সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৩৫)

পদচিহ্ন
মশারীর ভেতর বলরামবাবু নড়েচড়ে বসলেন। মশারীটাকে তুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
— ওদের প্রপোজালগুলো তো একদমই স্বচ্ছ, পরিষ্কার। প্রয়োজন হলে নিজেরা আলোচনা করে নাও।
— হ্যাঁ, সবাইমিলে আলোচনা করেই..
— তাহলে তো ঠিকই আছে।
— না,আমি বলছিলাম কি, তাও আপনি যদি একবার একটু চোখ বুলিয়ে নিতেন তাহলে…
বুঝলাম ওদের কথার মধ্যে থাকার কোনো অর্থ নেই। আর তাছাড়া আমি আমার কম্মোটি করে ফেলেছি। বলরামবাবুর থেকে যে ইন্টার্ভিউ নেওয়ার প্রয়োজন ছিলো, সেটা মোটামুটিরকম নেওয়া হয়েছে। এবারে মানে মানে…
আমরা আমাদের পথপরিক্রমা মোটের ওপর শেষ করেই এনেছিলাম। বাদ সাধলো মনোজ নামের এই যুবক। এর সম্পর্কে না জানলে যে আশ্রম সম্পর্কে অনেকটাই অজানা থেকে যেতো। এই সেই মনোজ, আরও অনেকের সাথে যার সম্পর্কে বলরামবাবু তার নির্ভরতার কথা বলছিলেন। একেই শীত তারওপরে এতো রাতে, সবাই যখন উষ্ণ বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে, তখনও এই যুবক ক্লান্তিহীন।
— তুমি কি এরপর অফিসে আসছো?
— কেন জেঠু ? দরকার আছে কিছু?
— হ্যাঁ, আর সেটা খুব জরুরী।
— আপনার রাতের খাওয়া হয়ে গেছে? নইলে চলুন একসাথে খেয়ে নিই আগে।
— ঠিক আছে, আমি না হয় অফিসেই বসছি কিছুক্ষণ।
অল্প সময় বাদেই মনোজ এসে পাশে বসলো।
— বলুন জেঠু।
— খেয়ে এলে না?
— সীমাকে বলে এসেছি। ও এখানেই নিয়ে আসছে।
এটাই সমস্যার। এই আরেকটা চরিত্র সীমা। ওকে নিয়ে কি বলেছি কিছু ইতিপূর্বে? বোধহয় না। কিন্তু ওকে ছাড়াও কি এই পরিক্রমা শেষ হবে? একেবারেই না। যাকগে যাক, হাতের সামনে যাকে পেয়েছি, সেও অনেক কষ্টের ধন। কতোদিন যে সময় চেয়েছি মনোজের কাছে। আজ বুঝিবা আমার এতোদিনের বাসনা রূপ পেতে চলেছে।
মনোজের কথা।
মুর্শিদাবাদ জেলার এক অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হয়ে জন্মেছিলাম।
সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশনের নাম শুনেছেন জেঠু? সেই মিশন স্কুলের প্রাইমারী সেকশনে বাবা-মা গিয়ে ভর্তি করে দিয়ে এসেছিলেন! বড়ো ভালো ছিলো সেই স্কুল। নিয়মানুবর্তিতা, বন্ধুতা, আর খেলাধুলো, পড়াশুনোর সাথে চরিত্রগঠনের দিকটাও সমানভাবে গুরুত্ব পেতো সেই স্কুলে। সেই একই স্কুলে মাধ্যমিক। মাধ্যমিক করেই চলে এলাম কাঁথি। কাঁথি পলিটেকনিক পড়ার সময়েই এই আশ্রমের সাথে পরিচিত হওয়া। আমি যখন এই আশ্রমে এসেছি, সত্যি বলতে কী, তখনও এই আশ্রম ঠিক রূপ নেয়নি। সামনের দোতলা বাড়িটা আর এই যে দেখছেন গার্ডেন কিচেনের দুপাশে লম্বা করে ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য ছাত্রাবাস।
এই ছাত্রাবাসটাই সবে গড়ে উঠেছে তখন। এখানেই থাকি আর কাঁথি পলিটেকনিক কলেজে পড়তে যাই। সেটা দুহাজার নয় সাল। হঠাৎ একদিন চায়নাকে দেখি। চায়না মানে বুঝেছেন তো? চায়না করণ। কেন জানি না, চায়নার সাধারণ চলাফেরা, সাজগোজহীন ব্যক্তিত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ওকে অসম্ভবরকমভাবে ভালো লেগে গেলো। আপনাকে বললে বিশ্বাস করবেন না, এতোদিনের ভেতরে কোনো মেয়ের প্রতি কোনোরকমভাবে আকৃষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা আমার জীবনে ঘটে নি। কিন্তু চায়নাকে দেখে কেন যে, কীভাবে যে…
আমি অনেক ভেবেছি বিষয়টা নিয়ে সারগাছি আশ্রমে বড়ো হওয়া একজন সদ্য যুবক, যে কোনোদিনও মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে নি সে কেন হঠাৎ…
আমি শুনেছিলাম ওর কথা কিন্তু একটা কথা না জিজ্ঞাসা করে পারছিলাম না।
— তারমানে তুমি চায়নার প্রেমে পড়লে? আশ্রমের এই কঠোর বিধিনিষেধের দেওয়ালে ফাটল ধরাতে ভয় করলো না তোমার?
মনোজ কিছুক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে রইলো। ছেলেটিকে যতোই দেখছি ততোই অবাক হয়ে যাচ্ছি। ধীরস্থির, নম্রস্বভাবের একজন প্রকৃত কর্মী মানুষ, যার অপ্রশস্ত কাঁধে এতবড় একটা আশ্রমের সমস্তরকম লেনদেনের পাইপয়সার হিসেব নিকেশের গুরু দায়িত্ব চেপে আছে। এমন একজন যুবক, যে অবলীলায় গভীর রাত পর্যন্ত একাএকা ওর চেয়ারে বসে প্রতিদিনের হিসেব শুধু নয় কোন পথে আশ্রমের আয়ের দিকটা আরও একটু বাড়িয়ে তোলা যায় তার চিন্তাভাবনাও করে চলেন।
ক্রমশ