেচি। একেনে, এই ঠাঁয়ে এট্টু বোসো না কেনে গো। দুদন্ড গল্পগাচা করি –”
— ” সে না হয় আমি যখন স্নান করবো তখন -”
–” দেকো, পত্থম কতা আজ নদীতে তোমার নাওয়া হপে না। আর দ্বিতীয় কতাটা সেটা একন বললেও তুমি বুজপে না। দুদন্ড বসলে তোমার লাভ বৈ কতি হপে না কো। “
কী আর করা। নাছোড় নদীকে এখন যাই বলি না কেন, ওর হাত থেকে আমার নিস্তার নেই। সেই চাঁপাফুলের গাছটা এখন আর ফুলে ঝাপসা হয়ে নেই। দু’চারটে, এদিক ওদিক, যেন ভাঙা মেলার মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মনোহারী দোকানের মতো। ওর ডাল সরিয়ে নদীর পৈঠায় গিয়ে দেখলাম মাটি কেটে বেশ দু’জনের বসার মতো জায়গা করে রাখা। বোধহয় কোনো গোপন অভিসারের নিভৃত আসন।
–” এখানে বসবো? ”
–” হ্যাঁ গো ঠাকুর, দেকোনা কেমন বসার আসন করে রেকেচে পাগলগুলো। ”
–‘ এখানে বসাটা কি আমার ঠিক হবে? ”
— ” কেনে হপে না কেনে শুনি? এই নাও আমি এসে বসনু তোমার পাশটিতে। ”
বলামাত্র ছলাৎ করে একটা ঢেউ এসে আসনের একদিকটা ভিজিয়ে দিলে। আমি আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলাম সে দিকে।
–” বলো গো ঠাকুর, কী যেন বলচিলে? আমি পুরুষ আর সে নারী, তালে আমরা সই হলাম কী করে? তাইতো? ”
আমি কিছু না বলে মাথা নাড়লাম। না নেড়েই বা কি করবো? যে সমস্ত ঘটনাগুলো এখানে ঘটতে দেখছি, সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা তো আমার কাছে নেই। এসব কি আমার মনের গহনে ঘটে চলেছে, না কি বাস্তবিক, আমি সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কিন্তু যদি শুধু মনের ভেতরে ঘটে চলা ঘটনাই হবে, তাহলে এই জল উছলে ওঠাটার কী ব্যাখ্যা হবে?
–” তুমি একনো বাউলদের গুহ্য কতা কিচুই জেনে উটতে পারোনি ঠাকুর। আমি বাউলসঙ্গ কত্তে কত্তে নিজেও ককন বাউল হয়ে উটেচি, সে আমি নিজেও জানি নে কো। বাউলদের ভেতর কোনো নারী পুরুষের ভেন্নতা নেই গো ঠাকুর। একই অঙ্গে যিনি নারী, সেই অঙ্গেই তিনি পুরুষ গো। একই শরীরে দুই সত্তা। দুইয়ে মিলে এক আবার ভেন্ন। ”
আমার কী বোধ হারিয়ে যাচ্ছে, না কি আমি এমন কিছু শুনছি, যেটা আমার অশ্রুতপূর্ব বলেই আমার চেতনায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না।
–” তোমার বুজতে কষ্ট হচ্চে, তাই না ঠাকুর? আচ্চা আমি একটু সহজ করে বুইজে বলি — রমণী মানে কী? যার সাতে রমণ করা যায়। তাইতো? ”
আমি মাথা নাড়ি।
–” আর পুরুষ মানে কাদের বোজায়? যে মানুষ তার পরুষ শক্তি দে রমণীকে ভোগদকল করেন। তাই তো গো ঠাকুর? ”
এবারও আমি মাথা নাড়ি।
–” ধরো, এমন কোনো মানুষ যকন তার মনের মানুষরে খুঁজতে নিজের শরীরের বাইরে অবস্তান করচে, সচ্চিদানন্দের সুখ আহরণ করচে, ছিষ্টির রহস্য তাঁর চোকে, তকন তাঁর রমণের ইচ্চে জাগলে তিনি তকন রমণী পাবেন কোতায়? তালে পরে তো তাকে ফের মাটিতে নেমে আসতে হপে। একবার সে অবস্তা ভেঙে গেলে যে ফের তিনি তার পূব্বাবস্তায় ফেরত যেতে পারবেন, তার নিচ্চয়তা কোতায়? এজন্যিই তিনি তকন নিজের শরীরকেই রমণীসত্তায় নে আসেন। একই অঙ্গে তিনি তকন পুরুষ আবার সেই ছিদেহেই তিনি একজন নারী। নারীর ক্ষেত্তেও ব্যাপারটা একই। আমি কি তোমাকে ঠিক বুইজে উটতে পারলুম গো ঠাকুর? ”
তখন আমার কানে আর কোনো শব্দ প্রবেশ করছে না। এক মহাকুন্ডলী আমাকে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় কোন জগতে আমি জানি না, সে জগতে শুধু আলোর প্রবেশাধিকার। আর দূর থেকে ভেসে আসছে একতন্ত্রী কোনো বাদ্যযন্ত্রের সুর। সে আলোর মাঝখানে ক্রমশ ক্রমশ আত্মপ্রকাশ করছেন একজন নারী। সে নারী রূপের আশ্চর্য প্রকাশ। ক্রমে ক্রমে সে নারী রূপ পেলো বাউলনির শরীরে। আমি আমার দু’হাত দিয়ে তাকে বেষ্টন করছি। আমার শরীর মিশে যাচ্ছে বাউলনির শরীরের সাথে। আমি নির্ভার এক শরীর নিয়ে যেন সেই একতন্ত্রী সুরের আবহে ভেসে যাচ্ছি ভেসে যাচ্ছি আর ভেসে যাচ্ছি —
হঠাৎ কোনো এক মানুষের স্পর্শে আমার ঘোর ভাঙলো। দেখি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই রিক্সাওয়ালা ভাই।
–” বাবুর কি শরীরট্যো খারাব লাইগছে নাকি গ? এখখন আপনি যাবেন কুনঠে গ? কানহাই বাউলের ঠাঁয়ে, না কি দাদুর ঠাঁয়ে, বলেন কেনে। পৌছাইন দি বট্টে! “