কবিতায় স্বর্ণযুগে প্রদীপ গুপ্ত (গুচ্ছ কবিতা)

১| যাপন কথা
যতদিন হেঁটে গেছি তীর বরাবর
সুখেরা স্থাবর ছিলো, শান্তি যাযাবর।
খলখল হেসেছিলে তরঙ্গ আঘাতে
ছেড়েছো ধরেছো হাত ঝিনুক কুড়োতে।
সম্পদের পাহাড়ে সাজে শুকনো বালুচর
ঢেউ এসে ভেঙে গেছে তাসেদের ঘর।
লবনাক্ত মৈথুনের ভালোবাসাবাসি
ওষ্ঠপুটে যাপনের স্নিগ্ধ শান্ত হাসি
বাউলিয়া হৃদয় তবু হয় উচাটন
স্থায়ী থাক যতোটুকু ছুঁয়েছিল মন।
স্মৃতির পাতায় তবু লেগে থাকে দাগ
আবীরে রাঙানো ক্ষণ ফাগের সোহাগ।
২| উপহার
তোমার কাছ থেকে ধার করা ভালোবাসাই
যখন আবার তোমায় ফিরিয়ে দিই
তুমি কেমন যেন অবাক হয়ে যাও — সুরঞ্জনা।
কেন বোঝনা!
এগুলো কাল পদ্মপাতায় মুড়ে তুমিই আমায় দিয়েছিলে!
তখন চৈত্র শেষের সূর্য দূরে কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে আটকে আছে,
কি জানি হয়তো লোভার মতো অপেক্ষায় আছে,
তোমার সমর্পণ দেখবে বলে।
জল মাকড়সাটাও জলের মধ্যে আলপনা কাটতে কাটতে
হঠাৎ থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো।
যেমনি করে কলমিলতার দামে চঞ্চল পাখাদুটো
পিঠের ওপর গুটিয়ে নিস্পন্দ হলো জল ফড়িং টা।
ওরা সবাই দেখতে চেয়েছিলো —-
ওরা সবাই লোভে পড়েছিলো —-
ওরা কি সবাই —-
আচ্ছা সুরঞ্জনা —
তুমি কি বুঝেও বোঝোনা!
চৈত্র শেষের উপহার পাওয়া ভালোবাসাই
আবার আমি ফিরিয়ে দিলাম তোমায় বৈশাখী ভোরে!
ভালোবাসা বুঝি এমনই অন্ধ করে রাখে!
৩| এই দহন কাল
এই লজ্জার দেশই কি আমার জন্মভূমি?
যেখানে গর্ভবতী হরিনির মতো
সন্ত্রস্ত চোখে তাকায় জীবন।
খুঁজে ফেরে অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা
ধূর্ত শ্বাপদের চোখ। খুঁজে ফেরে তৃষ্ণার
জল, খুঁজে ফেরে কচি পল্লব আর
খুঁজে ফেরে সেই অগ্নিবলয় যেখানে
ভয়েরা ভয় পেতে পারে।
এ অরন্য কেন আমার অচেনা হবে?
এ বনানীর কোমল হৃদয়,নরম উষ্ণ
কোল, এর জলাশয়, ছোট্ট খরগোশ
অথবা ফুল,ফল,পাতা,পাখিদের গান
দিন থেকে রাত, কোমল সকালের রোদ,
সন্ধ্যা সংগীত, গায়ে গায়ে মাখা আছে।
তবে এই ব্যাধেরা কোথায় ছিল মিশে?
একই রক্ত বইছে কি শিরায় শিরায় !
মাগো,
সময় এসেছে, চুপ থেকো নাকো আর
না হয় উত্তাপ বাড়ুক আরো সূর্যের,
ছারখার করে দাও এ অরণ্য জীবন
হরিনেরা জ্বলে যাবে জানি, জলাশয়
কাঠ হয়ে যাবে। সবুজেরা ধ্বংস হয়ে
যাক, সাথে করে ধ্বংস হোক শ্বাপদীয়
যত বর্বরতা।
আবার ফিরবো আমি
তোমার শ্যামল সজল কোমল কোলে
অন্য কোনদিন।
৪| মায়া —-
মায়া মানে গলায় ফোটা
চিতল মাছের কাটা
মায়া মানে উদাস মনে
পেছন পানে হাটা।
মায়া মানে বিকেলে দেখা
সকাল বেলার ছবি
মায়া মানে ‘ কি জানি সই
কি জানি তুই কবি?”
মায়া মানে পুটুলি, বাক্স,
আর বোয়াম, খুঁটিনাটি,
মায়া মানে সিথির সিঁদুর
আর হাতের বালাদুটি।
মায়ারাই নাতি, মায়ারাই পুতি
মায়া মানে বেনারসি –
মায়া মানে সেই বাসরশয্যা
লাল চেলি, জোড়,ধুতি।
মায়া মানে তোর ব্লটিং পেপারে
শুষে নেওয়া নীল রঙ
মায়া মানে এই অশীতি বয়সে
আমশি খাওয়ার ঢং।
মায়ারাই তুমি, মায়ারাই আমি
মায়া মানে সংসার
মায়া মানে “সব” হয়ে যাবে”শব”
মায়া তার? মায়া কার?