সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা

দ্বিতীয় খণ্ড (পঞ্চম পর্ব)

— ” ইনি কে গো কিষ্ণা মা! এনাকে তো এ ঠাঁয়ে দেকিনি ককনও? লতুন এলেন বুজি? ”
–” হ্যাঁ গো ঠাকুর, ইনি লতুনই বটেন। গেল বচর অমাবস্যায় পেথম এয়েচিলেন গুরুপদবাবার আচ্ছমে। তা পেথমবার এসেই একতারার ভক্ত হয়ে গেচেন গো। ”
–” আহা — কি ভাব গো! দু-চোখি যেন ভাবসমুদ্দ ঘাঁটি গেড়ে আচে। তা তোমার ঘর কুনঠে গো গোঁসাই? ”
আমি ভদ্রলোককে দেখে যাচ্ছি। আবক্ষলম্বিত শ্মশ্রুহীন নূর, মাথার কালো পাগড়ি ছাড়িয়ে বাবরি চুল কাঁধ ছাড়িয়েছে। কালো আলখাল্লায় সর্বশরীর আবৃত, গলায় গোটা দশেক নানা বর্ণের পুঁতির মালা, সাথে দু’তিনটে রুদ্রাক্ষমালাও আছে। কব্জিতে বেশ কিছু তুলসির মালা।
আমি দু-হাত জোড় করে প্রণাম করলাম।
–” আজ্ঞে আমি কলকাতা থেকে আসছি। ”
ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠলেন।
–” এ এক আজব নগর কলকাতা। নদের মানুষও বলেন কলকাতা তেকে এয়েচি, হুগলিও তাই। তা ঠাকুর কোলকাতার কোতায়, সেটা না বললি বুজি কীবাবে বলো দেকি! ”
আমি ওর হাসির অর্থটা বুঝলাম। বিনীতভাবে বললাম — ” আজ্ঞে কলকাতার টালিগঞ্জ থেকে। ”
এবারে যেন দু’নয়ন বিস্ফারিত হলো,
–” টালিগঞ্জ! সেই যেকেনে উত্তম সুচিত্তার ছপি তৈরি হয় গো? তালে আপনি তো যে সে মুনিষ্যি নও গো ঠাকুর, ফিলিমএর দেশের মানুষ। ”
— ” আমাদের ঠাকুরও খুব ভালো গান গাইতে জানেন গো গোঁসাই, রাজা বাউলের গান। ”
–” রাজা বাউলের গান? সে আবার কোন বাউল গো? আগে তো ককনো… ”
–” আরে রবিঠাকুর গো গোঁসাই, রবিঠাকুরকেই আমি রাজা বাউল বলি গো। ”
–” তাই নাকি! তাহলে তো তোমার গান না শুনলিই — এই দ্যাকো দিনি, আপনারে আবার মনের ভুলে তুমি বইলে ফেললাম — এতো বেবভুল মন আমার, কিচুতেই শাসন কত্তি পারি না। ”
–” ভুলের কী হয়েছে? আপনি তো আমায় তুমি বলেই বলবেন। ”
–” এই দেকো দিকি, সেই তকন থে ঠায় দেঁইড়ে আচো। একটু বসো কেনে গরিবের মেহফিলখানায় –”
বলেই একটা তালপাতার চাটাই পেতে দিলেন মাটির দাওয়ায়। আন্তরিকতার কাছে শুনেছি প্রেমের বশ্যতা স্বীকার করা আছে। অগত্যা পেতে দেওয়া চাটাইতে বসতেই হলো।
–” শুনলাম আপনি লালন সাঁইয়ের –”
–” ওর গান আমার ভালো লাগে গো, ওর গানের ভেতর জীবনের আলো খুঁজে পাই। ”
— ” কিন্তু আপনি যে গানটা… ”
–” শাহ আবদুল করিমের গান। ”
একটুক্ষণ চুপ হয়ে বসে রইলেন। বাউলনিও এসে আমার পাশেই আসন নিয়েছিলো। সে যে গানটা লালনের গান বলে আমায় বলেছিলো, সে ভুলটা বুঝতে পেরে আমার দিকে কাতর দৃষ্টিতে চাইলো।
–” আপনার নাম শুদোনো হয় নি গো ঠাকুর। তা এটটা কতা বলি — ধরো না কেনে – ” নাম “, বাবা মা কত ভেইবে চিন্তা কইরে এট্টা নাম দিলেন, যতোদিন হামাগুড়ি ততোদিন সেই নাম বাপ মায়ের। কিন্তুক শিশু যখন ডাগর হইয়ে গেলো, তকন কিন্তুক সে নাম আর বাবা মায়ের রইলো না গো, সারা পাড়াময় মানুষ তাকে সেই নাম ধইরে ডাইকতে নাগলো। গানও ঠিক তেমনি গো ঠাকুর। পদকত্তা যকন পদ রচনা কইরে বিভোর হইয়ে কতার বেতর সুর নাগাচ্ছেন, তকন সে পদ, সে সুর পদকত্তার। যেকুনি সুর দেওয়া সাঙ্গ হলো, বাদ্যযন্ত হাতে নে তিনি সেই গান গেইয়ে মাদুকরীতে বেরোলেন, তকন সেই গান আর তার রইলো না, সে তা শাহ করিমেরই হোক কি লালন সাঁইয়ের। “
এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন কথাগুলো। খাস কলকাতার মানুষ বলে একটা আত্ম অহম ছিলো। কলকাতায় বসে গাঁয়ের মানুষদের অশিক্ষিত ভাবতে এতোটুকুও কুন্ঠা বোধ করিনি, কিন্তু এখানে এসে আমার সেই অহংকারে জল ঢেলে দিচ্ছেন মানুষগুলো! কি অবলীলায় যে কতটা গভীরে গিয়ে একটা একটা করে শুক্তিকে তুলে এনে তার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা মুক্তোকে হাতের তালুতে করে আমার অহংকারের গোড়ায় ঢেলে দিচ্ছেন!
–” আসলে কি জানো পদীপবাবু, শাহ আব্দুল করিম, লালন ফকির, এনারা হচ্ছেন গে এক একটা আলোর বিত্ত গো। আলোকে কিন্তুক তোমায় আলোই বইলতে অবে গো। নেহাৎ বলতি পারো কোনোটা হয়তো একটু বেশি উজ্জ্বল, কোনোটা হয়তো কম। কিন্তুক আলো তো আলোই, বলো কেনে? এনারা যদি একবার গে তোমার হিদয়ে সেদোন, তালি পর যে আনন্দস্বরূপ আলোয় হিদয় ছেয়ে যাবে, অত আলো বুজি সুয্য চন্দেরও নি গো। ”
আনন্দস্বরূপ আলো! কথাটায় চমকে উঠলাম। সত্যিই তো তাই, আলোই তো জ্ঞান, আলোই তো চেতনা, আলোই তো পিপাসা, আলোই তো প্রেম, আলোই তো আনন্দ। হৃদয়ের যে প্রকোষ্ঠেই আলোর আগমন ঘটে, সেখানেই তো চেতনায় প্রবেশাধিকার পায় আনন্দ। রবিঠাকুর কতোভাবেই না এই আলো আর আনন্দের সহাবস্থানের কথা বলে গেছেন ! বুঝলাম, দর্শন আর দার্শনিক — দু’য়ের মেলবন্ধনেরই অন্য নাম আলো আর আনন্দ।
ঘড়ির হিসেবে রাত সবে সন্ধ্যা পেরিয়েছে। এটাকেই বোধহয় প্রথম যাম বলে। আমরা খুব সম্ভবত নদী যে দিকে, তার উল্টোদিকে হাঁটছি। গ্রামের পথ। অধিকাংশ বাড়িই খড়ের চালা আর মাটির দেওয়াল। বেশীরভাগ বাড়িতেই সীমানা নির্ধারণে কোনও রকম দেওয়াল বা, এমনকি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘেরা বেড়াও নেই।
শীতেরও একটা নিজস্ব সুগন্ধ আছে। এই সুগন্ধ শুধুই যে ছাতিমের, সেটা নয়। পথের দু’পাশে ফুটে থাকা অজস্র নাম না জানা ফুলেরা বাতাসের বুকে তাদের সুগন্ধ অকৃপণ ভাবে ঢেলে দিচ্ছে। প্রত্যেকটা বাড়ির উঠোনেই অল্প কিছু হলেও গাঁদাফুলের গাছ দেশী মোরগের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।কাঁকর বিছোনো পথ ধরে দু’জনে হেঁটে চলেছি।
–” কি ভুলটাই না কইরে ফেললাম, ছিঃ, নজ্জায় মাতা কাটা যাচ্চে গো। ”
—” কেন? কী ভুল করলে আবার? ”
–” ওই যে, করিম শায়ের গানটারে লালনের গান বইলে ফেললাম! ”
–” ওই গানটা তো করিম শাহের নয়। ”
–” মানে? গানটা যে আব্দুল করিমের গান, সে তো গানের মদ্যিই বলা আচে। ”
–” ফকির সাহেব কী কথা বললেন, শোনো নি? ”
–” কী কতা? ”
–” গান যখন সৃষ্টির পর্যায়ে থাকবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত সেটার মালিক স্রষ্টা। সৃষ্টি সম্পূর্ণ হলেই সেটা আর,— ”
–” দেকো ঠাকুর, উনি মহাজন মানুষ, ওনার কতা নে বিতন্ডায় জড়ানো ঠিক না। তবে একটা কতা না বইললে অন্যায় হপে গো। ”
–” কী কথা? ”
–” মায়ের তেকে সন্তানেরে ককনও আলাদা করা যায়! বলো দিকি? গভ্যের থে বেইরে এলেই কি –”
এটুকু বলেই কথা হারিয়ে ফেললো বাউলনি, মনের ভেতর কথা খুঁজতে খুঁজতে অধৈর্য হয়ে বলে উঠলো —
–” তুমি কী বলো ঠাকুর? তোমার নিজের কী মনে লয়, বলো দেকি –”
পৃথিবীতে যতো সমস্যা আছে, তার ভেতর সবচাইতে বড় সমস্যা হলো — মন রেখে কথা বলার সমস্যা। আর এ মুহূর্তে, যখন কৃষ্ণভামার হারিয়ে যাওয়া কথাকে খুঁজে দেওয়ার দায় বর্তেছে। কিছু একটা বলতে যাবো, ঠিক তখনই যেন দুষ্টু সরস্বতী এসে জিভের ডগায় ভর করলেন।
–” দেখো, মা যতই সন্তানকে গর্ভে ধারণ করুন না কেন, ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিন্তু সত্যিই সেই সন্তান আর মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হয় না। তখন পরিচয়ের সমস্ত ভারটাই এসে বাবার ওপর বর্তায়। সমাজ মাতৃপরিচয় খুঁজতে যায় না, খোঁজ করে পিতৃপরিচয়ের। একইরকমভাবে ধরিত্রীর বুকে বেড়ে ওঠা ফসল গোলাজাত হয়ে গেলে আর ধরিত্রীর থাকে না। কৃষকের হয়ে যায়।”
বাউলনি চুপ করে শুনছে কথাগুলো, অন্ধকারের মধ্যেও এটা দিব্যি বোঝা যাচ্ছে যে, অন্ধকার শুধু পৃথিবীর বুকে না ওর মুখেও জমে উঠেছে।
–” দেকো ঠাকুর, তোমাদের সমাজের সাতে বাউল সমাজের একেনেই পভেদ। এ জন্যিই বাউলঘরে সন্তান জন্ম নেয় না। তোমাদের পুরুষপধান সমাজের নিয়মকে বাউলসমাজ গহণ করেনি। তার বুজি একটাই কারণ, একজন পকিত মানুষ সে তার নিজের পরিচয়ে মানুষ অবে, না বাবার পরিচয়ে না মায়ের। ”
বাউলসংসারে সন্তান জন্ম নেয় না, এ সংবাদ আমার কাছে ছিলো না। আমি আদৌ জানতামই না। অবাক হয়ে বাউলনির দিকে চাইলাম।
–” হ্যাঁ গো ঠাকুর, এ জন্যিই বুজি বাউলদের কোনও সংসার নিই, তারা যতোটা না শরীলের মদ্যে মন কে খোঁজে, তার চাইতে অনেক বেশী মনের ভেতর শরীলের খোঁজ করে গো।বাউলরাও কামুক, কিন্তু সে কাম শরীলকে ভর কইরে গইড়ে ওটে না গো, মনের ভেতর মনের মানুষের সাতে মিলনের আকাংকায় গইড়ে ওটে।”
হারিয়ে যাওয়া কথা অনেক সময় এমন কথার জন্ম দেয়, যে কথারা হয়তো কথা হারিয়ে না গেলে কখনোই বুদবুদের মতো গভীর ভাবনার তলদেশ থেকে উঠে আসতো না। কথা বলতে বলতে আমরা যে কখন কানাইদার আখড়ার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছি, সেটা খেয়ালেই আসেনি।
— ” আচ্ছা বাউলদিদি, তাহলে যে তোমরা কন্ঠিবদল করো, সেটা কি জন্য? ”
— ” আবার সেই পেরাইমারি ইস্কুলের টিচারের কাচে হাই ইস্কুলের পশ্ন শুদোচ্চো গো ঠাকুর? গোঁসাইকে শুদিও, এ পশ্নের উত্তর ওর কাচেই জমা আচে। ”
বারান্দার মেঝেতে রাখা লম্ফের আলোয় কানাইদার শরীরের ছায়া কাঁপতে কাঁপতে রাস্তায় এসে পড়েছে। মাটির দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছুটকি।
কানাইদা গান গাইছেন। হাতে খমক আর পায়ের গোড়ালিতে ঘুঙুর নিয়ে গানের সুরে হারিয়ে গেছেন।
— “মন পাখি বিবাগী হয়ে ঘুরে মরো না
ভবে আসা যাওয়ার কি যন্ত্রণা
তাও কি জানো না। “
কৃষ্ণভামা ত্বরিতগতিতে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ালো। ওর ঠোঁটের ওপর তর্জনীটাকে রেখে আমার পথ আটকে দাঁড়ালো। আমি বুঝলাম, আমাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হুকুম জারি করলো বাউলনি । দাওয়া ছাড়িয়ে উঠোনে, উঠোন পেরিয়ে সীমানার গেট পেরিয়ে একটা শরীরসৃষ্ট অশরীরী ছায়া কাঁপতে কাঁপতে এসে আমাদের শরীর ছুঁয়েছে। আমি মনে করলাম ইঙ্গিতেই না হয় জিজ্ঞাসা করি
— ” কী হলো হঠাৎ? ”
কিন্তু সেই ছায়া শরীর স্পর্শ করতেই আমার ইঙ্গিতের ভঙ্গিকে কে যেন বাঁধন পরিয়ে দিলো। আমি স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে রইলাম।
–” পাখির আছে দশ ইন্দ্রিয়
রিপু আছে ছয়জনা
খুশিতে রেখো তাদের
কথার কথায় ভুলো না
তারা কুহক দিয়ে হৃদয়ে বসে
লুটবে বলে ষোল আনা।”
বাউলনি কেমন যেন মোহাবিষ্টের মতো আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার থুতনির নীচে ওর নিশিরঙা কেশদাম। মহিলাদের চুলেরও যে একটা মাতাল করা গন্ধ আছে, সেটা এই প্রথম উপলব্ধি করলাম। আমার মুখের দিকে মুখ তুলে দাঁড়ালো বাউলনি, সেই আধো আলো আঁধারে আমি দেখতে পেলাম, কৃষ্ণভামার দু’ঠোঁটে যেন হেমন্তের হিমেল কুয়াশা বাসা বেঁধেছে। আর একটা তিতিরশাবকের ডানার মতো ওর ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে।
–” আমার সুখের পাখি
সুখের ঘর কর না,
নূতন ঘর বাঁধিয়া তাতে
বসত করলি না,
ভবে আত্মতত্ত্ব পরমতত্ত্ব
সার করো উপাসনা —
ও আমার মনপাখি, বিবাগী হয়ে
ঘুরে মরো না –“
হঠাৎ করে কে যেন আমার কন্ঠ থেকে বলে উঠলো –” ঘরে চলো বাউলদিদি, ভীষণ চা পিপাসা পেয়েছে।”
–” কে গো পদীপদা এলে? ”
আমি এতোদিনে জেনে গেছি, আমি কিছু বলি বা না বলি, কানাইদা ঠিক জেনে যান আমি কী বলতে চাইছি।
–” বলি, আব্দুল ফকিরের গান শুনলে? বড়ো তন্নিষ্ট সাদক গো, বড্ড অন্তরের বেতরে বইসে সঙ্গীত সাদনা করেন মানুষটা।”
আমি আর কীই-বা বলবো। সত্যিই তো ফকিরসাহেবের গানের কোনো তুলনা হয় না। তবে আমার কেমন যেন মনে হলো, তিনি শুধু সঙ্গীতসাধনাই করেন। কানাই দা বা এনাদের মতো তত্ত্বকথার গভীরে গিয়ে জীবনকে খোঁজার যে আকুলতা, সে আকুলতা বুঝি ফকিরসাহেবের নেই।
–” দেকো পদীপদা, আসল ব্যাপারটা হলো গরে পৌঁচোনো। তুমি বাবো দেকি, তোমার শোবার গরে, বা পুজোর গরে যাবার জন্যিও কতোগুলো পত রইয়েচে! তোমার লক্ক্য যদি শোয়ার গরে পৌঁচোনো অয়, অয়তো সে গরে তোমার বাবা, মা, ভাই, দিদি বা এরকম আরও পাঁচজনেরও সেই একই লক্ক্য, কেউ অয়তো উটোন তেকে, কেউ বা রান্নাগর তেকে, তো কেউ পুজোর গর তেকে শোবার গরে যেতে চাইচে। কি গো, পারেন তো? “
কানাইদার মুখমন্ডলে সামান্য একটু গোলাপি আভা, কথাটাকে যে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে ফেলছেন সেটা ধরবার জন্য ছটফট করছি। আঁখিকোটরের ভেতর লেপ্টে থাকা দুটো আঁখি পল্লবও যে কতটা বাঙ্ময় হয়ে উঠতে পারে, আমি সেটাই লক্ষ্য করছি।
–” বিষয়টা কি জানো গো পদীপদা, একটা পদীপ, তার বুকে তেল বরা আচে, পলতে দেওয়া আচে, কিন্তু পদীপটা জ্বইলচে না, কেনে বলো দেকি? ”
নাঃ, এরা আমাকে নিয়ে একটা শিশুর মতো খেলা করছে। মা যেরকমভাবে শিশুর সামনে মুঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলেন – ” হাত ঘুরোলে নাড়ু দেবো, নইলে নাড়ু কোথায় পাবো –” অনেকটা সেরকমই।
–” একটা দেশলাই কাটি গো, ফস কইরে জ্বেইলে তুমি সেই পলতেতে ছুঁইয়ে দাও, দেকবে ওমনি পলতের ওপর আলোর শিকা লকলক কইরে উটবে গো। তুমিও ঠিক তেমনি, তোমার বেতরেও — থাকগে সে কতা, আব্দুল ফকিরও সাদক আমিও সাদক, কেউ বা ভুগোল নে সাদনা করতিচি, কেউ বা ইতিহাস নে। “
উফফ্, কোন কথাটাকে বোঝানোর জন্য, আমার অহংকে আহত না করেও, তিনি আমার ভুলটাকে ঠিক খাতে বইয়ে দিলেন, সেটাই দেখলাম।
এর ভেতর ছুটকি ফের তিন কাপ ( গ্লাস) চা এনে দাঁড়ালো।
— ” হ্যাঁ গো গোঁসাই, আজ কি খিচুড়ি হপে? আজ মাদুকরীতে দত্ত গিন্নি নতুন চাল আর খেসারি দেচেন। আলো চালের যে কি সুবাস… আঁচলে বেঁদে এনেচি বইলে সারা শাড়ি গন্দে ম’ ম করতিচে। ”
খিচুড়ির কথা শুনে কানাইদার মুখটা চকচক করে উঠলো।
–” আহা — শীতটাও বেশ নুচির ময়দায় মেশানো ময়মের মতো পইড়েচে। খিচুড়ি আর তার সাতে আলু ভাজা — আহা — ”
–” গরে বেগুনও আচে। দত্তগিন্নির বাগানের বেগুন গো –”
–” তালি পরে দত্তবৌ তো পুরো সাইজে দেচে রে ভামী — এই মহিলার কোনো তুলনা নেই রে –”
–” তোমায় পেন্নাম জাইনেচে গো গোঁসাই, একদিন তোমারে গান শোনাতে হপে। “
আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কতো অল্পেই না মানুষগুলোকে আনন্দে ভরিয়ে তোলা যায় ! এখন রাত সাড়ে সাতটা বাজে। আজই গ্রামে একটা মুদি দোকান দেখেছি। সেখানে নিশ্চয়ই হাঁসের ডিম পাওয়া যাবে।
— ” একটা কথা বলি কানাইদা? ”
— ” এ আবার কীরকম কতা পদীপদা! কিচু বইলতে গেলে আমায় শুদোতে হপে? ”
–” পাড়ার ভেতর যে মুদি দোকান দেখেছি সেখানে হাঁসের ডিম পাওয়া যাবে গো? খিচুড়ির সাথে –”
–” আরে আজ তো দেকচি রাজভোজ অপেক্কা করতিচে গো! অ ভামী, পদীপদাদা কি বইলতিচে, শুইনেচিস! তা তুই সাতে গিয়ে নে আয়! আমার যে আর তর সইচে না রে –“
অন্ধকার যত ঘন হয়, তার বুকে জমে থাকা আলোগুলোও বুঝি ততই প্রকট হয়ে ওঠে।
নইলে সরীসৃপেরা ঘন কালো অন্ধকারে এতো দ্রুত চলাফেরা করে কীভাবে? রাস্তার বাঁদিক থেকে ডানদিকে একটা ” তিনি ” সরসর করে পার হলেন।
বাউলনি আমার ডানহাতটাকে জাপটে ধরলো।
–” কানাইদার শরীরের ছায়া আমাকে কীভাবে ছুঁতে পারে বাউলদিদি? গান গাইবার সময় ওর শরীরের ছায়া যেন একটা শরীর হয়ে আমার শরীরকে –”
— “ছায়া লয় গো ঠাকুর, গান। গানের কতা আর সুর — গানের পদগুলো মনে আচে তোমার? “
দু’হাত দিয়ে আমার ডান বাহুকে জাপটে ধরে আছে বাউলনি। ওর সারা শরীরের কাঁপুনি পরিষ্কার বুঝতে পারছি। বড় বড় শ্বাস বেরিয়ে আসছে ওর নাকমুখ থেকে, আর থরথর করে কাঁপছে। যে মানুষটা রাত বিরেতে নেউলের মতো নেচে নেচে পথ চলে, একটা ভুজঙ্গকে দেখে তার এতো ভয়? নাকি সেই অছিলায়…
–” তু তু তুমি –”
আমি ঘুরে ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার দু’হাত দিয়ে ওর কাঁধদু’টোকে শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিলাম।
–” কী হয়েছে বাউলদিদি! এতো ভয় পেলে কেন? তুমি কি রাতের বেলায় এই প্রথম.. ”
–” তুমি দেকেচো ওটাকে? ”
–” হ্যাঁ, দেখবো না কেন? ”
–” তুমি ওদের জাত চেনো? ”
আমি মাথা নাড়ি। কথা বলার পর বোধহয় একটু ধাতস্থ হয়েছে বাউলদিদি।
–” ওটা চাঁদ বোরা। ঠাকুর, আমার বেতরে কি কোনো পাপ দেকেচো তুমি? ”
আমি ওর কাঁধ থেকে হাত’দুটো সরিয়ে নিই। অন্ধকারে ওর দু’চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ি আমি।
–” তা ওলে ও আমার সুমুকে এলো কেন? সাপ যে কামের পতিক গো ঠাকুর, সত্যি করে বলো দেকি, আমায় দেকলে কি তোমার কামবাব আসে? ”
-” তোমার কি মনে হয়, বাউলদিদি? ”
–” না, আসে না, যদি আসতো তালে পরে গেলোবারে.. তোমার মনে আচে ঠাকুর? সেই পদ্মফুলের কতা? ”
–” মনে আছে গো, বাউলদিদি। তোমার বস্ত্রহীন শরীরটা মুহূর্তে একরাশ পদ্মফুল হয়ে ঝরে পড়েছিলো মাটিতে। কাম কখন যে পূজা হয়ে ফুলের নৈবেদ্য সাজিয়েছিলো, সে বুঝি… ”
–” তোমায় আমি বালোবাসি গো ঠাকুর, সত্যি কতায় কোনও পাপ নেই, তোমায় বালোবাসার পাপের গরে আমার পুণ্যের বাস গো। গোঁসাইও সেটা জানেন, আর জানেন বলেই –”
–” কী? জানেন বলেই কী গো কৃষ্ণভামা?”
–” সাঁজবেলায় সে গানটা দইরেচিলো। গানটার পদগুলো মনে আচে তোমার –? সে গানটা দে ঠারে গোঁসাই আমায় বুইজেচিলো যে, আমার অন্তরস্ত চাওয়ার কতা তিনি জানেন। আর তাই –”
এতক্ষণে সামনের দিকে পা বাড়ালো কৃষ্ণভামা। কার্তিকের শুক্লা নবমীর চাঁদ তখন অনেকটাই দক্ষিণ আকাশের বুকে পাল তুলেছে। আধো আলোছায়ায় নারী যে কি ভীষণ মোহময়ী হয়ে উঠতে পারে, সেটা এ মুহূর্তে বুঝতে পারছি। কেন কী জানি, সন্ধ্যাবেলায় ওর থরোথরো করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের ছবিটা যেন ফিরে এলো।
–” আমি বুজেচি ঠাকুর, ওই চাঁদবোরা কেন এবাবে পত কাটলো। সন্দ্যের সুময় আমার শরীলে মুহূর্তের জন্যি পাপ এয়েচিলো। গোঁসাইয়ের গান আমায় সাহসী কইরে দেচিলো গো, ওই আত্মতত্ত্ব পরমতত্ত্বের উপাসনা করার কতাতেই — ”
–” পাপের ঘরে যদি পুণ্য বসত করতে পারে, তাহলে পুণ্যর ঘরে পাপ বসত করতে পারবে না কেন? এ প্রশ্নটা তো তুমিই করেছিলে গো বাউলনি, মনে পড়ে? ”
— পড়ে গো ঠাকুর, মনে পড়ে। একন এই আলোচায়ার মইদ্যে তুমি ও কতা আর মনে কইরে দিও না। মনরে বিশ্বাস নেই গো ঠাকুর, সে যে ককন শরীলরে বেবশ কইরে দেয়, সেটা বুজি গুরুবাবাও বোজেন না। “
মনরে বিশ্বাস নেই? তাহলে যে কবি বলেছেন — ” মনেরে আজ কহ যে, ভালোমন্দ যাহাই আসুক সত্যেরে লও সহজে। ” মন শরীরের অনুসারী না কি শরীর মনের? কোনটা সত্য? কবি কোনটাকে সহজে নিতে বলেছেন? আমার তো মনে হয় দুটোই সমানভাবে সত্য, শরীর ঠিক না থাকলে মনও কেমন ঝিমিয়ে পড়ে, আবার মন উৎফুল্ল থাকলে বুঝি হাত পা ছাড়াও কেদারনাথ দর্শন করে আসা যায়।
— ” ঠাকুর, মন যে কি বস্তু, সে খপর মন নিজেও জানে না গো। তুমি বাবচো বুজি শরীল না চইললে মনও বুজি অচল। মনের শরীল মন নিজেই বাইনে নেয় গো, এই বাবলে বুজি একানে আমার সাতে গল্প করতিচো, দেকলে মুহূর্তে অয়তো বাড়ির কতা বাবতে শুরু কইরে দেচো। মনের খপর কে রাকতি পারে বলো দিকি? “
শুক্লা অষ্টমীর আলো আঁধারিয়ায়, কুয়াশারা মাটিতে নেমে ঘরবাড়ি বানাচ্ছে, আমাদের বাঁদিকে সদ্য কেটে নেওয়া ধানের আদিগন্ত শস্যক্ষেত্র, আর সাথে মোহময়ী বাউলানি, এরকম অবস্থায় সুর যেন বাঁধনহারা নৌকোর মতো তরতর করে এগিয়ে চলে —
মন বলে আমি মনের কথা জানিনা
তারায় তারায় উড়ে বেড়ায়, মাটিতে সে নামে না,
সাঁঝের তারা হাতছানি দেয়, ভোরের তারা টানে
সাগর ঢেউয়ে ভেসে যায় সে, কোন পাড়ে কে জানে…
দেহ আমার চলতে নারে, বইতে নারে ভারে
হালকা হাওয়ায় পালকি চড়ে, কোথাও সে যে থামেনা…
মন বলে আমি মনের কথা জানিনা…..
–” কে গো? কিষ্ণামা নাকি? তা সংগে উটি কে? ”
–” আমার নাগর গো ঠাকুর, আমার পিরিতের শ্যাম –”
— ” তোমার কে হন সে আমি কি করে জাইনবো বলো কেনে, ত দু’জনকে মাইনেচে দিব্যি, যেন সত্যিকারের আধাকিষ্ণ গো। ”
–” মরণ! তোমার দোকানে ডিম নিতে এয়েচিলাম গো, ঘোড়ার লয় গো দোকানী, হাঁসের। আচে? “
( চলবে৷)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।