মার্গে অনন্য সম্মান প্রণতি গায়েন (সেরার সেরা)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার
পাক্ষিক গল্প প্রতিযোগিতা পর্ব – ১০
বিষয় – রহস্য
তাং-০8/০৯/২০

গোধূলীর ছটা

প্রচণ্ড বৃষ্টি এই দুদিন ধরে অবিরত চলছে,খবরে বলছে নিম্নচাপ-আরেকদিন থাকবে।দূর বিরক্ত লাগছে অমৃতার-এইরকম আবহাওয়াতে না পারছে বের হতে,না পারছে বাড়িতে কিছু কাজ করতে।তিনদিন অফিসে না গেলে সব তছনছ হয়ে যাবে,কে যে কী করছে কিছুই মাথায় ঢুকছে না অমৃতার।কেন যে চঞ্চলকে বিজনেস করবো বলে এত জোরাজুরি করেছিল-তার ফল ভুগতে হচ্ছে!অথচ দেখ বাবু নিজে আজ একবছর ধরে
বাইরের দেশে আছে বলে কোনো খবর নেই?মাঝেমধ্যে খুব মন খারাপের সাথে সাথে রাগ ও ধরে-সংসারটা,ছেলেটা কি শুধু অমৃতার?চঞ্চলের কোনো দায়-দায়িত্ব নেই?প্রচণ্ড রাগে মাথায় শিরাগুলো যন্ত্রণায় দগদগ করে !কী আর কাকে বলার আছে?একটা সময় চঞ্চলের প্রেমে অমৃতা তো এইসব অসুবিধাগুলো জেনেও নীরবে মেনে নিয়ে ই মত দিয়েছিল, তাহলে আজ বললে কী হবে?ধ্যাৎ, মাঝেমাঝে কিচ্ছু ভালো লাগেনা, শুধু ছেলে বাবানের মুখ চেয়ে সব ঠিকঠাক রাখতে হয়,থাকতে হয়।জানালার সামনে বৃষ্টি দেখতে দেখতে এসব ভাবছিল অমৃতা, হঠাৎ দেখল-রাস্তার ওপারে পাগলটা তখন ও ভিজছে !দেখে কষ্ট হলো অমৃতার, মাঝেমধ্যে বাড়িতে থাকলেই কাজের মেয়ে সোমাকে দিয়ে পাগলটার জন্য খাবার পাঠায়।আজ খুব মায়া লাগছে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজছে,অথচ কোথাও আস্তানাতে দাঁড়ায় ও না।সোমাকে ডেকে অমৃতা একটা পুরাতন ছাতা,চঞ্চলের একটা জামা ও একটা চাদরের সঙ্গে আজকের ভাত,ডাল একটু সব্জি দিয়ে পাঠালো ওই পাগলকে।আর বারবার বলে দিল
—ওই পাগলটাকে বলিস ওইভাবে বৃষ্টিতে না ভিজে পারলে ওই গ্যারেজ ঘরটাতে থাকতে বল।তবে যেন কোনো নোংরা না করে!
—না দিদিমণি ওই পাগল- মাটি,ছাই মেখে থাকে,ও ওই গ্যারেজ ঘরটা খারাপ করেই ছাড়বে।ওকে দেবার দরকার নেই।
–তুই চুপ কর সোমা,এমন বলতে নেই।কিছুই তো পারিনা, শুধু এইটুকু যদি একজন মানুষ হয়ে না পারি তো বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না।আজ চঞ্চল থাকলে এইসব মানুষের পাশে কতভাবে ই দাঁড়াতো।একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে কষ্টটা বুকে চেপে চুপচাপ চেয়ে থাকে বাইরের দিকে।

মনে পড়ে সেই কলেজ জীবনের কথা।সুন্দরী অসাধারণ কোকিলকণ্ঠী অমৃতাকে দেখেই একদেখাতে প্রেম নিবেদন করে বসে চঞ্চল।অত্যন্ত স্মার্ট, সুদর্শন হলে ও চোখে মুখে বেশ গাম্ভীর্য ও বুদ্ধিদীপ্তর রেশ,যা অমৃতাকে ভীষণ ভাবে টানে।ছেলেদের মধ্যে সেই মেয়েলিপনা,অযাচিত আলাপ,অধিক বকবকানি-এগুলো অমৃতার জাস্ট অসহ্য লাগে।তাই তার ও প্রথম দেখায় চঞ্চলকে ভালো লাগে,আরো ভালো লাগে কোনো ভণিতা না করার জন্য।সেদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ এনে সরাসরি অমৃতাকে বলে–উইল ইউ ম্যারী মি?আনন্দে আত্মহারা অমৃতা বাড়ির কথা না ভেবেই ‘হ্যাঁ’ করে দেয়। তারপর থেকেই দুজনের চুটিয়ে প্রেম, ঘুরতে যাওয়া । মাঝেমধ্যে আদরে-সোহাগে প্রেমের চিহ্ন দুই অধরের একাত্ম চুম্বনে যেন এক স্বর্গীয় সুখ এনে দিত ! একটা সময় পড়াশোনা শেষ করে চঞ্চল একটা সি .বি .আই এর একজন বড় অফিসারের চাকরি পেয়ে-আজ দিল্লি, মুম্বাই তো কাল লন্ডন, আমেরিকা।এইসব চাকরি শুনতে ভালো লাগলেও যার বাড়ির কেউ করে সেই জানে-কী টেনশন! বিয়ের পর চঞ্চলের এই চাকরি দেখে অমৃতা নিঃসঙ্গতা কাটাতে বিজনেস করার কথা ভাবলে,চঞ্চল মেনে নেয়।তারপর ই অমৃতার প্রেগন্যান্সি শুনে মত পরিবর্তন করে।সেবার বাচ্চা হওয়ার আনন্দ যত না অমৃতার, তার দ্বিগুণ খুশি হয়ে কতদিন ছুটি নিয়ে কাজকর্ম থেকে বিরত থেকে শুধু অমৃতা ও বাচ্চার খেয়াল রেখেছে।এটা দেখে অমৃতার খুব গর্ব হয়েছে-এমন স্বামী কটা মেয়ের ভাগ্যে জোটে?এইভাবে যখন বাবান পাঁচবছরের,তখন আবার এই বুটিকের বিজনেস এ নামে অমৃতা।এখন এতবড় ব্যবসা, ইদানিং আরেকটি আসানসোল এ ব্রাঞ্চ খুলেছে।ব্যবসার যখন এই রমরম অবস্থা, তখন ই চঞ্চলের কোনো খবর নেই, ওই যে জানিয়েছিল——সামনেই এক বড় মিশন, সেটা সাকসেস হতে হবে।সেই যে খবর দিয়েছিল, আর কোনো খবর নেই!ভীষণ চিন্তা হয় চঞ্চলের জন্য, মনটা উথালপাথাল করে-তাকে ছেড়ে থাকতে যে ভীষণ কষ্ট হয়!কিচ্ছু ভালো লাগে না আজকাল-
এদিকে ছেলে, সংসার, ব্যবসা সামলাতে অমৃতার হিমশিম অবস্থা।
সন্ধ্যায় সোমাকে বললো–শোন বাবানের পড়া হয়ে গেলে ওকে খেতে দিয়ে ,আমার টা টেবিলে বেড়ে রেখে,নিজে খেয়ে নিস।
–তা কী করে হয় দিদিমণি?তুমি না খেলে আমি খাব কী করে?
–এই শোন এসব ফরম্যালিটি বাদ দিয়ে তুই আজ বাবানকে একটু খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিবি,আজ আমার অনেক কাজ আছে-দেখছিস না ফাইলপত্র নিয়ে সব বসেছি !
–তোমার খুব চাপ যাচ্ছে, তাই না দিদিমণি?দাদাবাবু থাকলে এসব তোমাকে এত মাথায় নিতে হতো না বলো?
–সে তো ঠিকই !চঞ্চল থাকলে আমি রিল্যাক্স এ থাকি,এদিকে ব্যবসার গতি কেমন কেমন লাগছে, কেউ যেন ভেতর থেকে কিছু একটা করছে।কিন্তু কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।এদিকে চঞ্চলের জন্য ও মনটা খারাপ লাগছে, এমন তো করেনা, এখন কোন দেশে আছে কে জানে?
এইসব ভাবতে ভাবতে সোমাকে এককাপ কফি আনতে বলে,অমৃতা ধীরে ধীরে আড়ালে গিয়ে দেখে মাস্টার মশাই কী নিয়ে যেন গল্প করছে বাবানের সাথে।দেখা না দিয়ে ফিরে এসে সোমাকে জিজ্ঞাসা করলে সোমা আমতা আমতা করে বলে-না, তেমন কিছু না, এই বাবানের বাবা কী করেন?এখন কোথায় থাকেন?এইসব আর কী?তাছাড়া সেদিন হঠাৎ আমাকে বললেন-বাড়িতে আর কেউ থাকে না?
অমৃতা তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করে–তুই কী বললি?
–বললাম -না, আর কেউ থাকে না।
অমৃতা ফাইল দেখতে দেখতে ভাবনার জগতে চলে গিয়ে বলে–আচ্ছা যা এখন, দেখছি কী করা যায়।সোমা চলে গেলে অমৃতার মাথায় চিন্তা ঢুকে যায়-এ কী!তাহলে কী ভুল টিউটর বাছলাম?কিন্তু এটা তো সৃজন দেখে দিয়েছে।ছেলেটা তো খারাপ নয়।কাল অফিসে এবিষয়ে কথা বলা যাবে।
পরদিন অফিসে গিয়ে কাজকর্ম সব দেখার ফাঁকে মনে পড়ে সৃজনের কথা।তাকে ডেকে পাঠিয়ে কথা বলে জানতে পারে টিউটর তো ভালোই!ওইসব ব্যক্তিগত প্রশ্ন এমনই হয়তো করেছে,এরপিছনে মোটিভ কিছু নেই।কিন্তু অমৃতার মনটা তবুও মানে না।তাড়াতাড়ি করে অমলাকে সব কাজ বুঝিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়,কিন্তু সেদিন জিটি রোডে একটা দূর্ঘটনা ঘটায় বাড়ি ফিরতে ছটা।বাড়ি ফিরে লক করলে কেউ দরজা না খুললে ভয়ে অমৃতার জীবন শুকিয়ে আসে।তাড়াতাড়ি ইন্টারলকটার চাবিকাঠি বার করে ঢুকেই স্ট্যাচু হয়ে যায়-দেখে বাবান ও সোমাকে হাতে,মুখে বেঁধে টিউশন টিচার আলমারি ঘেঁটে কীসব ফাইলপত্র বার করেছে।অমৃতাকে দেখেই বন্দুকের নল এনে বলে—একদম চিৎকার নয়,চুপচাপ বসে থাক।অমৃতা বাবানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে।অমৃতা হঠাৎ লুকিয়ে পুলিশকে ফোন করতে গেলে, টিচার দেখে ফেলে –খবরদার বেশি চালাকি হচ্ছে না?ভেবেছিলাম মারব না, কিন্তু তুই তোর মৃত্যু নিজেই ডাকলি ?
অমৃতাকে গুলি করতে উদ্যত হলে বাবান মাকে জড়িয়ে ধরে ভয়ে।কিন্তু টিচার –এক ,দুই করে এগিয়ে আসতেই–গুলির আওয়াজ। গুলি বাম কানের পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যেতেই আরেকটি গুলি টিচারের হাতে লাগলে- হাত থেকে বন্দুকটা পড়ে যায়।অমৃতা চোখ খুলে দেখে -পাগলের বেশ ধরা সেই লোকটি।পুলিশ এসেটিচারকেহ্যান্ডকাফ পরায়।
এরপর পাগলরূপী চঞ্চল মুখের দাড়ি,চুল খুলতে থাকলে অমৃতা ছুটে জড়িয়ে ধরে—চঞ্চল তুমি?
—হ্যাঁ, আমি ই-এটাই আমার টারগেট ছিল এতদিন।
অমৃতা,বাবান দুজনেই কাঁদতে থাকলে চঞ্চল ওদের চোখের জল মুছিয়ে বলে–আর কান্না নয়।
–এবার অমৃতা বলে—এবার বলো কী হয়েছিল?তুমি ই বা….?তুমি এত কাছে থেকে ও আমায়..?
—শোন আগে!আসলে সাতমাস আগে এই দেশের সবচেয়ে শত্রু মিস্টার রঞ্জন সিং লোক দিয়ে আমার সমস্ত ডকুমেন্ট চুরি করে ভারত সরকারের কাছে আমাকেই দেশদ্রোহী প্রমাণ করে যাবজ্জীবন জেলে ঢোকানোর সমস্ত ব্যবস্থা করে,যেহেতু আমি তার সমস্ত কার্যকলাপের বাধা ছিলাম।কিন্তু যেদিন আমাকে অ্যারেস্ট করার কথা আমি স্যারের মারফত গোপনে জানতে পেরে গা ঢাকা দিয়ে সমস্ত তথ্য প্রমাণ জোগাড় করছিলাম নির্দোষীতার।জোগাড় হচ্ছিল ও,তাতে গোপনে আমার ডিপার্টমেন্ট আমাকে সাহায্য করতো।এমন সময় খবর পেলাম আমার কিছু তথ্য আমার বাড়িতে আছে জানতে পেরে মিস্টার সিং বাড়ির দিকে পাখির চোখ করলেন।বাবানের টিউশন টিচার একজনকে সাজিয়ে বাড়ির সব জেনে একে একে খবর পাচার করতে থাকে,এদিকে আমি খবর পেয়ে এখানে পাগল হয়ে তাকে ওয়াচ করতে লাগলাম।আমি বাড়ির গ্যারেজে থাকাকালীন বাবানের জামায় চিপ লাগিয়ে ওই টিউশন স্যারের গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য রাখতাম,কাজ বেশ প্ল্যান মাফিক হচ্ছিল, কিন্তু বাঁধ সাধলো সোমা -তোমাকে ওই স্যারের নিয়ে বলায়,তুমি তোমার অফিসের ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করতে গেছ?
–মানে সৃজন?
-হ্যাঁ, ও ও মিস্টার রঞ্জন সিংয়ের লোক।ওর জন্য ও তোমার ব্যবসা ডুবতে বসেছিল।মাঝেমধ্যে ই কনট্যাক্ট হারানোর কারণ ওই সৃজন।যাই হোক শোন।তারপর সেদিন তুমি বেরিয়ে আসতেই সৃজন ফোনে অ্যালাট করে দিলে ওই সাজানো স্যার তড়িঘড়ি বাড়িতে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করতে লেগে যায়।এদিকে তুমি ও জ্যামে আটকে, আর আমার ক্ষেত্রে হয়েছিল যে, বাবান ওইমুহূর্তে জামাটা চেঞ্জ করায় চিপে কোনো খবর পাচি্ছলাম না।ভাগ্যিস তোমাকে ফলো করেছিলাম, আর তুমি দরজা লাগাওনি।কিন্তু আমার ফোর্স এ খবর দিতে, আসতে একটু সময় লাগায়-হয়তো বড় বিপদ হতে পারতো।কিন্তু ঠিক সময়ে তোমাকে গুলি করার মুহূর্তে ই আমি তাকে গুলি করি।তারপর তোমার বাম কানের পেছন দিয়ে গুলি গেলেও তেমন কিছু হয়নি, থ্যাংকস গড !
–ওদের ধরেছ?
–হ্যাঁ, তোমার সৃজনকে ধরেই পুলিশ এখানে এসেছে।এদিকে টিচারকে তো ধরা হলো।ওন্যদিকে একদল গেছে মিস্টার সিংকে ধরতে।
-।আমার ডিপার্টমেন্ট খুব খুশি।আগামীকাল বোধ হয় কোর্টে তোলা হবে ওদের।
–এতকিছু ব্যাপার !চঞ্চল কে জড়িয়ে ধরে অমৃতা বলে -আর আমি পারব না চঞ্চল তোমাকে ছাড়া এত দায়িত্ব নিতে।এবার দরকার হলে চাকরি ছেড়ে দাও।
–আরে আমার মাতঙ্গিনীর এরূপ মনোবল হলে হয়?তুমি না আমার প্রেরণা?আজ আমি এত মনোবল পাই সব তোমার জন্য, তুমি আমার জীবনে যে কী,তা বলে বোঝাতে পারব না !
এমন সময় সদলবলে চঞ্চলের অফিসাররা ঢুকে চঞলকে ঘিরে ধরে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছার বন্যায় ভরিয়ে দেয়।সকলের আন্তরিক হাসি ও করমর্দন দেখে অমৃতার চঞ্চলের জন্য গর্বে বুকটা ভরে যায়।ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা যেন-সাতজন্ম বলে যদি কিছু থাকে,তবে যেন চঞ্চলকেই স্বামী হিসেবে পাই।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।