–” আচ্চা ঠাকুর, চেতনা আর চৈতন্য এ দু’য়ের পাত্থক্য কী গো? ”
— ” এ এক ভারী গেরোয় ফেললে গো কানাইদা। আমার আর কতোটুকু জ্ঞান বলো দেখি! তবে এটুকু বুঝি, চেতনা হচ্ছে জড়ত্ব থেকে জীবনের উত্তরণ। জীবন প্রকাশিত হয় চেতনায় আর সেই চেতনার উত্তরণে চৈতন্যর প্রকাশ। আমার চেতনা আছে আর তোমার আছে চৈতন্য। ”
–” কতো সহজ করে বুজিয়ে দিলে গো পদীপদাদা, একেই বলে শিক্কে ! যাই বলো না কেনে গো, এ শিক্কে কোনও বইতে নেকা থাকে বলে মনে হয় না। এ হচ্ছে অধিগত গুণের পকাশ। জেবনের থে কুইরে নেওয়া। পদীপদাদা, তোমাকে বুজতে গেলে ডুব দিতে হয়। আহা, চেতনা জেবনে পকাশ আর চৈতন্য চেতনার উত্তরণের। কী কতাটাই না বললে গো….!
কানাইদা মুখটাকে ওপরের দিকে তুলে ধ্যানস্থ হলেন। মুশকিল হচ্ছে কানাইদা চোখ মেলে আছেন না দু’চোখ বন্ধ করে আছেন , সেটা বোঝা দুঃসাধ্য। তবে এ মূহুর্তে যে তিনি চোখ বন্ধ করে আছেন, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
বেশ কিছুটা সময় নীরব যাপন করে হাতের তারযন্ত্র টুংটাং করে বেজে উঠলো। ভীষণ ক্ষীণ সে শব্দ। ভোরের পাখির ডাকের মতোই। মর্মে ঢুকছে, কিন্তু ঘুম ভাঙাচ্ছে না।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে হাতের তারযন্ত্রে সুর বাজিয়ে আকাশের দিক থেকে মাটির বুকে নামিয়ে আনলেন বাউল। বেশ কিছুক্ষণ মৌন থেকে অস্ফুটে ডাক দিলেন —
— ” পদীপদাদা.. ”
— ” উঁ… ”
–” তুমি একেনে এয়েচো কেনে গো? ”
–” মন টানলো গো গোঁসাই ”
— ” কে টানলে মন? ”
আমি চুপ করে রইলাম। কী বলি বুঝে উঠতে পারছি না।
–” এ কতা তো সবাই বলেন, মা না টানলে একেনে আসা যায় না গো। তবে তোমাকেও কি তিনিই টানলেন? ”
–” হয়তো ”
–” হয়তো না গো, তাই। তিনি না অনুমতি দিলে একেনে ফুলও ফুটতে পারে না গো ঠাকুর। তা বলচিলাম কি, তাঁর সাতে দেকা হলো? ”
এবারে সত্যিই লজ্জায় পড়লাম। আচ্ছা, কে আমায় টান দিয়েছে? মা তারা, নাকি… ভাবতে গিয়েই নিজের মনেই চমকে উঠলাম। কানাইদা যে মন পড়তে পারেন।
পিটুলিতলার শাণ বাঁধানো বেদী থেকে তিনি নেমে এলেন। হাতের লাঠি মাটিতে ঠুকে বললেন, — ” চলো কেনে, দেকা করে তার মান ভাইঙ্গে দে আসি। আরে, মায়ের মান ভাঙলে তবেই না মেয়েরও মান ভাইঙবে গো। ”
দেখেছো, যা ভাবছিলাম ঠিক তাই। মনের ভেতর ভাবনার ছায়া পড়েছে কি পড়েনি, ওমনি?
সেই শ্রীরামকৃষ্ণগীতিটা গুণগুণ করতে করতে পথ চলতে শুরু করলাম আমরা।
শুনশান গর্ভগৃহে কোনো পুজারী পান্ডাও নেই। দরজার কাছে রাখা মোমদানী আর ধূপদানী থেকে হাতড়ে হাতড়ে একটা নিভে যাওয়া মোম আর ধুপ নিয়ে কাপড়ের খুঁট থেকে একটা দেশলাই বের করে আমার হাতে দিলেন।
ওর লাঠি আর গুপীযন্ত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কানাইদার একহাতে জ্বলন্ত মোম আর অন্যহাতে ধূপবাতি। কিছুক্ষণ আরতি করার পর আমার দিকে মুখ ঘোরালেন। অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ওর মুখমণ্ডল। ওর হাত থেকে ধূপ আর মোমবাতি নিয়ে আমিও আরতি সেরে নিলাম। অস্ফুটে উচ্চারণ করলাম – জয় মা তারা।
দু’জনে নাটমন্দিরে এসে বসলাম। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর জিজ্ঞাসা করলাম –
–” আচ্ছা কানাইদা, মায়ের কোন রূপ তোমার মনে ছায়া ফেলে? ”
–” এট্টুসকানি বুইজে বলো গো। ”
প্রশ্নটা করে ফেলেই কেমন একটা অন্যায় বোধ আমায় পেয়ে বসলো। আমরা নিজেদের যারা চক্ষুষ্মান মনে করি তারা তো সরাসরিই সবকিছুই দেখতে পাই কিন্তু যারা চক্ষুহীন তারা?
— ” দ্যাকো পদীপদাদা, আমাদের কাচে, যারা দিষ্টিহীন তাদের কাচে শুদু দু’টোই রূপ। এক আলোকিত রূপ আর আঁদারিত রূপ। একন পশ্ন করতেই পারো তাহলে কি সব আলো আর সব আঁদার একইভাবে পতিভাত হয়? সেটাকে বুজতে গেলে আলো আর অন্দকার কী সেটা বুজতে হপে গো।