সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ১০)

বাউল রাজা
তৃতীয় খন্ড (দশম পর্ব)
কথাটা বলামাত্রই যেন একটা বেহালার ছরে কাতর সংগীত বেজে উঠলো।
— আমার খপর আর কেই বা রাকে? আমাদের খপর শুদোনোর মতো কেউ নেই গো ঠাকুর। এই দেকো না কেন, এতো মাতনকে কীরকম খাঁচায় আটকে রেকেছে।
নদীর দিকে চাইলাম। আগে যে ভরা যুবতীর মতো ঢল দেখেছিলাম নদীর বুকে, যে উচ্ছ্বাসে ও পথ চলতো, সেসব যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।
— ঠাকুর সেই যে কতায় বলে না নিকষা পুরুষমানুষ, তোমাকে দেকে আজ সে কতাটাই যে মনের দোরে এসে ধাক্কা দিলো! আচ্ছা, তা আজ কতো বচর হবে তুমি এদিকপানে আসোনি।
— সে সব দিয়ে তোর কী পেয়জন রে পোড়ারমুখী? তুই তো আর কোনোদিনই কতা কইবি না বলে পিতিজ্ঞে করেছিলি না? বলি মনে আচে সেসব কতা?
— হ্যাঁ, কইরেচিলাম তো। তা কেন করিচিলাম সে কতা দেকি ভুলে গেচিস?
— ভুলবো কেন রে হিংসেকুটি, ফেরার পতে তোর সাতে কতা কয় নি দেকে। মনে নেই বেবেচিস?
— আমি তো শুদুই সই লা, তোর মতো ছিরাদিকে তো নই, সে জন্যই না ঠাকুর আমার সাতে কতা কইতে কইতে ফিরবে বলে কতা দিয়েচিলো। আমি হাঁপিত্যেশ করে পতের পানে তাকিয়ে রইলুম, সাতে সাতে সারাটা পথ হাঁটলুম, কিন্তু আমার কতা তার মনেই পড়লো না। এতে কার না রাগ হপে বল দিকিনি?
নদীর কথায় আমি মরমে মরে গেলুম, কি বলবো সেকথা মুখে জোগালো না। মাথা নীচু করে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইলুম।
— তোর কতা বুঝলুম। ভুল না হয় ঠাকুর করেচে এ কতা শতভাগ সত্যি। কিন্তু তুইই বা কেমনধারা সই বল দেকি? সারাটা রাস্তা পেচন পেচন ছুটলি কিন্তু একবারের তরেও তো মনে করিয়ে দিলি নে? তোর দেমাকেরও তো দেকচি কোনো সীমা পরিসীমা নেই। সই হয়ে বন্দুর ভুল ধইরে দেওয়াটাও তো সইয়ের ধম্মের মদ্দে পড়ে নাকি?
ঠাকুর, ভুল তোমারই বেশী। তোমারই সইয়ের কাচে দুঃক্ক চাওয়া উচিত। নাও, দেরী না কইরে যতেক মান অবিমান মিটিয়ে নাও তো দেকি।
এখানেই বাউলনির মুন্সিয়ানা। কতোবার যে আমায় বিরুদ্ধ পরিস্থিতির থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে ফিরেছে।
— ছিছি, এ কতা কি বলিস রে সই? তোর ঠাকুরতো আমারও ভালোবাসার মানুষ, তাছাড়া গুরুজন, গুরুজনেরা কি কখনও চোটদের কাচে ওইসপ করে বল দিকিনি?
—- কানাইদাকে দেখার জন্য মনটা খুব ব্যাকুল হয়েছে, চলো গো বাউলদিদি, আসি গো সই, কথা দিলাম, এরপর কথা দিলাম, তোমার সাথে দুদন্ড কথা না বলে ফিরবো না।
সাথে সাথে নদীর দুকুলজুড়ে একটা মাতন উঠলো। নদীর জল লাফিয়ে উঠে তীর ছুলো। একটা ভ্রমর গুঞ্জনের মতো মিষ্টি সুরেলা সুর মিশে গেলো আকাশে বাতাসে।
ক্রমশ